বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের পর উনসত্তরে বাঙালির আর একদফা বিজয় অর্জিত হয়। বাঙালি নিজেদেরকে লড়াকু জাতি হিসেবে প্রস্তুত করে। পাকিস্তান আমলের শেষ সময়টা খুলনার সামগ্রিক রাজনীতিতে বাঙালি জাতীয়তাবাদ প্রাধান্য বিস্তার করতে থাকে। উনসত্তরে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের পূর্বে এম এম সিটি কলেজে ছাত্র রাজনীতি ছাত্রলীগের অনুকূলে বইতে থাকে। প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে বলতে হয় ৬৮ সালের পূর্বে ছাত্রলীগ মনোনীত রূপসার আনন্দনগর গ্রামের মোল্লা মোশারফ হোসেন ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন (বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স মুজিব বাহিনী খুলনা জেলা ৭১)। ১৯৬৮-৬৯ সালে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রলীগ মনোনীত শেখ শহীদুল ভিপি এবং শেখ আজমল হোসেন জিএস নির্বাচিত হন। ৬৯-এর গণআন্দোলনের সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ছাত্রনেতাদের বিরুদ্ধে হুলিয়া ও নির্যাতন নেমে আসে। পূর্ব পাকিস্তান জামানার প্রথমদিকে ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদ ও ১৯৭০ সালের জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় হয়ে আছে। ৫৪’র নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের অভূতপূর্ব জয় আর ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের ভরাডুবি হয়। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর জাতীয় ও ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু’র নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়। এ অভূতপূর্ব বিজয়ের পর আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের প্রক্রিয়া শুরু করে। এক পর্যায়ে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেঃ ইয়াহিয়া খান ৭১-এর ৩ মার্চ জাতীয় সংসদে অধিবেশন আহ্বান করেন। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় একাত্তরের ১ মার্চ। সকাল থেকে ইথারে ইথারে খবর ভেসে আসে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট রেডিও ও টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবেন। দুপুর একটা নাগাদ প্রেসিডেন্টের ভাষণের পরিবর্তে রেডিওতে জাতীয় সংসদে ৩ মার্চের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা প্রচারিত হয়। রেডিওতে পাক প্রেসিডেন্টের এই ঘোষণার প্রতিবাদে খুলনা শহরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ছাত্র জনতা জঙ্গি মিছিল নিয়ে রাস্তায় নেমে পড়ে। ১ মার্চ বিএল কলেজে বিএ অনার্স পরীক্ষা চলছিল। রেডিওতে এই ঘোষণার প্রতিবাদে সেখানকার পরীক্ষার্থীরা পরীক্ষা বর্জন করে। বিকেলে ছাত্রলীগের উদ্যোগে আজম খান কমার্স কলেজ থেকে বের হওয়া বিক্ষোভ মিছিল মিউনিসিপ্যাল পার্কে এসে শেষ হয়। মিছিলের স্লোগান ছিল ‘জয় বাংলা’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’। মার্চের প্রথমে শহরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে দেওয়াল লিখনের প্রয়োজন হয়। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে শহরের আহসান আহমেদ রোডস্থ টিএন্ডটি অফিস (অধুনালপ্ত), পিকচার প্যালেস ভবনের বিপরীতে, নগর ভবন, তৎকালীন স্টেট ব্যাংক অফ বাংলাদেশ (আজকের বাংলাদেশ ব্যাংক), খুলনা প্রধান গেটে গভীর রাতে দেওয়াল লিখন হয়। দেওয়ালে স্লোগান ছিল ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো’। এতে ছাত্রলীগের সুশান্ত কুমার নন্দী (কমার্স কলেজ), আ ব ম নুরুল আলম (বিএল কলেজ), ইউসুফ আলী ভূঁইয়া, তালুকদার আব্দুল খালেক (সিটি কলেজ), নুরুল ইসলাম খোকন (সিটি কলেজ), শামসুদ্দোহা টিপু প্রমুখ অংশ নেয়।
৩ মার্চ স্বাধীনতার দাবিতে স্থানীয় মিউনিসিপ্যাল পার্ক (আজকের শহিদ হাদিস পার্ক) থেকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জঙ্গি মিছিল বের হয়। লোয়ার যশোর রোডস্থ টেলিফোন এক্সচেঞ্জ থেকে বেলুচ পুলিশ মিছিলের ওপর গুলি চালায়। মিছিলের নেতৃত্ব দেন তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, জাতীয় সংসদ সদস্য শেখ আব্দুল আজিজ, সাধারণ সম্পাদক প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হাবিবুর রহমান খান, জাতীয় সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন ইউসুফ, প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য এ্যাড. মমিনউদ্দিন আহমেদ, এ্যাড. এনায়েত আলি সানা, জেলা আওয়ামী লীগের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী প্রধান শেখ কামরুজ্জামান টুকু, বিএল কলেজ ছাত্র সংসদের ডিপি স. ম বাবর আলী প্রমুখ।
৩ মার্চ বিকেলে ছাত্র সমাজ কালীবাড়ী রোড ও কেডি ঘোষ রোডে কয়েকটি বন্দুকের দোকান লুট করে। তারা দোকানগুলো থেকে মুক্তিযুদ্ধের জন্য অস্ত্র সংগ্রহ করে। ৭ মার্চ স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের খুলনা কমিটি গঠন করা হয়। অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে আহ্বায়ক নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি। যুগ্ম আহ্বায়ক মনোনীত হন যৌথভাবে স. ম. বাবর আলী, হুমায়ুন কবির বালু (সিটি কলেজ)। সদস্যবৃন্দ শেখ আব্দুল কাইয়ুম, শেখ শহিদুল হক (সিটি কলেজ), হায়দার আলী, সালাউদ্দিন রুনু, হেকমত আলী ভূঁইয়া (সিটি কলেজ), শাহ আব্দুল কালাম, ফ.ম সিরাজ, মাহবুবুল আলম হিরন, শেখ শওকত আলী ও মিজানুর রহমান। ছাত্রলীগের ত্যাগী কর্মীদের নিয়ে জয় বাংলা বাহিনী গঠন করা হয়। এ বাহিনী জিলা স্কুল মাঠে প্রতিদিন বিকেলে স্কুলের ক্যাডেটদের ডামি রাইফেল নিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। ২৩ মার্চ সকাল ১০টা নাগাদ সাদা পোশাকে সুসজ্জিত হয়ে জয় বাংলা বাহিনী মিউনিসিপ্যাল পার্কে উপস্থিত হয়। এ সময় স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে পতাকা উত্তোলন করা হয়। খুলনায় এই প্রথম পতাকা উত্তোলন। ফেব্রুয়ারির শেষদিকে শহরের স্কুল-কলেজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। খুলনায় পাকিস্তান বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন লে. কর্নেল শামস। তার নেতৃত্বে স্বাধীনতা প্রত্যাশীদের গ্রেপ্তারের তালিকা ও হত্যার নীল নকশা তৈরি হয়। ২৫ মার্চ গণহত্যার পর বঙ্গবন্ধুর পূর্ব নির্দেশ মোতাবেক স্থানীয় ছাত্র-যুবকেরা মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকে। ২৬ মার্চ খান জাহান আলী রোডস্থ কবীর মঞ্জিলে (আলিয়া মাদ্রাসার অদূরে) বিপ্লবী পরিষদের কমিটি গঠন করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীরা হচ্ছেন, মোল্লা মোশাররফ হোসেন (সাবেক ভিপি, আনন্দনগর, রূপসা), শেখ জাহিদুর রহমান জাহিদ (বাগমারা), শেখ শহীদুল হক (সাবেক ভিপি, শেখপাড়া), শরীফ খসরুজ্জামান (সাবেক সংসদ সদস্য, নড়াইল)।
পাকিস্তান বাহিনী ২৬ মার্চ সকাল থেকে খুলনা শহরে কনভয় যোগে টহল দিতে শুরু করলে বিপ্লবী পরিষদের সদর দপ্তর খানজাহান আলী রোডের কবীর মঞ্জিল থেকে পূর্ব রূপসায় স্থানান্তর করা হয়। রূপসা নদীর পূর্ব পাড়ে রেলস্টেশনের অদূরে হামিদা মঞ্জিলে বিপ্লবী পরিষদের চেয়ারম্যান ২০০/২৫০ মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে এখানে অবস্থান নেন। এখানেই গড়ে ওঠে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। এটাই জেলার প্রথম ক্যাম্প। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টির জন্য একটি রেডিও সেন্টারের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের নবম সেক্টরের কমান্ডার মেজর এম এ জলিল গল্লামারীস্থ রেডিও সেন্টার দখল-এর জন্য বিপ্লবী পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ কামরুজ্জামান টুকু কে পরামর্শ দেন। সে সময় রূপসার হামিদা মঞ্জিল ও দেবীপুর গার্লস স্কুল ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থিতি জনমনে সাড়া ফেলে। এ যুদ্ধের জন্য অধিনায়ক নির্বাচন করা হয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সুবেদার মেজর শেখ জয়নুল আবেদীন কে। তার পারিবারিক নাম মানিক মিয়া তিনি তৎকালীন বাগেরহাট মহাকুমার চিতলমারী থানার আড়–য়াবর্ণি গ্রামের শেখ লেহাজ উদ্দীনের পুত্র। বেতার কেন্দ্র দখলের সিদ্ধান্ত হয় ৪ এপ্রিল তারিখে। রাত আনুমানিক ৯টা নাগাদ মুক্তিযোদ্ধাদের এ দলটি গল্লামারী রেডিও স্টেশনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
নৌকাযোগে সশস্ত্র যোদ্ধারা রূপসা নদী পার হওয়ার সময় এক যোদ্ধার রাইফেল থেকে গুলি বের হয়ে মাঝির শরীরে লাগলে ঘটনাস্থলেই তিনি প্রাণ হারান। তবুও যোদ্ধাদের মনোবল হারায়নি। যুদ্ধের অধিনায়ক অধুনালুপ্ত নিরালা বাজারের বিপরীতে সিটি কলেজের হোস্টেলের কাছে অবস্থান নেন। যেন শহরের দিক থেকে পাকিস্তানি বাহিনী গল্লামারী রেডিও সেন্টারের দিকে না আসতে পারে। মুক্তিযোদ্ধাদের অপর একটি দল রেডিও স্টেশনের কাছাকাছি অবস্থান নেয়। ৪ এপ্রিল প্রথম প্রহরে রেডিও স্টেশন দখলের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ শুরু হয়। রেডিও স্টেশনের কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে দাদা ম্যাচ ফ্যাক্টরির কর্মচারী, ঝালকাঠী মহাকুমার রাজাপুর থানার বদনীকাটি গ্রামের আশরাফ আলী খান-এর পুত্র হাবিবুর রহমান খান এবং আনসার বাহিনীর সদস্য বাগেরহাট মহাকুমার মোড়েলগঞ্জ থানার উত্তর সুতালড়ী গ্রামের হামেদ আলী হাওলাদার এর পুত্র মোসলেম আলী হাওলাদার শহীদ হয়। সেখান থেকে যোদ্ধারা তার লাশ এনে রূপসার দেবীপুর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের পেছনে দাফন করে। যুদ্ধরত অবস্থায় সিটি কলেজ ছাত্রাবাসের কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে যুদ্ধের অধিনায়ক শেখ জয়নুল আবেদীন শহীদ হয়। মুক্তিযোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করে বিভিন্ন ভাবে ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীরা হচ্ছেন মোল্লা মোশারফ হোসেন (স্বাধীনতা পূর্ব ছাত্র সংসদের ভিপি, আনন্দনগর, রূপসা), জাহিদুর রহমান জাহিদ (বাগমারা), শেখ শহীদুল হক (স্বাধীনতা পূর্ব ছাত্র সংসদের ভিপি, শেখপাড়া), এ্যাড. আ. ফ. ম মহাসীন (পশ্চিম টুটপাড়া), নাট্যকার জুল কাদির, শরীফ খসরুজ্জামান (সাবেক সংসদ সদস্য, নড়াইল), হুমায়ুন কবীর মোল্লা (আলফাডাঙ্গা, ফরিদপুর), আব্দুস সামাদ তরফদার (স্বাধীনতা পরবর্তী ছাত্র সংসদের ভিপি, কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা), শেখ আফজালুর রহমান (পৈপাড়া, খুলনা), আব্দুস সালাম (পূর্ব বানিয়াখামার), আব্দুস সামাদ (বসুপাড়া), শেখ মহাসীন (নৌ কমান্ড), শেখ মোঃ মিজানুর রহমান (তালা, সাতক্ষীরা), শেখ আতিয়ার রহমান (কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা), ইবনে সিনা ওয়াহিদ মিকি (ডুমুরিয়া, খুলনা), নুরুল ইসলাম মনু (টিবি ক্রস রোড, খুলনা), এস এম ওয়াহিদ উন নবী ( হাজী মহাসীন রোড, খুলনা), অধ্যক্ষ শেখ আব্দুল খালেক (চানমারী বাজার, খুলনা), চিত্তরঞ্জন স্বর্ণকার (কালিগঞ্জ, সাতক্ষীরা), জি এম হুমায়ুন কবীর (শ্যামনগর, সাতক্ষীরা), নুরুল ইসলাম খোকন (কেশবপুর, যশোর), শেখ আব্দুস সাত্তার (টুটপাড়া, খুলনা), খন্দকার আমিন রেজা (শিরিশনগর, খুলনা) নজরুল ইসলাম ইজারাদার (জিন্নাহপাড়া, খুলনা), এস এম জিয়াউল ইসলাম (ডুমুরিয়া, খুলনা), শেখ আবুল কাশেম (যাত্রাপুর, বাগেরহাট), আব্দুর রহমান সানা (কয়রা, খুলনা), শিকদার আনোয়ারুল ইসলাম (লোহাগড়া, নড়াইল), শেখ আজমল হোসেন (পাইকপাড়া, বাগেরহাট) ও শামসুর রহমান খান (পিরোজপুর)। এখানকার শিক্ষার্থীরা ভারতে গিয়ে বিহারের চাকুলিয়া, হাফলং, দেরাদুন সহ বিভিন্ন স্থানে প্রশিক্ষণ স্থাপন করে।
যুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এ্যাড আ. ফ. ম. মহাসীন বলেন, ১৯৬৮ সালে এ প্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছি ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেই। মেজর এম এ জলিল, মেজর জিয়াউদ্দিন আহম্মেদ ও ক্যাপ্টেন তাজুল ইসলাম এর অধীনে সুন্দরবন, বাগেরহাটের ভাসানচর, মুখআইট, মাধবকাটী ও সন্তোষপুরে যুদ্ধে অংশ নেই। ১৭ ডিসেম্বর বিজয়ী বেশে ফিরে আসি। এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ডুমুরিয়া নোয়াকাটী গ্রামের সন্তান এস. এম. জিয়াউল ইসলাম বলেন, স্বাধীনতা পূর্ব খুলনা জেলা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছি। পূর্ব থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ ছিলাম। ভারতের হাফলং সেনানিবাসে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছি। তিনি বলেন, আমার গর্ব ৪ এপ্রিল রেডিও সেন্টার দখলের যুদ্ধ, ফকিরহাটের দেওয়াপাড়া ও বটিয়াঘাটার বারোআড়িয়া যুদ্ধে অংশ নেই। এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী বাগেরহাটের যাত্রাপুরের শেখ আবুল কাশেম ১৯৬৯ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। তিনি কলকাতার দেরাদুনে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। বৃহত্তর খুলনা মুজিববাহিনীর প্রধান শেখ কামরুজ্জামান টুকুর নেতৃত্বে বাজুয়া, পাইকগাছা ও দেবহাটার যুদ্ধে অংশ নেন। ১৭ ডিসেম্বর বাগেরহাটে শত্রুমুক্ত বাংলাদেশে বিজয় উল্লাসে ফেটে পড়েন। প্রাক্তন শিক্ষার্থী লোহাগড়া শিকদার আনোয়ারুল ইসলাম তার এক প্রবন্ধে উল্লেখ করেন জুন মাসে ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। ৮ নম্বর সেক্টরের অধীনে বিশেষ মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে অবস্থান করি। বীরত্বের সাথে বিভিন্ন যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। রূপসার আনন্দ নগর গ্রামের সন্তান স্বাধীনতা পূর্ব কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি মরহুম মোল্লা মোশারফ হোসেন তার জীবদ্দশায় স্মৃতিচারণে বলেছেন মুজিব বাহিনীর সদস্য হিসেবে দেরাদুনে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। বৃহত্তর খুলনা মুজিববাহিনীর প্রধান শেখ কামরুজ্জামান টুকুর নেতৃত্বে পাইকগাছা হাইস্কুলে অবস্থানরত রাজাকারদের ক্যাম্প দখল করি। চুলকাটী যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছি। ৮৫ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে আলাইপুর ক্যাম্পে কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করি। নুরুল ইসলাম খোকন বলেন, মাতৃভূমির মুক্তির জন্য ৭১ সালে যুদ্ধ করেছি এটাই বড় গর্ব। তিনি বীরত্বের সাথে পাইকগাছা, কপিলমুনি, কানাইমুখ ও বারোআড়িয়া যুদ্ধে অংশ নেন। মুক্তিবাহিনীর এই গর্বিত সদস্য দেরাদুনে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। উল্লেখ করা যেতে পারে, স্বাধীনতা পূর্বকালে ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক শেখ আজমল হোসেন ৪ এপ্রিল গল্লামারী রেডিও সেন্টার দখলের যুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হয়। এ অবস্থায় তিনি গ্রামের বাড়িতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। ২ অক্টোবর ফকিরহাট উপজেলার সাতশিকা গ্রামে রাজাকার তাকে হত্যা করে। তিনি বাগেরহাট মহকুমার ফকিরহাটের রাখালগাছী ইউনিয়নের পাইকপাড়া গ্রামের শেখ আহম্মেদ আলীর পুত্র। এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তার অবদান অবিস্মরণীয়। সিটি কলেজের ইতিহাসের পাতায় তিনি স্থান করে নিয়েছেন। তিনি এ কলেজের গর্ব (সম্পাদনা পরিষদ, স্বাধীনতা দিবস সংখ্যা, খুলনা গেজেট)।

