দক্ষিণাঞ্চলের দৃষ্টিখ্যাত খানজাহান আলী থানাধীন বাদামতলায় অবস্থিত খুলনা বিএনএসবি চক্ষু হাসপাতাল। হাসপাতালটি পদ্মার এপারের সর্ববৃহৎ চক্ষু রোগের আধুনিক চিকিৎসা কেন্দ্র। সকল শ্রেণি পেশার মানুষের চোখের চিকিৎসায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আধুনিক যন্ত্রপাতি সজ্জিত প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবল দ্বারা পরিচালিত হয় এ প্রতিষ্ঠানটি। স্বল্প খরচে বা বিনামূল্যে চোখের চিকিৎসায় অলাভজনক স্বেচ্ছাসেবী এ প্রতিষ্ঠানটির সুনাম রয়েছে দীর্ঘদিনের।
১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর গত বছর পর্যন্ত হাসপাতালটিতে সর্বমোট চোখের অপারেশন হয়েছে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৬০৪টি। এরমধ্যে চোখের ছানি অপারেশনের সংখ্যা ২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৯৩। বাকী ৫১ হাজার ৬১১ জনের চোখের অন্যান্য অপারেশন করা হয়েছে। গত বছর শুধুমাত্র ১৯ হাজার ৯৪৩ জন রোগীর চোখ অপারেশন করা হয়েছে। এরমধ্যে ছানি অপারেশন ১৭ হাজার ৭৮১টি। বাকী ২ হাজার ১৬২টি অন্যান্য অপারেশন। চলতি বছর ২০ হাজারের অধিক রোগীর চোখ অপারেশনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কিন্ত গত দু’সপ্তাহেরও অধিক সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটিতে নানা ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। ফলোশ্রুতিতে বিঘ্নিত হচ্ছে হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসা কার্যক্রম। বন্ধ রয়েছে শিশুদের চক্ষু অপারেশন। সম্প্রতি ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে খুলনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য আলী আসগর লবী দায়িত্ব নিলেও গঠিত হয়নি পূর্ণাঙ্গ বোর্ড কমিটি। বিভ্রান্তি রয়েছে চেয়ারম্যান পদ নিয়ে। বিএনপি সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)’র সাবেক জেলা কমিটির সভাপতি আলোচিত ডা. রফিকুল হক বাবুল এখনও নিজেকে বোর্ড চেয়ারম্যান হিসেবে দাবি করছেন। অভিযোগ রয়েছে ৫ আগস্টের পর নীতিমালা ভঙ্গ করে চেয়ারম্যান বনে যান তিনি। তার বিরুদ্ধে হাসপাতালের নীতিমালা ভঙ্গসহ নানাবিধ অভিযোগ রয়েছে। হাসপাতালে কর্মরত অনেকেরই তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ এবং অসন্তোষ রয়েছে। ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক কাজের চেয়ে ওটি নিয়ে ব্যস্ত থাকাসহ রোগীদের চোখ নষ্ট করার অভিযোগ রয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর ট্রাস্টি বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান হন জামায়াত নেতা মুন্সী মইনুল ইসলাম। এরপর থেকে হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালিত হতে থাকে তার এবং অপর জামায়াত নেতা মিয়া গোলাম কুদ্দুসের নির্দেশনা মোতাবেক। অভিযোগ রয়েছে, মুন্সি মইনুল ইসলাম অনুগতদের নিয়ে হাসপাতালের অর্থ ব্যয়ে সকালের নাস্তা করতেন। প্রভাব খাটিয়ে সাবসিটি দিয়ে রোগীর চক্ষু অপারেশনের সুপারিশ করতেন। দুইনেতা সংসদ নির্বাচনে হাসপাতালের অভ্যন্তরে বসে দাঁড়িপাল্লার লিফলেট বিতরণ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া কর্মচারীদের দাঁড়িপাল্লায় ভোট না দিলে চাকুরীচ্যুত করারও হুমকি দেয়া হয়।
