বুধবার । ১৪ই জানুয়ারি, ২০২৬ । ৩০শে পৌষ, ১৪৩২

খালেদা জিয়ার আসনে স্বতন্ত্র মনোনয়নপত্র কিনলেন বিএনপি নেতা

গেজেট প্রতিবেদন

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দিনাজপুর-৩ (সদর) আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে। হঠাৎ করেই সেই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে মনোনয়নপত্র ক্রয় করেছেন বিএনপির নেতা ও দিনাজপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম। এ নিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শ্লোগানও দিয়েছেন। তবে মনোনয়নপত্র ক্রয়ের বিষয়টি হাই কমান্ডের নির্দেশে নিয়েছেন বলে দাবি করেছেন সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম।

বিএনপি সূত্রে জানা যায়, গত ৩ নভেম্বর বিএনপির পক্ষ থেকে বিভিন্ন আসনে প্রার্থীদের যে নাম ঘোষণা করা হয় সেই ঘোষণায় দিনাজপুর-৩ (সদর) আসনে প্রার্থী হিসেবে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নাম ঘোষণা করা হয়। সেই সময় থেকেই বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে উল্লাস দেখা দেয়। তাদের মধ্যে উচ্ছাস ছিল, বেগম খালেদা জিয়া এই আসনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হবেন। আর বিজয়ী হওয়ার পর এই জেলার ব্যাপক উন্নয়ন হবে বলেও আশা ছিল নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটারদের মাঝে।

বেগম খালেদা জিয়া এই আসনে প্রার্থী হওয়ার লক্ষ্যে গত ২৪ ডিসেম্বর তার পক্ষে মনোনয়নপত্র ক্রয় করেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বখতিয়ার আহমেদ কচি। এ সময় জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও দিনাজপুর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবু বকর সিদ্দিক, সাংগঠনিক সম্পাদক আনিছুর রহমান বাদশা, শহর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন বকুলসহ বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

তবে হঠাৎ করেই রোববার দুপুরে একই আসন অর্থাৎ দিনাজপুর-৩ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোয়নপত্র সংগ্রহ করেন বিএনপির রংপুর বিভাগীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও দিনাজপুর পৌরসভার টানা তিনবারের মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম। রোববার দুপুর পৌনে ২টার দিকে তিনি জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট নূর-ই-আলম সিদ্দিকীর কাছ থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। এ সময় জেলা বিএনপির ক্রীড়া সম্পাদক মামুনুর রশিদ কচি, সাবেক পৌর কাউন্সিলর রেহাতুল ইসলাম, মতিবুর রহমান বিপ্লবসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।

একই দিন বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়। বেগম খালেদা জিয়ার টিপসই নিয়ে এই মনোনয়নপত্র জমা দেন জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাড. মোফাজ্জল হোসেন দুলাল ও সাধারণ সম্পাদক বখতিয়ার আহমেদ কচি। মনোনয়নপত্র গ্রহণ করেন জেলা প্রশাসক ও জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম। এ সময় জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মোকাররম হোসেন, খালেকুজ্জামান বাবু, মাহাবুব আলী, সাংগঠনিক সম্পাদক হাসনা হেনা হিরা, আনিসুল হক বাদশা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় জেলা বিএনপির নেতাকর্মী ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম এই আসন থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন বিষয়টি জানতে পারেন। তাৎক্ষণিকভাবে তারা জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে উত্তেজিত হয়ে সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন শ্লোগান দেন। শ্লোগানকে কেন্দ্র করে সেখানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং এক পর্যায়ে বিএনপির সিনিয়র নেতাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় বিএনপি নেতা সাবেক পৌর মেয়র সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন এ বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাড. মোফাজ্জল হোসেন দুলাল বলেন, ‌‘ঢাকা থেকে শনিবার বিকেল ৩টা ১০ মিনিটে সিনিয়র ও জুনিয়র নেতৃবৃন্দ এখানে আসেন। তাদের সঙ্গে সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলমও ছিলেন। গত পরশুদিন আমাদের মহাসচিব মহোদয় ঠাকুরগাঁও সফরে গিয়েছিলেন। বাসায় ফেরার পর সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তিনি মনোনয়ন পেয়েছেন। কিন্তু যদি তিনি মনোনয়ন পেয়ে থাকেন, তাহলে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার বিষয়ে কি ঢাকা থেকে আমাদের কিছু জানানো হতো না? মনোনয়নপত্র জমা দেবেন না- এমন কোনো নির্দেশনা ঢাকা থেকে আমাদের দেওয়া হয়নি। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াই পরিপূর্ণভাবে এখানকার প্রার্থী।’

বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা শেষে সাংবাদিক প্রশ্নের জবাবে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বখতিয়ার আহমেদ কচি বলেন, ‘এ বিষয়ে তদন্ত করে দেখবো যে আসলে বিষয়টি কি। আমাদের দায়িত্ব দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া, আমরা আমাদের দায়িত্বটুকু পালন করতে এসেছি।’

এর আগে মনোনয়পত্র সংগ্রহ শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘দলের উচ্চ পর্যায় থেকে দিনাজপুর-৩ আসনে আমাকে মনোনয়ন ফরম উত্তোলনের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তারই অংশ হিসেবে মনোনয়ন ফরম উত্তোলন করেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘একটি পৌরসভা ও দশটি ইউনিয়ন নিয়ে দিনাজপুর-৩ আসন। আমরা চাই অতীতকে ভুলে গিয়ে আগামী দিনে দিনাজপুর-৩ আসনে উন্নয়নমূলক কাজ করে এই আসনটিতে যেন সুন্দর গ্রাম ও সুন্দর শহর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি সেজন্য সকলের সহযোগিতা চাই। আপনাদেরকে বন্ধু হিসেবে, ভাই হিসেবে পাশে চাই।’ অতীতের ভুলভ্রান্তি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখে ঐক্যবদ্ধ থেকে পথচলার আহবান জানান তিনি। চেয়ারপারসনের আসনে কেন ফরম তুললেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দলীয় চেইন অব কমান্ডের বাইরে আমরা কিছু বলতে পারি না।’

বিএনপির দলীয় সূত্র জানায়, সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম ইতিপূর্বে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক, রংপুর বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক পদসহ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১১ সালে তিনি প্রথমবারের মতো দিনাজপুর পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর টানা দুইবার নির্বাচিত হয়ে হ্যাটট্রিক করেছিলেন তিনি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে দলীয় মনোনীত প্রার্থী হয়েছিলেন সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম। পরে মেয়র পদে থেকে সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না- আদালতের এমন আদেশে তার প্রার্থীতা বাতিল হয়ে যায়।

দিনাজপুর-৩ আসন থেকে প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছেন বেগম খালেদা জিয়া। তার শৈশব কেটেছে এই জেলাতে। এই জেলাতেই তার বেড়ে ওঠা, এই জেলাতেই পড়াশোনা। এর আগে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে সপ্তম ও অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে প্রার্থীতা করে জয় পেয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়ার বড় বোন প্রয়াত খুরশিদ জাহান হক। এবার বড় বোনের আসনেই প্রার্থী হয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন