বৃহস্পতিবার । ২১শে মে, ২০২৬ । ৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

হামের টিকার সংকট নিয়ে ১০ বার সতর্ক ও ৫ বার চিঠি দেওয়া হয়: ইউনিসেফ

গেজেট প্রতিবেদন

গতবছর দীর্ঘসময় দেশে হামের রুটিন টিকার সংকট ছিল জানিয়ে জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ বলেছে, ২০২৪ সাল থেকে এ ব্যাপারে সরকারকে (অন্তর্বর্তী সরকার) ১০ বার সতর্ক করা হয়। পাশাপাশি ৫ থেকে ৬ বার এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক চিঠিও দেওয়া হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত টিকা না আসায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে পড়ে।

বুধবার (২০ মে) দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইউনিসেফ কার্যালয়ে ‘হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি ও চলমান প্রতিরোধ কার্যক্রম’ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স।

এতে জানানো হয়, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ইউনিসেফের প্রি-ফাইন্যান্সিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ১৭ দশমিক ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের টিকা দেশে আনা হয়, যা মোট চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ। আর বাংলাদেশে বছরে টিকা সংগ্রহে আনুমানিক প্রয়োজন হয় ৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

ইউনিসেফ জানায়, টিকার ঘাটতির বিষয়ে ২০২৪ সাল থেকে অন্তত ১০টি বৈঠকে সরকারকে সতর্ক করা হয়েছে। পাশাপাশি ৫ থেকে ৬ বার আনুষ্ঠানিক চিঠিও দেওয়া হয়। শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও এ বিষয়ে জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দীর্ঘদিন রুটিন টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় অনেক শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়। এতে দেশে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত বড় প্রাদুর্ভাবের পরিস্থিতি তৈরি হয়। তবে চলতি বছরের মে মাসে দেশে হামের রুটিন টিকা এসেছে। এখন টিকাদান কার্যক্রম জোরদার, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের আওতায় আনা এবং আক্রান্ত এলাকায় বিশেষ নজরদারির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীরা।

ইউনিসেফ প্রতিনিধি বলেন, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত টিকা কার্যক্রমে বিঘ্ন হওয়া উচিত নয়। সময়মতো পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতেও বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

টিকা সংকটের কারণ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ‘মূল কারণ হলো, উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার বিষয়ে (অন্তর্বর্তী সরকারের) মন্ত্রিসভার একটি সিদ্ধান্ত। আমার মনে হয় না, এ ধরনের সিদ্ধান্ত আগে কখনও নেওয়া হয়। তবে বিষয়টি আপনারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে যাচাই করে নিতে পারেন।’

তিনি বলেন, ‘এ মুহূর্তে আমার কাছে সুনির্দিষ্ট দিন-তারিখ নেই, তবে তদন্তে বিষয়টি নিশ্চিত হবে। এটুকু জানি, আমরা ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাঁচ-ছয়টি চিঠি পাঠিয়েছি, যার মধ্যে শেষ চিঠিটি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক আগে। আমরা আশা করেছিলাম, যিনি নতুন করে দায়িত্ব পাবেন তার ডেস্কে চিঠিটি থাকবে।’

রানা ফ্লাওয়ার্স আরও বলেন, ‘আমরা তাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করার জন্য বারবার চাপ দিয়েছি। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও কর্মীদের সঙ্গে অন্তত ১০ বার বসেছি। আমি এবং আমার কর্মীরা বলেছি, আমরা চিন্তিত, আপনারা টিকার সংকটে পড়তে যাচ্ছেন।’

সংবাদ সম্মেলনে রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ‘বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব থেকে শিক্ষণীয় অনেক বিষয় আছে। এই ঘটনার পর ‘আফটার অ্যাকশন রিভিউ’ বা পরবর্তী আলোচনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা খতিয়ে দেখব, কেন অনেক বছর ধরে প্রতি বছর প্রায় ৫ লাখ শিশু টিকা কর্মসূচি থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে।’

৫ লাখ সংখ্যাটিকে তিনি ‘মোটা দাগের অনুমান’ উল্লেখ করে বলেন, ‘স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ও প্রাক-বিদ্যালয়, প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো জায়গায় শিশুদের একত্রিত করতে আমাদের সক্ষমতা ভবিষ্যতে খতিয়ে দেখতে হবে।’

এখন কাউকে দোষারোপ করার কিছু নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এখন এমনভাবে (টিকাদান) কাজ করাতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে দেশের কোনো শিশু প্রতিরোধযোগ্য রোগে মারা না যায়।’

টিকা কেনার প্রক্রিয়া নিয়ে রানা ফ্লাওয়ার্স আরও বলেন, ‘আমরা যা কিনি, তার জন্য উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান সবচেয়ে স্বচ্ছ পদ্ধতি। তবে টিকার ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন, কারণ এটি অত্যন্ত বিশেষায়িত পণ্য। এখানে শুধু এক লাখ মানুষের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক কিনছেন না, আপনার লক্ষ্য বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছা। সুতরাং নিশ্চিত করতে হবে, আপনার কাছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) অনুমোদিত টিকা আছে, আপনি সস্তা টিকার পেছনে ছুটছেন না। আপনি সেই টিকাই নেবেন, যার কার্যকারিতা প্রমাণিত এবং কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই।’

এ কারণে ইউনিসেফ বহু বছর আগে টিকা সংগ্রহ ও বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয় জানিয়ে রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ‘আমরা বিশ্বের অধিকাংশ দেশের জন্য টিকা সংগ্রহ করি। টিকা প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে আমাদের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, তাদের মান নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়। যেহেতু আমরা অনেক বেশি পরিমাণে কিনি, তাই আমরা কম দামে কিনতে পারি। ইউনিসেফ যে দামে টিকা পায়, তার চেয়ে কম দামে দরপত্র পাওয়া সম্ভব নয় বলে আমরা তা জানি।’

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন