বৃহস্পতিবার । ৭ই মে, ২০২৬ । ২৪শে বৈশাখ, ১৪৩৩

অতি দর্পে হত লংকা

বাপি সাহা

চেন্নাই থেকে ফিরছিলাম দূরপাল্লার ট্রেনে, গন্তব্য কলকাতা। অনেকটা কঠিন অবস্থার মধ্যে ট্রেনের টিকিট প্রাপ্তি। চেন্নাই থেকে কলকাতা দূরপাল্লার ট্রেনে প্রায় ২৮-৩০ ঘণ্টার ভ্রমণ অনেকটা কঠিন সময় পার করতে হবে। ভাবনা যেন পিছন ছাড়ছে না। এত পথ কীভাবে যাব সেটা নিয়ে ভাবছিলাম। যাত্রায় পরিবারের সদস্যরা পাশে আছে এটাই আমার জন্য স্বস্তি। যথাসময়ে ট্রেনে উঠলাম সপরিবারে।

যথাসময়ে ট্রেন ছেড়ে দিল, অভ্যাসটা খারাপ হয়ে গিয়েছে একটু চা না পেলে হয়ত আর পারব না। হঠাৎ দেখি একজন চা বিক্রেতা ট্রেনের কামরায় চা ফেরি করছে। ভাবলাম লোকটি কি আর আমার বাংলা কথা বুঝবে না কি হিন্দিতে বলতে হবে, কাছে আসতেই দেখলাম লোকটি বাংলায় কথা বলছে। চা পান করার লোভ সামলাতে না পেরে বলেই ফেললাম একটু চা দিন দাদা চা বিক্রেতা দাদা বেশ আনন্দের সাথে আমাকে চা দিল। আমি কৌতূহল বশত পাশে বসতে বললাম। সেও আগ্রহের সাথে পাশে বসল। অনেকটা আগ্রহ নিয়ে আমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করল। বাংলাদেশ থেকে আসার কারণে আরও মনে হয় আগ্রহ অনেকটা তার বেড়েছে। আমিও অনেকটা আগ্রহ নিয়ে তাঁকে বললাম “আপনি কেন দূরপাল্লার ট্রেনে চা বিক্রি করছেন। এতটা তো অনেকটা কষ্টের কাজ” অনেকটা হেসে উত্তর দিল “কী আর করব? পশ্চিম বাংলায় কোনো কাজ নেই? দিদি যা করেছে তাতে ভাগ্যের পরিবর্তন হবে না।” সম্পূর্ণ দোষটি দিদির শাসনের উপর চাপিয়ে দিলেন।

আবার একটু হাসি দিয়ে বললেন,“কী আর করব, কিছু তো একটা করে খাচ্ছি।” ট্রেন বেশ কিছুটা এগিয়েছে, ট্রেনের কামরা পরিষ্কার করার জন্য একজন ব্যক্তির আগমন ঘটল। লোকটির কথা শুনে বুঝলাম তিনিও বাঙালি। আগ বাড়িয়ে বললাম লোকটি বাংলায় উত্তর দিল। কথা বলতেই বুঝলাম লোকটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কর্মী হলেও শিক্ষিত। মানুষটির সাথে আলাপচারিতায় জানতে পারলাম কর্মরত মানুষটি পশ্চিম বাংলার। মাসের মাত্র ৫ দিন বাড়ি থাকতে পারেন। প্রিয়জনের সাথে খাবার খেতে পারেন মাসে মাত্র ৫ দিন। বেতন মাত্র দশ হাজার টাকা আমি একটু আশ্চর্য হয়ে বললাম চলে কী করে? উত্তরে বলল, যাত্রীদের কাছে বকশিশ বাবদ কিছু পাই তাই দিয়ে পুষিয়ে নিতে হয়। অনেকটা হতাশার সুরে বলল পশ্চিম বাংলায় কোনো কাজের সুযোগ নেই। পয়সাও নেই যে চাকরির জন্য চেষ্টা করব। চাকরি পেতে গেলে পয়সা লাগে।

পশ্চিমবাংলার মানুষের মধ্যে হতাশার জন্ম নিয়েছিল সেখান থেকে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল তারই প্রতিফলন ঘটেছে এবারের নির্বাচনে। নির্বাচনে তৃণমূলের এই পরাজয়ের কারণ হিসাবে যে কারণগুলি কাজ করেছে তার অন্যতম একটি বেকারত্ব, বাংলায় শিল্প উদ্যোক্তাদের হতাশ করার ফলে পশ্চিম বাংলায় কোনো বিনিয়োগ না থাকার ফলে বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্নীতির মাত্রা এমন এক পর্যায়ে গিয়েছিল অযোগ্য এবং অদক্ষ লোকের পদায়ন বিশেষ করে শিক্ষা ক্ষেত্রে অযোগ্য ব্যক্তিকে অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ প্রদান করার ফলে শিক্ষা ব্যবস্থা অনেকটা ভেঙে পড়েছিল ফলশ্রুতিতে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছিল।

বিভিন্ন প্রকল্পের নামে তৃণমূল কর্মীরা অর্থ উত্তোলন করে নিজের পকেট ভর্তি করার অভিযোগ রয়েছে। জনগণের কাছে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দলের বিপক্ষের রাজনৈতিক দল পশ্চিম বাংলার শাসকগোষ্ঠী হবার ফলে উন্নয়ন বরাদ্দ থেকে তারা বঞ্চিত হয়েছে। সর্বশেষ বিধান সভা নির্বাচনের থেকে ভোট কমেছে তৃণমূলের প্রায় ৮ শতাংশ আর একদিকে বিজেপির ভোট বেড়েছে ৮ শতাংশ। একজনের ৪৮ থেকে ৪০ আরেকজনের ৪০ থেকে ৪৮। অনেকের ধারণা তৃণমূলের ভোট ব্যাংক হিসেবে খ্যাত মুসলিম ও অন্যান্য ধর্মের ভোটে বিজেপি হাত দিতে পেরেছে। পশ্চিম বাংলায় বিভিন্ন ভাতার প্রচলন ছিল যা অনেককে কর্মবিমুখ করেছে কর্মবিমুখতার ফলশ্রুতিতে বেকারত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে ফলে তার প্রভাব অর্থনীতিতে পড়েছে।

“যুবশক্তি” ভাতার ক্ষেত্রে দুর্নীতি যুবকদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। আরজিকর কাণ্ডের সুবিধাটুকু বিজেপি নিতে পেরেছে খুব ভালোভাবে। ভারতীয় জনতা পার্টির নির্বাচনী কৌশল হিসাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে পশ্চিমবাংলা সফর করতে হয়েছে। ঝাল মুড়ি বিক্রেতার সাথে আলাপচারিতার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। যা ভোট যুদ্ধে কাজ করেছে। ছোট একটা ফুটেজকে কীভাবে কাজে লাগাতে হয় বিজেপির মিডিয়া উইং সেটি করেছে। অমিত শাহ পশ্চিম বাংলায় আসা যাওয়া ছিল নির্বাচনে জয়ী হবার প্রত্যাশা নিয়ে। শুভেন্দু অধিকারীর মা ১৯৬০ সালে বাংলাদেশের বরিশাল হতে পশ্চিম বাংলায় গিয়েছেন শুভেন্দু বাবু এখন ভারতের নাগরিক প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঘনিষ্ঠ হবার জন্য তার আপ্রাণ চেষ্টা তাকে রাজনৈতিক সফলতা এনে দিয়েছে। নন্দীগ্রাম এবং ভবানীপুর থেকে জয়ী হয়ে তিনি এখন মূখ্যমন্ত্রী হবার দৌড়ে আছেন। অনেকটা কোণঠাসা মানুষ এখন বিজেপির প্রথম সারির নেতাদের কাছের মানুষে পরিণত হয়েছেন। মাঠে ছিলেন, বিভিন্ন বক্তব্যের মধ্যদিয়ে নিজেকে আলোচিত করেছেন। বিজেপি নারী কর্মীরা নির্বাচনি কৌশল হিসাবে উঠান বৈঠক করেছেন পাড়ায় পাড়ায়। নারী ভোটকে কাছে টানতে পেরেছেন খুব ভালো ভাবে।

মূখ্যমন্ত্রী মমতা তিস্তার পানি বণ্টন বিষয়ে যে নেতিবাচক আচরণ করেছেন কেন্দ্রের সাথে সেটি প্রতিবেশী সীমান্তবর্তী রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের কাম্য ছিল না। প্রতিবেশী রাজ্য হওয়া সত্ত্বেও বন্ধুত্বের আচরণ ছিল না মোটেও। ভারতের নির্বাচন কমিশন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে যে দক্ষ সেটি প্রমাণ করেছেন এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। বিজেপি চেয়েছিল লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সেটি তারা পেয়েছে আর সেটিকে কাজে লাগিয়েছে। ধর্ম ভিত্তিক রাজনৈতিক দল হয়েও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করার কঠিন চ্যালেঞ্জ তারা গ্রহণ করেছে খুব ভালোভাবে।

বিজেপির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ১৯৫১ সালে ভারতীয় জনসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৯৭৭ সালে সেটি রূপ নেয় জনতা পার্টিতে, ১৯৮০ সালে পরিণত ভারতীয় জনতা পার্টিতে ১৯৮০ থেকে সংগঠন শক্তিশালী করা হয়। ১৯৯৮ সালে সরকার গঠন। ২০১৪ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। সর্বভারতীয় দল হিসাবে কঠিন চ্যালেঞ্জ নিতে হয়েছে তাদের। তৃণমূল কর্মীদের ভোটচুরির অপবাদ মাথায় নিতে হয়েছে বিগত নির্বাচনে। পশ্চিম বাংলার বাইরে যেতে হয়েছে কাজের জন্য পশ্চিম বাংলার মানুষকে। নৈরাজ্য ছিল স্বাস্থ্য খাতে যার ফলে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের হাসপাতালে রোগীর চাপ বেড়েছে। চেন্নাই, ভেলোর হায়দ্রাবাদ যার প্রমাণ। পশ্চিম বাংলায় এই বড় জয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন “পদ্ম ফুটল বাংলায়! সবার কাছে আমি নতজানু”। ঐতিহ্যবাহী ধুতি-পাঞ্জাবি পরে তিনি বিজেপি দিল্লি অফিসে যে বক্তব্য দিয়েছেন সেটি ইতিবাচক। এই জয়ের পরবর্তী পর্যায়ে মন্ত্রী সভার প্রথম বৈঠকেই অনুমোদন পেতে চলছে “আয়ুষ্মান ভারত” প্রকল্প, নারী সুরক্ষা ও বেকারত্ব দূরীকরণে বিশেষ জোর, অনুপ্রবেশাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থার বার্তা প্রধানমন্ত্রীর, দেশের উন্নয়নের গতি সঙ্গে পা মেলাবে পশ্চিম বঙ্গ সহ এক গুচ্ছ প্রকল্পের আশ্বাস পেতে চলেছে পশ্চিম বাংলা।

আমরা সকলে অপেক্ষায় ছিলাম পশ্চিম বাংলার নির্বাচন নিয়ে। ভারত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সে হিসাবে নির্বাচন হয়েছে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে প্রত্যাশা থাকবে নির্বাচন পরবর্তী সংঘাত যেন হয়। সহিংসতা রোধে বিজয় মিছিল করতে নিষেধ করা হয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উন্নয়নে নতুন সরকার কেন্দ্রীয় সরকারকে সহযোগিতা করবে। গণতন্ত্রের মূল কথা হচ্ছে জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া। বিজেপি’র পঞ্চবাণে ধরাশায়ী হয়েছে তৃণমূল নেতৃত্ব বাউন্স ব্যাক প্রত্যয়ের কথা বলেছে অপেক্ষা করতে হবে আগামী দিনগুলির জন্য। কেরালার প্রভাবশালী নেতাকে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছেন ফাতিমা। অভিনন্দন ফাতিমাকে তার নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের জন্য। অহংকার যে পতনের মূল কারণ তার প্রমাণ পশ্চিম বাংলার নির্বাচন।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন