বুধবার । ২৯শে এপ্রিল, ২০২৬ । ১৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩

দস্যু আতঙ্ক নিয়েই মধু আহরণে যাচ্ছে মৌয়ালরা

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন হচ্ছে সুন্দরবন। আগামী ১ এপ্রিল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সুন্দরবনে শুরু হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত মধু আহরণ মৌসুম। বন বিভাগের নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে ১১০০ কুইন্টাল মধু এবং ৬০০ কুইন্টাল মৌমাছির মোম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মধু আহরণের আগাম প্রস্তুতি হিসাবে সাজানে হচ্ছে মৌয়ালদের নৌকা। বনবিভাগ থেকে বৈধ পাশ নিয়েই তারা ঢুকবে বনে।

বিনবিভাগ সূত্রে জানা যায়, বন বিভাগের নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী বিগত ২০২৪-২০২৫ মৌসুমে সুন্দরবন সাতক্ষীরা রেঞ্জ এলাকা থেকে মধু আহরণের জন্য ২৪৮ টি বৈধ পাশের (পারমিট) বিপরীতে ১৭০৯ জন মৌয়াল বনে প্রবেশ করেছিল। এসময় প্রাকৃতিক চাক থেকে ৮৫৪. ৫ কুইন্টাল মধু ও ২৭৫. ৫ কুইন্টাল মৌমাছির মোম আহরণ করা হয়। চলতি ২০২৫-২০২৬ মৌসুমে পূর্ব নির্ধারিত এলাকা থেকে ১১০০ কুইন্টাল মধু এবং ৬০০ কুইন্টাল মৌমাছির মোম সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বনবিভাগ।

সূত্র আরও জানায়, “প্রতিবছরের মতো এবারও সুন্দরবনের বিভিন্ন রেঞ্জে পর্যায়ক্রমে মৌয়ালদের (মধু সংগ্রহকারী) বন প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। নির্ধারিত পাস (পারমিট) নিয়ে দলবদ্ধভাবে তারা গভীর বনে প্রবেশ করে প্রাকৃতিক চাক থেকে মধু সংগ্রহ করবেন। সাধারণত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত মধু আহরণ কার্যক্রম চলে।”

উপকূলীয় শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের ডুমুরিয়া গ্রামের মৌয়াল দল নেতা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “আমি একটি দল নিয়ে প্রতিবছর সুন্দরবনে মধু আহরণ করে থাকি। তারই ধারাবাহিকতায় এ বছরও ১২ জন মৌয়াল নিয়ে দল সাজিয়েছি। আগামী মাসের ১ তারিখে বনবিভাগ থেকে পাস নিয়ে সুন্দরবনের মধু আহরণ করতে রওনা হবো।” তিনি আরও জানান, “সুন্দরবনের মধু প্রাকৃতিক ও ভেজালমুক্ত হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “প্রতি বছরই জীবনের ঝুঁকি নিয়েই মধু সংগ্রহ করতে হয় তাদের। বনের ভেতরে রয়েল বেঙ্গল টাইগার, বিষধর সাপসহ নানা বন্যপ্রাণীর পাশাপাশি প্রতিকূল পরিবেশ তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া সম্প্রতি সময়ে বনদস্যুদের উপদ্রব বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা কিছুটা শঙ্কিত রয়েছেন। মুক্তিপণের দাবিতে একদিন আগেও এজন জেলেকে অপহরণ করেছে বনদস্যুরা। তারা সুন্দরবনে মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।

এদিকে সুন্দরবনে ডাকাত দলের অত্যাচার বৃদ্ধি হওয়ায় অনেক মৌয়াল এবার মধু আহরণে সুন্দরবনে যাচ্ছে না বলে জানা গেছে। নাম প্রকাশে অন ইচ্ছুক এক মৌয়াল বলেন, “ইতোমধ্যে ডাকাতদের একটি দল কর্তৃক আমাদের কাছে জন প্রতি ১০ হাজার করে টাকা দাবি করা হয়েছে। এভাবেই ৩ দল ডাকাতকে দিতে হবে টাকা। তবে এই টাকা দিয়ে এ বছর সুন্দরবনে মধু ভাঙতে যাবে না বেশ কিছু মৌয়াল।”

বুড়িগোয়ালিনী এলাকার মৌয়াল শাহাজান সরদার বলেন, “গত বছর সুন্দরবনে মধু খুঁজতে হঠাৎ বাঘের দেখা। মধু খুঁজতে, খুঁজতে সুন্দরবনের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে চলতে হয়। হঠাৎ করে আমার সামনে কিছু দূরে সুন্দরবনের হিংস্র বাঘ দাঁড়িয়ে আছে দেখতে পাই। দেখামাত্রই আমি হাক চিৎকার দিতে থাকি। সাথে সাথে আমার পাশে থাকা অন্য সহযোগীরা ছুটে আসে হাক ও গাছের উপর বাড়ি দিতে থাকে। এক পর্যায়ে হাক ডাক দেখে বাঘ আমাদের ছেড়ে পিছু হঠতে শুরু করে। তারপরেই আমরা চলে আসি নৌকাতে।

তিনি আরও বলেন, মধু খোঁজা আর বাঘ খোঁজা একই কথা। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সুন্দরবনে মধু খুঁজতে হয়।”

বন বিভাগ জানিয়েছে, মৌয়ালদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি বনজ সম্পদ রক্ষায় নির্ধারিত নিয়ম মেনে মধু সংগ্রহ করতে হবে। অপরিকল্পিতভাবে চাক ধ্বংস বা অতিরিক্ত আহরণ করলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

এদিকে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, অনুকূল আবহাওয়া ও বনজ পরিবেশ ভালো থাকলে এবার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে। এতে একদিকে যেমন সরকার রাজস্ব আয় পাবে, অন্যদিকে উপকূলীয় অঞ্চলের হাজারো মৌয়াল পরিবার জীবিকা নির্বাহে স্বস্তি পাবে।




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন