বৃহস্পতিবার । ৯ই এপ্রিল, ২০২৬ । ২৬শে চৈত্র, ১৪৩২

সাম্প্রতিক যেসব যুদ্ধে পরাজিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

এক রাতে ইরানের পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে বলে হুমকি দেওয়ার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি প্রবল হলেও ইরানের কৌশলের কাছে নৈতিকভাবে হেরে গেছে দেশটি। আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে ইরানিদের সাহসী লড়াই ও নানা কৌশলের কারণেই আমেরিকার পরাজয় হয়েছে।

সামরিক দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যে অত্যন্ত শক্তিশালী এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়গুলো তাদের একের পর এক পরাজয়ের গ্লানিই বরণ করতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পরাজয়ের একটি উদাহরণ হলো আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার। প্রায় ২০ বছর যুদ্ধ চালানোর পর দেশটি পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হয়। তালেবানরা আবার ক্ষমতা ফিরে পায়।

যুক্তরাষ্ট্র-ভিয়েতনাম যুদ্ধ
দীর্ঘ ২০ বছর ধরে চলা ভিয়েতনাম যুদ্ধ (১৯৫৫-১৯৭৫) শেষ হয় যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। ঠান্ডা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে শুরু হওয়া এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ ভিয়েতনামকে সমর্থন দিলেও শেষ পর্যন্ত কমিউনিস্ট উত্তর ভিয়েতনামের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়।

যুদ্ধের সূচনা হয় ভিয়েতনামকে কমিউনিস্ট উত্তর ও যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত দক্ষিণে বিভক্ত করার মাধ্যমে। যুক্তরাষ্ট্র ‘ডোমিনো থিওরি’ অনুযায়ী আশঙ্কা করেছিল, একটি দেশ কমিউনিস্ট হলে আশপাশের দেশগুলোও একই পথে যাবে। এটা রোধ করতেই তারা সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।

তবে যুদ্ধের ময়দানে গেরিলা কৌশল, ঘন জঙ্গলভিত্তিক লড়াই এবং স্থানীয় জনগণের সমর্থন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। আধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তিগত শক্তি থাকা সত্ত্বেও এসব কৌশলের কার্যকর মোকাবিলা করতে পারেনি মার্কিন বাহিনী।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধ চলতে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে তীব্র যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন গড়ে ওঠে। হাজার হাজার সৈন্য নিহত হওয়া এবং বিপুল অর্থনৈতিক ব্যয় সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।

অবশেষে ১৯৭৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র সেনা প্রত্যাহার শুরু করে। এর দুই বছরের মাথায়, ১৯৭৫ সালের ৩০ এপ্রিল, উত্তর ভিয়েতনামের বাহিনী রাজধানী সাইগন দখল করে নেয়। এর মাধ্যমে দক্ষিণ ভিয়েতনামের পতন ঘটে এবং পুরো দেশ কমিউনিস্ট শাসনের অধীনে একত্রিত হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, সামরিকভাবে কিছু সাফল্য পেলেও যুক্তরাষ্ট্র তাদের মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়। ফলে ভিয়েতনাম যুদ্ধকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বড় কৌশলগত পরাজয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ভিয়েতনাম যুদ্ধ দেখিয়েছে, শুধু সামরিক শক্তি নয়, রাজনৈতিক লক্ষ্য ও জনসমর্থনই একটি যুদ্ধের চূড়ান্ত ফল নির্ধারণ করে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরাক যুদ্ধ
যুক্তরাষ্ট্র-ইরাক যুদ্ধ (২০০৩-২০১১) ছিল মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও বিতর্কিত সংঘাত, যার মাধ্যমে ইরাকের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের শাসনকালের অবসান ঘটে।

২০০৩ সালের ২০ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ‘অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম’ শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ছিল ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে এবং দেশটি সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে জড়িত। যদিও পরবর্তীতে এসব দাবির পক্ষে সুস্পষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

