শনিবার । ১১ই এপ্রিল, ২০২৬ । ২৮শে চৈত্র, ১৪৩২
বেওয়ারিস কুকুরের উপদ্রব বাড়ায় শহরবাসী আতঙ্কে

হাসপাতালে জলাতঙ্ক রোগের ভ্যাকসিন সংকট

নিজস্ব প্রতি‌বেদক, সাতক্ষীরা

সাতক্ষীরা জেলা শহরে হঠাৎ করে বেওয়ারিস কুকুরের উপদ্রব আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। প্রতিদিন জেলা শহরের কোথাও না কোথাও মানুষ কুকুরের কামড়ের শিকার হচ্ছেন। গতকাল শুক্রবার সকালে শহরের পুরাতন সাতক্ষীরা ঘোষপাড়া এলাকায় একসঙ্গে চারজনকে কামড়ে আহত করে বেওয়ারিস কুকুরের একটি দল। এতে করে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।

পুরাতন সাতক্ষীরা ঘোষপাড়া এলাকার বাসিন্দা ব্যবসায়ী মোঃ আব্দুস সামাদ জানান, “শুক্রবার সকাল ৮টার দিকে ঘাষপাড়া এলাকার বেওয়ারিস কুকুরের একটি দল তিন শিশুসহ চারজন পথচারীকে কামড়ে আহত করে। পথে চলার সময় হঠাৎ করেই কুকুরগুলো আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং পথচারীদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদেরকে কামড়ে আহত করে। কুকুরের কামড়ে আহতরা হলো, পুরাতন সাতক্ষীরা ঘোষপাড়া এলাকার আহম্মাদ আলীর ছেলে মোঃ আব্দুল হাই (৫৪), একই এলাকার মোঃ হামিজ উদ্দিনের ছেলে মোঃ আব্দুল গফ্ফার (৮), মোঃ আব্দুল বারীর ছেলে মোঃ আহসান উল্লাহ (১৩) ও মোঃ আব্দুল হাকিমের ছেলে মোঃ ফারুক হোসেন (১২)।

শহরের পলাশপোল এলাকার ব্যবসায়ী মেঃ ওকালত হোসেন সানা জানান, “আমরা কয়েকজন ফজরের নামাজের পর প্রতিদিন ভোরে পৌরসভার প্রাণসায়ের খাল পাড়ের রাস্তা দিয়ে হাঁটাহাঁটি করি। কিন্তু অনেক সময় রাস্তায় দল বেধে বেওয়ারিস কুকুর ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। ফলে ভয়ে প্রায়ই আমাদের অন্য রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হয়। অনেক সময় রাস্তায় বেওয়ারিস কুকুরের দল দেখে মনিংওয়ার্কে বের হওয়া নারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। এছাড়া প্রায়শ শহরের বিভিন্ন এলাকায় বেওয়ারিস কুকুরের কামড়ে লোকজন আহত হচ্ছে বলে শোনা যায়। তিনি রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো বেওয়ারিস কুকুর নিধনে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পৌর কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

এদিকে, সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে কুকুর-বিড়াল সহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড় ও আঁচড়ে আহত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। প্রতিদিন প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ রোগী হাসপাতালের ভ্যাকসিন কর্নারে ভীড় জমাচ্ছেন। কিন্তু গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর থেকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন প্রদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে চড়া দামে ভ্যাকসিন কিনে এনে দিচ্ছেন।

অপরদিকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে এন্টিরেবিস ভ্যাকসিন সংকটের কারণে অবৈধভাবে সুযোগ নিচ্ছেন কিছু অসাধু ফার্মেসি মালিকরা। তারা মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দ্বিগুণ দাম বিক্রি করছেন এই ভ্যাকসিন। পূর্বের নির্ধারিত ৪৫০ টাকার ভ্যাকসিন তারা ৮০০ টাকা থেকে ৯০০ টাকা নিচ্ছেন।

এমন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে কুকুরের কামড়র প্রতিষেধক (এন্টিরেবিস) ভ্যাকসিনের সংকটের কারণে। হাসপাতালে গিয়ে অনেকেই ভ্যাকসিন না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসছেন। বাধ্য হয়ে রোগীদের বাইরে থেকে উচ্চমূল্যে ভ্যাকসিন কিনতে হচ্ছে, যা নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য বড় ধরনের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভুক্তভোগীরা জানান, “সরকারি হাসপাতালে সহজলভ্য চিকিৎসা না থাকায় তারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। অনেকেই সময়মতো ভ্যাকসিন নিতে না পেরে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন।”

মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মানস কুমার বলেন, “জলাতঙ্ক প্রাণঘাতী রোগ। কামড়ের পর নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ভ্যাকসিন না নিলে মৃত্যুঝুঁকি অনিবার্য। তাই এই ভ্যাকসিনের সংকট থাকলেও রোগীকে বাধ্যতামূলক চার থেকে পাঁচ ডোজ নিতে হয়।”

সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের সিভিল সার্জন ডাঃ আব্দুস সালাম বলেন, “গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর থেকে হাসপাতালে এন্টি রেবিস ভ্যাকসিনের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। আমরা অনেক আগেই বরাদ্দ পত্র পাঠিয়েছি। কিন্তু সরবরাহ পাচ্ছি না। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে মাঝামাঝি নাগাদ ভ্যাকসিনের বরাদ্দ পাওয়ার কথা ছিল। এখনো পাওয়া যায়নি। আশা করছি দ্রুত এই ভ্যাকসিন আমরা পেয়ে যাবো।”

স্থানীয় সচেতন মহল দ্রুত বেওয়ারিস কুকুর নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সদর হাসপাতালে জরুরি ভিত্তিতে পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন। অন্যথায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন