বৃহস্পতিবার । ৫ই মার্চ, ২০২৬ । ২০শে ফাল্গুন, ১৪৩২

টুঙ্গিপাড়া হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থার বেহাল দশা, অনিয়মিত ৫ কনসালটেন্ট

বাদল সাহা, গোপালগঞ্জ

এক লাখ ১৪ হাজার ৪৮২ মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসাস্থল গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া ১০০-শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। হাসপাতালটি ৫০ থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত হলেও বাড়েনি চিকিৎসকের সংখ্যা। এর মধ্যে ঠিকমতো হাসপাতালে আসে না বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। ফলে উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে টুঙ্গিপাড়াসহ আশপাশের আরও কয়েক উপজেলার রোগীরা।

রোগীদের অভিযোগ, টুঙ্গিপাড়া হাসপাতালে ৫ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক (জুনিয়র কনসালটেন্ট) থাকলেও নিয়মিত রোগী দেখেন না তারা। আসেন নিজেদের ইচ্ছামতো। এছাড়া রোগীদের সাথে দুর্ব্যবহার, নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিকের টেস্ট রিপোর্ট ছাড়া তারা দেখেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: তানভীর আহমেদ অনিয়মিত চিকিৎসকদের পক্ষে সাফাই গেয়ে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

সরজমিনে দেখা যায়, গত মঙ্গলবার বেলা ১১টা ১০ মিনিটে হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় ২০৭ নাম্বার কক্ষে প্রবেশ করছেন অর্থোপেডিক চিকিৎসক (জুনিয়র কনসালটেন্ট) কাজী করিম নেওয়াজ। বেলা ১১টা ২০ মিনিটে ২০৬ নাম্বার কক্ষের শিশু চিকিৎসক (জুনিয়র কনসালটেন্ট) ডাঃ আমামা আক্তারের কক্ষটি তালাবদ্ধ। পরে তাকে মোবাইলে কল দিলে ১১টা ৫০ মিনিটে নিজের কক্ষে আসেন তিনি। গাইনি চিকিৎসক (জুনিয়র কনসালটেন্ট) ডাঃ শিপ্রা নন্দীর কক্ষটিও তালাবদ্ধ। কারণ সপ্তাহে মাত্র ২ দিন টুঙ্গিপাড়া হাসপাতালে আসেন তিনি। সেই হিসেবে মাসে মাত্র ৮ দিন এসে তুলছেন পুরো মাসের বেতন। চক্ষু চিকিৎসক (জুনিয়র কনসালটেন্ট) ডাঃ আবির মল্লিক হাসপাতালে নেই। আর জুনিয়র কনসালটেন্ট (অ্যানেস্থেশিয়া) ডাঃ মোঃ শাহজাহানের পোস্টিং টুঙ্গিপাড়া হলেও তিনি সব সময় থাকেন মুকসুদপুরে। তাই তাকেও পাওয়া যায়নি।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ১০০-শয্যাবিশিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কনসালটেন্ট ১০টি ও জুনিয়র কনসালটেন্ট ১১টিসহ মোট ২১টি পদের বিপরীতে আছেন মাত্র ৫ জন জুনিয়র কনসালটেন্ট চিকিৎসক।

টুঙ্গিপাড়ার পাটগাতী গ্রামের রানা শেখ অভিযোগ করে বলেন, “গত রবিবার সকালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পায়ে আঘাত পেয়ে হাসপাতালে গিয়ে বসে থেকেও অর্থোপেডিক ডাক্তারের দেখা পাইনি। পরে গোপালগঞ্জ গিয়ে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে অন্য অর্থোপেডিক ডাক্তার দেখিয়েছি। এতে সময় আর টাকা দুটোই অপচয় হয়েছে।”

এছাড়া চিকিৎসা নিতে আসা বাগেরহাট জেলার চিতলমারী উপজেলার কলাতলা গ্রামের আরাফাত হোসেন ও পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার সাচিয়া গ্রামের আবু আমের বলেন, টুঙ্গিপাড়া হাসপাতাল আমাদের খুব কাছে। আমরা এ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করি। এখানে চিকিৎসকের সংখ্যা কম। তারপরও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা নিয়মিত আসেন না। আমাদের সাথে চিকিৎসকরা দুর্ব্যবহার করেন। তাদের বলে দেওয়া নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিকের রিপোর্ট ছাড়া, তারা দেখেন না। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা নিয়মিত থাকেন না। তাই আমরা ভালো চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হই।

বেলা ১১টা ১০ মিনিটে আসার বিষয়ে টুঙ্গিপাড়া হাসপাতালে অর্থোপেডিক চিকিৎসক (জুনিয়র কনসালটেন্ট) ডাঃ কাজী করিম নেওয়াজ বলেন, “১ মাস হয়নি এখানে যোগদান করেছি। বেতন ভাতা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে আসতে একটু দেরি হয়েছে।”

শিশু কনসালটেন্ট ডাঃ আমামা আক্তার বলেন, “একটু শরীর খারাপ থাকায় আসতে দেরি হয়েছে।” আর গাইনি চিকিৎসক ডাঃ শিপ্রা নন্দী, চক্ষু চিকিৎসক আবির মল্লিক ও জুনিয়র কনসালটেন্ট (অ্যানেস্থেশিয়া) ডাঃ মোঃ শাহজাহানের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। এ কারণে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এসব বিষয়ে প্রথমে চিকিৎসকদের পক্ষে সাফাই গেয়ে পরে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ তানভীর আহমেদ।

তিনি বলেন, “অর্থোপেডিক চিকিৎসকের বাসা দূরে হওয়াতে আসতে একটু দেরি হয়। আর শিশু ও চক্ষু চিকিৎসক ছুটির আবেদন করেছেন। তবে আবেদনের কোন লিখিত কপি দেখাতে পারেনি তিনি। আর জুনিয়র কনসালটেন্ট (অ্যানেস্থেশিয়া) ডাঃ মোঃ শাহজাহানের মূল কর্মস্থল টুঙ্গিপাড়া হলেও আগের সিভিল সার্জনের নির্দেশে তিনি গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে থাকেন, টুঙ্গিপাড়া আসেন না।”

এছাড়া অনিয়মিত চিকিৎসকদের সতর্ক বার্তা দেওয়ার পর ঠিক না হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন