বুধবার । ৪ঠা মার্চ, ২০২৬ । ১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২

কপিলমুনির কৃষক মেহেদির বিষমুক্ত আম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে যাবে বিদেশেও

পারভেজ মোহাম্মদ

শেখ সাখাওয়াত হোসেন, আট বছর আগেই পরিশ্রমের স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছিলেন দেশ সেরা কৃষকের স্বীকৃতি। খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার সনাতনকাটির গণ্ডি পেরিয়ে দেশজুড়ে যশ আর সম্মান মিললেও ভাগ্যের চাকা খুব বেশি দূর গড়াতে পারেননি। তবে আজ দুই হাতে হুইল চেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে কাটছে তার দিন। সেই আশির দশক থেকে কৃষক শাখা মেম্বর কখনো হলুদের চাষ, কখনো পটল, আবার কয়েক বছর ধরে কলা সহ অন্যান্য কৃষি খাদ্যপণ্য সফলভাবে উৎপাদন করেছেন।

১৯৯৮ সালে ইন্ডিয়া থেকে প্রথম এদেশে এনেছিলেন দুইশ’টি আম্রপালি আমের চারা। সোনাতনকাটি গ্রামে তিন একর জমিতে লাগানো হয় সেই চারা গাছ। ২/৩ বছরের মধ্যে ব্যাপকভাবে উৎপাদন শুরু হয়। নতুন প্রজাতির আম হওয়ায় এলাকার মানুষ ও সুহৃদদের আম্রপালি আম খাইয়ে পরিচিতি ঘটিয়েছেন। অন্যদিকে লক্ষাধিক আমের কলম তৈরি করে পাঠিয়ে দেন পার্বত্য চট্টগ্রাম সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। ২০১৮ সালে পেয়ে যান সরকারি স্বীকৃতি “সেরা কৃষক-২০১৮”। ইতোমধ্যে কলেবর বেড়েছে শাখা মেম্বরের আম বাগানের হিমসাগর, আম্রপালি, হাঁড়িভাঙ্গা ও গোপালভোগ সহ নানা প্রজাতির আমের দেখা মিলল সেখানে। ৫ একর জমিতে চাষ করেছেন হিমসাগর আম। কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে বেশ ভালোই কাটছিল শাখা মেম্বরের দিন।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবেও জনপ্রিয় ছিলেন তিনি। জিয়া প্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী আদর্শের একজন কর্মী পরিচয় দিতে আত্মতৃপ্তি লাভ করেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে স্থানীয় কিছু কুচক্রী মহলের রোষানলে পড়েন তিনি। মানসিক যন্ত্রণা ও শরীরের প্রতি অবহেলার কারণে পা হারিয়ে এখন হুইল চেয়ারই তার চলাচলের একমাত্র অবলম্বন। ২০২৪ সালে এসে বাধ্য হয়ে অবসর নিলেন তিনি। বাবার এমন বিপদে প্রবাসী বড় ছেলে দুবাইয়ের কোম্পানির মার্কেটিং ম্যানেজার ও একটি ইনস্টিটিউটে ফাইন্যান্সিয়াল ট্রেনারের চাকরি ছেড়ে দিয়ে দেশে ফিরে যোগদান করেন বাবার স্বপ্নের কৃষি খামারে। এমএ ও এমবিএসহ অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ট্রেনিং তার অভিজ্ঞতা ঝুলিতে থাকলেও স্বাচ্ছন্দে পরিচিত হয়ে ওঠেন কৃষক মেহেদী নামে। সবকিছু ছেড়ে বাবা মাকে সেবার ব্রত নিয়ে আসা। জীবিকার তাগিদে বাবার কৃষিকে এগিয়ে নিতে কাজ করছেন।

শিক্ষিত, সদালাপি এবং কর্মঠ এই যুবক, শুধু কৃষি থেকে ইনকাম করার কথা ভাবছেন তা নয়, ভাবছেন পরিবেশ বান্ধব কৃষি নিয়ে। তিনি চান কৃষি হবে দেশের অর্থনীতির ভিত এবং একই সাথে তা হবে পরিবেশ বান্ধব। তার উৎপাদিত খাদ্যশস্য হবে স্বাস্থ্যকর। তাই তিনি দক্ষতা বাড়াতে ছুটলেন উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে গ্যাপ (গুড এগরিকালচার প্রাকটিসেস) এর ট্রেনিং নিতে। দিন রাত অনলাইনে স্টাডি করেন পৃথিবীর আম চাষে সফল চাষীদের।

কৃষক মেহেদী মনে করেন, আম হতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা অর্থকারী ফসল। শুধু দরকার সামগ্রিকভাবে একই রকম পজিটিভ চিন্তা করা। একদিকে যেমন কৃষকদের হতে হবে দক্ষ এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত, অন্যদিকে সরকারকে তৈরি করতে হবে আন্তর্জাতিক বাজার। যেখানে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বাগান থেকে আম সংগ্রহ করে পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের সুপার মার্কেটে পৌঁছে যাবে।

কৃষক মেহেদী মনে করেন, স্বাস্থ্যকর ফল মানুষকে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী করে। দেশের মানুষের জন্য সকল খাদ্যদ্রব্য বিষমুক্ত করতে হবে। তাই সকল ফল ও খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, পরিবহন, বিপণন সহ সকল স্তরে প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনা বজায় রাখা উচিত। কৃষক মেহেদী চেষ্টা করছেন অর্গানিক আম ফলাতে। তিনি গত বছরও নিজেদের বাগান থেকে সরাসরি গাছপাকা আম সংগ্রহ করে দেশি-বিদেশি ক্রেতাকে পাঠিয়েছেন। চলতি মৌসুমে ব্যাপক মুকুল এসেছে গাছে গাছে। এবার আশা করছেন ফলন গতবারের তুলনায় বেশি হবে।

মেহেদি এখন আপাদমস্তক একজন কৃষক। প্রবাসী জীবনযাপন করায় একাধিক ভাষায় রয়েছে তার দক্ষতা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও কৃষক মেহেদীর রয়েছে বেশ দখল। আম বাগানের পাশাপাশি নিজেকে সাজাতে কোট প্যান্ট টাই পরে পরিপাটি চলাফেরা তার। প্রতিদিন ভোরে কুয়াশা স্নাত আমের মুকুল স্পর্শে বাগানে ছুটে আসে মেহেদী। ফুলে ফুলে মৌমাছির বিচরণে প্রকৃতির সাথে নিজেকে হারিয়ে ফেলে। প্রবাসী বিলাসী জীবন প্রকৃতির এই স্নিগ্ধতার কাছে হার মেনেছে। মেহেদী এখন সফল উদ্যোক্তা। আগামীর স্বপ্নীল সোনালী দিন হাতছানি দেয় তাকে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন