বিগত আওয়ামী শাসনের দেড় যুগে সাতক্ষীরা জেলায় জামায়াত-বিএনপি দমন-পীড়নের স্টিম রোলার রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে সারাদেশকে। সে সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কথিত ক্রসফায়ার, হত্যা, নির্যাতন ও বাড়িঘর ভাঙচুরের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খোলার সাহস পায়নি। দেড় যুগ পর এসব বেআইনি কর্মকাণ্ডের অভিযোগ এখন প্রকাশ্যে আসছে।
২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় ঘোষণার পর বিকেল থেকেই পুলিশ-বিজিবি ও জামায়াত-শিবিরের সংঘর্ষ, গুলিবর্ষণ, ঘরবাড়ি ভাঙচুর-সব মিলিয়ে পরবর্তী এক দশকে সাতক্ষীরা পরিণত হয় কথিত ক্রসফায়ার ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে আলোচিত এলাকায়।
জামায়াত সূত্র বলছে, ২০১৩ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান পর্যন্ত তাদের ৪৮ জন এবং বিএনপি’র ৯ জন নেতাকর্মী বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, গত দেড় যুগে সাতক্ষীরায় সন্ত্রাস দমনের নামে কথিত ক্রসফায়ারে অর্ধশতের বেশি মানুষ নিহত, শতাধিক পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। বিশেষ করে ২০১৩-২০১৭ মেয়াদে তৎকালীন এসপি চৌধুরী মঞ্জুরুল কবীর এবং তার অধীন কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে।
২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে ফাঁসির রায়ের পর থেকে সাতক্ষীরা শহরসহ পুরো জেলা পরিণত হয় আতঙ্কের এলাকায়। সে সময়ের সরকারদলীয় লোকজন পুলিশকে ব্যবহার করে জামায়াত-শিবির দমনে মেতে ওঠে। প্রতিদিন গড়ে ৪০-৫০ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হতো।
বিএনপি নেতা আনারুল হত্যাকাণ্ড।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার আগরদাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা মোঃ আনারুল ইসলাম ছিলেন এলাকায় জনপ্রিয় ও সংগঠিত নেতৃত্বের মুখ। তার বিরুদ্ধে কোনো মাদক, অস্ত্র বা চোরাচালান মামলা ছিল না।
পরিবার জানায়, ২০১৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর সকাল ৯টার দিকে একটি সাদা মাইক্রোবাসে পরিচয়বিহীন কিছু লোক তাকে বাড়ি থেকে তুলে নেয়। সেদিন দুপুরের দিকে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার শিকড়ি এলাকার একটি কলাবাগানে স্থানীয়রা দেখতে পান তার রক্তাক্ত লাশ পড়ে আছে। লাশে বুক, মাথা, পেট ও পায়ে অন্তত ৬টি গুলির চিহ্ন ছিল।
তৎকালীন সদর সার্কেলের এএসপি কাজী মনিরুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, যৌথবাহিনীর ওপর হামলার সময় পাল্টা গুলিতে আনারুল নিহত। কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, “এটি ছিল ‘সাজানো বন্দুক যুদ্ধ’, কারণ আনারুলকে সেদিন সকালেই আটক করা হয়েছিল।”
২০২৪ সালের ২১ আগস্ট নিহত আনারুলের ভাই জিয়ারুল ইসলাম বাদী হয়ে তৎকালীন এসপি চৌধুরী মঞ্জুরুল কবীর, সদর সার্কেল কাজী মনিরুজ্জামান, ওসি ইনামুল হকসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।
শিবির নেতা আমিনুর হত্যা : সাতক্ষীরা শহর শাখা শিবিরের সেক্রেটারি আমিনুর রহমান নিহত হন ২০১৪ সালে।
পরিবার ও স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, সাতক্ষীরা শহরের কামালনগর এলাকার একটি ছাত্রাবাস দুপুরের খাবার শেষে বসে ছিলেন আমিনুর রহমান। তৎকালীন ডিবি প্রধান আব্দুল হান্নানের নেতৃত্বে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একটি দল এসে আমিনুরসহ ৭ জনকে কাছ থেকে গুলি করা হয়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আমিনুরকে হাসপাতালে চিকিৎসা না দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। মামলা করতে গেলে এসপি চৌধুরী মঞ্জুরুল করিম প্রকাশ্যে হুমকি দেন। এ ঘটনাটিকেও “বন্দুক যুদ্ধ” বলে চালানো হয়।
২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি রায় ঘোষণার পর সার্কিট হাউজ মোড়ে পুলিশ-বিজিবি ও জামায়াত-শিবিরের সংঘর্ষ হয়। ওই সংঘর্ষে পুলিশের বেপরোয়া গুলিতে জামায়াত-শিবিরের ৭ জন নেতাকর্মী নিহত হয়। এদের বেশিরভাগেরই কোনো পূর্ব মামলা ছিল না।
এছাড়া, তালা, দেবহাটা, আশাশুনি, কলারোয়া, কালীগঞ্জ-পুরো জেলাজুড়ে একই প্যাটার্ন দেখা যায়। গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে নির্যাতন পরে গভীর রাতে ‘বন্দুক যুদ্ধের’ নাটক গুলি করে হত্যা। কারো পায়ে গুলি করে হত্যা করলে তৎকালীন এসপি চৌধুরী মঞ্জুরুল করিম সেই কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত করতেন।
জামায়াতের শহর যুব বিভাগের সভাপতি এ্যাড. আবু তালেব বলেন, “২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত সাতক্ষীরাতে জামায়াতের নেতাকর্মীর নামে মিথ্যা ও রাজনৈতিক মামলা হয়েছে ৯৪৯ টি। ইতোমধ্যে ৭ শতাধিক মামলা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে। বাকি মামলা নিষ্পত্তির জন্য প্রক্রিয়াধীন।
সাতক্ষীরা জেলা বিএনপি’র সদস্য সচিব আবু জাহিদ ডাবলু বলেন, “২০০৯ সালের পর থেকে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের ওপর খড়্গ নেমে আসে। ২০১৩ সাল হয়ে ওঠে সাতক্ষীরার জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ সময়। এ সময়ে বিএনপির ৯ জন নিহত হন।
খুলনা গেজেট/এনএম
