‘অজু’ একটি আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, শরীর পবিত্র করার নিয়তে পবিত্র পানি দিয়ে শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধৌত করাকে অজু বলা হয়। অজু নামাজের অপরিহার্য শর্ত। নামাজ ছাড়াও অনেক ইবাদতের জন্য অজু করতে হয়।
অজু শুধু শারীরিক কোনো কাজ নয়, বরং এর মধ্যে রয়েছে গভীর আধ্যাত্মিকতা। অন্য অনেক ইবাদতের মতো অজুরও রয়েছে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ দুটি দিক। এর বাহ্যিক দিক হচ্ছে শরীর থেকে যাবতীয় ময়লা-আবর্জনা ও নাপাকি দূর করা। আর অভ্যন্তরীণ দিক হচ্ছে হৃদয়ের কালিমা দূর করা। এ জন্যই পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে, তাদেরও ভালোবাসেন (সুরা বাকারা : ২২২)।
অজুর প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “হে ইমানদারগণ! যখন তোমরা নামাজের জন্য প্র¯ত হবে, তার আগে তোমরা তোমাদের মুখম-ল ও দুই হাত কনুই পর্যন্ত ধৌত করবে এবং তোমাদের মাথা মাসেহ করবে। আর উভয় পা টাখনু (পায়ের গোড়ালি) পর্যন্ত ধৌত করবে (সুরা মায়িদা : ৬)।”
অজুর অনেক উপকারিতা ও ফজিলত রয়েছে। এটি শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি আনয়ন করে। তাছাড়া অজু দেহ ও আত্মাকে পবিত্র করে। রাসুল (সাঃ) অজুর প্রতি যথেষ্ট গুরুত্বারোপ করে এর অনেক ফজিলত বর্ণনা করেছেন। নিম্নে অজুর ফজিলত সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
হজরত উসমান (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসুল (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি উত্তমরূপে অজু করে, তার শরীর থেকে তার গুনাহসমূহ ধুয়ে যায়। এমনকি তার নখের নিচ থেকেও গুনাহ বের হয়ে যায় (সহিহ মুসলিম : ২৪৫, মুসনাদে আহমাদ : ৪৮৬, মিশকাত : ২৮৪)।”
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে আরেক হাদিসে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসুল (সাঃ) বলেছেন, যখন কোনো মুসলিম অথবা মুমিন বান্দা অজুর সময় মুখম-ল ধৌত করে, তখন তার দু’চোখের দ্বারা কৃত গুনাহসমূহ পানির সাথে কিংবা পানির শেষ ফোঁটার সাথে ঝরে যায়। আর যখন সে দু’হাত ধৌত করে, তখন তার দু’হাত দ্বারা সংঘটিত গুনাহগুলো পানির সাথে অথবা পানির শেষ বিন্দুর সাথে বের হয়ে যায়। এরপর সে যখন তার দু’পা ধৌত করে, তখন তার দু’পা দিয়ে কৃত গুনাহসমূহ পানির সাথে কিংবা পানির শেষ বিন্দুর সাথে বের হয়ে যায়। ফলে সে তার সব (সগিরা) গুনাহ হতে পাক-পবিত্র ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে যায় (সহিহ মুসলিম : ২৪৪, সুনানে তিরমিজি : ২, মিশকাত : ২৮৫)।”
আবদুল্লাহ সুনাবিহী (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসুল (সাঃ) বলেছেন, যখন মুমিন বান্দা অজু করে ও কুলি করে, তখন তার মুখ থেকে গুনাহসমূহ বের হয়ে যায়। যখন সে নাক পরিষ্কার করে, তখন তার নাক থেকে গুনাহগুলো বের হয়ে যায়। যখন সে তার মুখমণ্ডল ধৌত করে, তখন তার মুখমণ্ডল হতে সব গুনাহ ধুয়ে যায়। এমনকি তার দু’চোখের পাতার নিচ থেকেও গুনাহ বের হয়ে যায়। তারপর যখন সে তার দু’হাত ধৌত করে, তখন তার দু’হাতের গুনাহগুলো ধুয়ে যায়। এমনকি তার দু’হাতের নখগুলোর নিচ থেকেও গুনাহসমূহ বের হয়ে যায়। তারপর যখন সে তার মাথা মাসেহ করে, তখন তার মাথা হতে গুনাহগুলো বের হয়ে যায়। এমনকি তার দু’কান হতেও গুনাহসমূহ বের হয়ে যায়। অবশেষে যখন সে তার দু’পা ধৌত করে, তখন তার দু’পায়ের সব গুনাহ ধুয়ে যায়। এমনকি তার দু’পায়ের নখগুলোর নিচ থেকেও গুনাহসমূহ বের হয়ে যায়। এরপর তার মসজিদের দিকে পায়ে হেঁটে যাওয়া এবং নামাজ আদায় করা তার জন্য অতিরিক্ত সওয়াবের কারণ হয় (নাসায়ি : ১০৩, মুয়াত্তা মালেক : ৫৫, মিশকাত : ২৯৭)।”
উক্ত হাদিস দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, অজুর কারণে কেয়ামতের দিন মোমিনগণের মুখমণ্ডল ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অতীব উজ্জ্বল হবে। সুতরাং অজুর নির্দিষ্ট স্থানগুলো পূর্ণাঙ্গরূপে ভিজিয়ে উত্তমরূপে অজু করা উচিত।
হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসুল (সাঃ) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি উত্তমরূপে অজু করবে অতঃপর এই দোয়া পাঠ করবে – আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু। এমন ব্যক্তির জন্য জান্নাতের আটটি দরজা খুলে দেওয়া হবে। সে ইচ্ছানুযায়ী যে কোনো দরজা দিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে (সহিহ মুসলিম : ২৩৪, আবু দাউদ : ১৬৯, মিশকাত : ২৮৯)।”
উকবা ইবনে আমের (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসুল (সাঃ) বলেছেন, যদি কোনো মুসলিম উত্তমরূপে অজু করে, অতঃপর স্বীয় অন্তর ও মুখম-লকে সম্পূর্ণরূপে আল্লাহর দিকে রুজু করে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে, তাহলে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায় (সহিহ মুসলিম : ২৩৪, মিশকাত : ২৮৮)।”
সর্বোপরি আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে যথাযথভাবে অজু করার মাধ্যমে এর ফজিলত অর্জন করে গুনাহমুক্ত জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন।
লেখক : সম্পাদক, মাসিক সারস, পূর্ব রূপসা, খুলনা।
খুলনা গেজেট/এনএম