প্রাথমিক পর্যায়ে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত সামরিক সাফল্য অর্জন করে। একই বছরের এপ্রিল মাসেই রাজধানী বাগদাদ দখল করা হয় এবং সাদ্দাম হোসেনের পতন ঘটে। পরে মার্কিন বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে এবং ২০০৬ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

তবে যুদ্ধের পর শুরু হয় দীর্ঘস্থায়ী বিদ্রোহ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা। আল-কায়েদা এবং পরবর্তীতে আইএসআইএসের মতো জঙ্গি গোষ্ঠীর উত্থান পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে। যুক্তরাষ্ট্র ২০১১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে সেনা প্রত্যাহার করে নেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, সামরিকভাবে দ্রুত বিজয় অর্জন করলেও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ-পরবর্তী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়। ফলে অনেকেই এই যুদ্ধকে আংশিক সামরিক সাফল্য হলেও কৌশলগতভাবে বিতর্কিত বা ব্যর্থ হিসেবে বিবেচনা করেন।

যুক্তরাষ্ট্র-আফগানিস্তান যুদ্ধ
দীর্ঘ ২০ বছর ধরে চলা যুক্তরাষ্ট্র-আফগানিস্তান যুদ্ধ (২০০১-২০২১) শেষ হয়েছে তালেবানের পুনরায় ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ ঘোষণা করে আফগানিস্তানে তাদের সামরিক অভিযান শুরু করে।

২০০১ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা তালেবান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং আল-কায়েদার ঘাঁটি ধ্বংসের অভিযান চালায়। প্রাথমিকভাবে দ্রুত সাফল্য এলেও, পরবর্তী বছরগুলোতে তালেবান পুনর্গঠিত হয়ে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে।

দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চলতে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি ব্যয়বহুল ও কঠিন হয়ে ওঠে। মার্কিন সমর্থিত আফগান সরকারের দুর্বলতা, দুর্নীতি এবং স্থানীয় জনসমর্থনের অভাব পরিস্থিতি আরো জটিল করে তোলে।

২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তালেবানের মধ্যে একটি চুক্তি হয়, যার ভিত্তিতে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর ২০২১ সালে দ্রুতগতিতে তালেবান দেশটির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে।

২০২১ সালের আগস্টে রাজধানী কাবুলের পতন ঘটে এবং প্রেসিডেন্ট গণি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। কাবুল বিমানবন্দরে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সময় বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।

বিশ্লেষকদের মতে, সামরিকভাবে সাফল্য অর্জন করলেও যুক্তরাষ্ট্র তাদের মূল লক্ষ্য— একটি স্থিতিশীল ও কার্যকর আফগান সরকার গঠন— অর্জনে ব্যর্থ হয়। ফলে এই যুদ্ধকে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের একটি বড় কৌশলগত পরাজয় হিসেবে দেখেন।

অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র উপদেষ্টা ও কিলোওয়েন গ্রুপের চেয়ারম্যান ড. হারলান উলম্যান আলজাজিরার এক নিবন্ধে লিখেছেন, এই ব্যর্থতাগুলোর একটি বড় কারণ হলো ক্রমাগত মার্কিন প্রেসিডেন্টরা যুদ্ধ ও শান্তির বিষয়ে দায়িত্ব পালনে যথেষ্ট প্রস্তুত ছিলেন না। তারা বলপ্রয়োগের শর্ত সম্পর্কে গভীর জ্ঞানের অভাবে ভুগেছেন; যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনের ধারণাগুলো যাচাই করতে ব্যর্থ হয়েছেন; নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছেন; দলগত ভুল সিদ্ধান্তের শিকার হয়েছেন এবং সম্ভাব্য সব পরিণতি বিবেচনা না করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এসব কারণে কৌশলগত ভুল হয়েছে।

নিবন্ধের শেষে তিনি আরো বলেন, ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত যে সিদ্ধান্তই নেন না কেন, তিনি নিজেই নিজেকে এমন এক পরিস্থিতিতে ফেলেছেন, যেখানে ভালো কোনো বিকল্প নেই। ফলে ইরান যুদ্ধ তার প্রেসিডেন্সির সবচেয়ে ভয়াবহ সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন