পহেলা বৈশাখ-বাঙালির চিরায়ত আত্মপরিচয়ের এক অনন্য উৎসব। মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে ‘বঙ্গাব্দ’ বা বাংলা সনের যে সূচনা হয়েছিল, কালের বিবর্তনে তা আজ কেবল দিনপঞ্জিকা পরিবর্তনের উপলক্ষ নয়; বরং জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির এক অসাম্প্রদায়িক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। সংকীর্ণতার দেয়াল ভেঙে মানুষে মানুষে সংযোগ স্থাপনের এই লোকজ ঐতিহ্য আজ বিশ্ব ঐতিহ্যেরও অংশ। বিশেষ করে তিলোত্তমা ক্যাম্পাসগুলোতে পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হয় প্রাণের স্পন্দনে, যেখানে তারুণ্যের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় সাম্য ও সম্প্রীতির জয়গান।
এবারের নববর্ষ উদযাপন ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে নিজেদের ভাবনা ব্যক্ত করেছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী। তাদের বক্তব্যে ফুটে উঠেছে বাঙালি সংস্কৃতিকে আগলে রাখার দৃঢ় প্রত্যয়।
আয়েশা রেজা সাদিয়া বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ মানেই সব ভেদাভেদ ভুলে বাঙালির প্রাণের উৎসবে এক হওয়া, যেখানে ধর্ম-বর্ণ বা পরিচয় ছাপিয়ে কেবল ‘বাঙালি’ সত্তাই প্রধান হয়ে ওঠে। আমাদের ক্যাম্পাসের এই উৎসব কেবল একটি দিন উদযাপন নয়, বরং চারুকলার আল্পনা আর দেয়ালচিত্রে ফুটে ওঠা অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক জীবন্ত প্রতিফলন, যা সংকীর্ণতাকে জয় করে তরুণ প্রজন্মকে ঐক্যের সুতোয় বাঁধে। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি, আধুনিকতার ভিড়েও আমাদের লোকজ ঐতিহ্য আর এই মিলনমেলাই হলো আমাদের শক্তির মূল উৎস, যা সব বিভাজন দূর করে এক বৈষম্যহীন ও সম্প্রীতির আগামীর স্বপ্ন দেখায়।’
সৈয়দা নুসাইবা সুলতানা বৈশাখ বলেন, ‘অসাম্প্রদায়িক চেতনার আলোকবর্তিকা হিসেবে পহেলা বৈশাখ আমার কাছে এক অনন্য পরিচয়ের নাম। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমি মনে করি এই উৎসবের প্রকৃত অর্থ হলো সব ভেদাভেদ ভুলে একসাথে নতুনকে বরণ করা। ধর্ম, জাতি বা মতের ভিন্নতা এখানে কোনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না-সবার পরিচয় কেবল ‘বাঙালি’। মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো আয়োজনগুলোতে অংশ নিতে গিয়ে সত্যিই মনে হয় আমরা সবাই এক সুতোয় গাঁথা। চারুকলার শিক্ষার্থী হিসেবে এই দিনটি আমার জন্য আরও বেশি আনন্দের, কারণ প্রতিবছর সবাই মিলে মুকুট, মুখোশসহ নানা শোভাযাত্রার উপকরণ তৈরি করার যে অভিজ্ঞতা, তা আমাদের সৃজনশীলতাকে একত্রে প্রকাশ করার সুযোগ করে দেয়।’
মোঃ তামিম হাসান বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ মূলত বাংলার কৃষিভিত্তিক সংস্কৃতির অংশ হিসেবে কৃষকদের জন্য শুরু হলেও বর্তমানে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক উৎসব হিসেবে পালিত হচ্ছে। ধর্মপরিচয়ের ঊর্ধ্বে হয়ে উঠে এসেছে বাঙালি পরিচয়। আধুনিকতা বা পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে আমাদের এই লোকজ অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যের মান কোনোভাবে ক্ষুণœ হয়নি, কারণ আমাদের দেশের শিক্ষার্থী এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এই পহেলা বৈশাখকে বাঙালির সংস্কৃতির পরিচয় হিসেবে বিশ্বে তুলে ধরেছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পহেলা বৈশাখী আয়োজনে পান্তা-ইলিশ, পিঠা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সব ধর্মের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়।’
রুবিয়া আক্তার বলেন, ‘পহেলা বৈশাখকে ‘অসাম্প্রদায়িক উৎসব’ বলার প্রকৃত অর্থ আমার কাছে হলো এটি এমন একটি দিন, যেখানে ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি বা মতের ভেদাভেদ ভুলে সবাই শুধু ‘বাঙালি’ পরিচয়ে একত্রিত হয়। অন্য সব উৎসবের তুলনায় নববর্ষের এই সার্বজনীনতা আমাকে ভীষণভাবে আকর্ষণ করে, কারণ এখানে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য সীমাবদ্ধতা নেই-সবাই সমানভাবে অংশ নিতে পারে। সহজ ভাষায় যদি বলতে চাই, এটি এক ধরনের মুক্ত আনন্দের দিন।’
পূজা কুন্ডু বলেন, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো আয়োজনে অংশ নিতে গিয়ে সত্যিই মনে হয়েছে, এখানে সবার পরিচয় একটাই-বাঙালি। গত বছর আমি বন্ধুদের সাথে শোভাযাত্রায় অংশ নিয়েছিলাম, সেখানে কোনো ভিন্নতা চোখে পড়েনি, শুধু ছিল একতা। চারুকলা বা সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর দেয়ালচিত্র ও আল্পনায় যে অসাম্প্রদায়িকতার বার্তা ফুটে ওঠে, তা আমাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। এই শিল্পকর্মগুলো শুধু সৌন্দর্য নয়, বরং আমাদের ঐক্য, সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতীক হিসেবেও কাজ করে।’
কাজী রিফাত মোর্শেদ বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থী হিসেবে আমার কাছে এর প্রকৃত তাৎপর্য হলো-সব ধরনের পরিচয়, বিভেদ ও সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে একটি আনন্দঘন পরিবেশে সবার একত্রিত হওয়া। বিশেষ করে মঙ্গল শোভাযাত্রা আমাদের এই সম্মিলিত চেতনাকে আরও দৃঢ়ভাবে প্রকাশ করে।
আমাদের এই সমৃদ্ধ নববর্ষের সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে হলে নিয়মিত সংস্কৃতি চর্চার বিকল্প নেই। আগামী প্রজন্মকে আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করানো এবং তাদের এতে সম্পৃক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।’