১৩ এপ্রিল হাসপাতালটি পরিদর্শনে আসেন সংসদ সদস্য আলী আসগর লবি। এ সময় তার সাথে থাকা স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীদের তোপের মুখে পড়েন ডা. রফিকুল হক বাবুল। এরপর অপ্রত্যাশিতভাবে বোর্ডের কমিটি ভেঙ্গে দেন এমপি লবি। চেয়ারম্যান হওয়ার প্রসঙ্গে তার নাম উঠলে ডা. রফিকুল হক বাবুল তাকে ওয়েলকাম জানান। এরপর আলী আসগরর লবী দলীয় নেতা কর্মীদের নিয়ে চলে যান। এ ঘটনার পর থেকে ডা. রফিকুল হক বাবুল হাসপাতালে আসেননি।
এ পরিস্থিতিতে গত দু’সপ্তাহের অধিক সময় ধরে হাসপাতালে নানান অস্থিরতা বাড়তে থাকে। অস্থিরতা থেকে বাদ নেই কর্মরত নার্স, প্যারামেডিক্স, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং চিকিৎসকরাও।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর তিনি যোগদানের পর থেকে নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। নিজে বিএনপি’র সমর্থিত চিকিৎসক সংগঠনের নেতা হয়েও জামায়াত নেতাদের সাথে সখ্যতা তৈরি করেন। নীতিমালা ভঙ্গ করে প্রশাসনিক পদে নিয়োগ দিয়েছেন। নিজের কর্মস্থল থেকে জোরপূর্বক কাগজে সই করিয়ে একজন কর্মচারীকে অন্যত্র সরিয়ে দেন। এছাড়া বিএনপি’র সমর্থিত আশিক নামে এক চিকিৎসক এবং মাজাহার নামে এক কর্মচারীকে চাকুরীচ্যুত করেন।
নিজের বিরুদ্ধে এ সকল অভিযোগ অস্বীকার করে ডা. রফিকুল হক বাবুল বলেন, অন্তবর্তীকালীন সরকার আসার পর ট্রাস্টি বোর্ডের সবাই পালিয়ে যায়। এরপর আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয়। দায়িত্ব পাওয়ার পর হাসপাতালটিকে নিয়মের ভিতর আনার চেষ্টা করেছি। ১৭ বছর কোন নিয়ম কানুন মানা হয়নি। নিয়ম কানুন মানতে যেয়ে আমরা বিপদে পড়েছি। নীতিমালা না মানায় অনেককে শোকজ করেছি। অনেকের চাকরি গেছে। এ কারণে তারা আমার উপর অসন্তুষ্ট। এমপি মহোদয় হাসপাতাল পরিদর্শনে আসলে কথা প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান হিসেবে ওনার নাম উঠলে ওয়েলকাম জানিয়েছে। উনি যদি চেয়ারম্যান হতে চান অবশ্যই হবেন। এ কথা বলেছি। এজন্য তো মব সৃষ্টির দরকার ছিল না।
ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, কমিটি শতভাগ স্বচ্ছতার সাথে কাজ করেছে। রোগীর চাপ বাড়ছে, স্পেস নেই, স্টাফ লাগবে এসব নিয়ে কমিটি কাজ স্টার্ট করেছিল। রোগীদের চোখ নষ্টের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন ‘কি কারণে চোখ নষ্ট হয়েছে আপনারা খতিয়ে দেখে সত্য উদঘাটন করুন।’
নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন উল্লেখ করে জামায়াত নেতা মুন্সি মইনুল ইসলাম খুলনা গেজেটকে বলেন, ‘মানুষ যখন ক্ষমতার জন্য পাগল হয়ে যায় প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য বিভিন্ন ধরনের মিথ্যাচার করতে থাকে। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোন রকম দুর্বলতা দেখায়নি। ডাইরেক্টর যখন বলেছে আমরা চেকে স্বাক্ষর করতে গিয়েছি। হাসপাতাল তো নাস্তা করার জায়গা না।
হাসপাতালের নীতিমালা অনুযায়ী ডাইরেক্টর শুধুমাত্র সাবসিটি দিতে পারেন। দেড় বছরে সর্বোচ্চ দশটা অসহায়, গরিব রোগীর জন্য হয়তো আমি সুপারিশ করেছি। আমার কোন দলীয় নেতা-কর্মী এমনকি ফুলতলা জামায়াতের আমিরও কখনো, কোনদিন ওখানে যায়নি।’
খুলনা গেজেট/এনএম

