খুলনা, বাংলাদেশ | ৫ জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৯ | ১৯ মে, ২০২২

Breaking News

  ২২ মে পর্যন্ত বাড়ানো হলো সরকারি-বেসরকারি হজযাত্রী নিবন্ধনের সময়
  সংসদের বাজেট অধিবেশন বসছে ৫ জুন

রূপসার লাকী হত্যার রহস্য উদঘাটন করলো পিবিআই, তিন জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট

নিজস্ব প্রতিবেদক

২০১৯ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর। দিনটি ছিল শুক্রবার। রহিমনগর কমিউনিটি ক্লিনিক সংলগ্ন এক বাড়িতে চলছে বিয়ের অনুষ্ঠান। আনন্দে মাতোয়ারা সকলেই। সেদিন দুপুর সোয়া ১২ টার দিকে শোনা যায় বিয়ে বাড়ির পাশের বাসার লাকী বেগম খুন হয়েছেন। খুন করেছে কে, কেউ তা জানেনা। মামলার রহস্য উদঘাটন করতে গিয়ে হিমশিম খায় তদন্ত কর্মকর্তারা। পরে পিবিআই তদন্তে নেমে এ রহস্য বের করে। গত ২৮ ডিসেম্বর আলোচিত এ হত্যা মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করেছে পিবিআই।

চার্জশিটভুক্ত আসামিরা হলো, রূপসা উপজেলার রামনগর এলাকার মো: ফরিদ শেখের ছেলে রাহাত ওরফে টিংকু ও একই এলাকার মো: আবুল শেখের ছেলে মো: ইব্রাহিম ওরফে ইবি এবং তালিমপুর এলাকার মো: রসুল খানের ছেলে মো: রিয়াজুল ইসলাম।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই’র পুলিশ পরিদর্শক মো: শহিদুল্লাহ জানান, দক্ষিণ নন্দনপুর সিংহের চর (রহিমনগর কমিউনিটি ক্লিনিক সংলগ্ন) এলাকার বাসিন্দা আনসার আলী ফকিরের মেয়ে লাকী।

পারিবারিকভাবে তেরখাদা উপজেলার নালিয়ারচর এলাকার মাহমুদের সাথে তার প্রথম বিয়ে হয়। দাম্পত্য জীবনে কোন সন্তান না হওয়ায় সাত বছর পর উভয়ের ছাড়াছাড়ি হয়। কিছুদিন পর সোহেল নামে একজনকে বিয়ে করে লাকী। সোহেল কোষ্টগার্ডের ট্রলার চালক। ঠিকমতো সময় না দেওয়ার কারণে নন্দনপুর এলাকার ফুলমিয়ার সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে সে। তবে এলাকার মানুষের চাপে তার সঙ্গ ছাড়তে বাধ্য হয় লাকী বেগম।

প্রথমে ভাড়া বাসায় থাকলেও একসময় রহিমনগর কমিউনিটি ক্লিনিক সংলগ্ন এলাকায় নতুন বাড়ি করে। সেখানে নন্দনপুরসহ আশপাশের এলাকার মেয়েদেরে এনে দেহ ব্যবসা করতো লাকী। উঠতি বয়সের যুবক থেকে শুরু করে এলাকার মাদকসেবী ও ব্যবসায়ীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল ছিলো ওই বাড়ি। ধীরে ধীরে দেহ ব্যবসা ও মাদকের আখড়ায় পরিণত হয় লাকীর প্রাচীর ঘেরা বাড়িটি।

যে কারণে, যেভাবে খুন হয়

দক্ষিণ নন্দনপুর এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী ইব্রাহীম ওরফে ইবি, রিয়াজুল ও রাহাত ওরফে টিংকু লাকী বেগমের ব্যবসার বিষয়টি আগে থেকে জানত। তারা সকলেই মাদক গ্রহণ করতো। সেই সাথে ঐ এলাকার মাদক ব্যবসায়ের সাথে জড়িত ছিলো। লাকীর বাড়িতে তাদের সবসময় যাতায়াত ছিল। দেহ ব্যবসা ও মাদক সেবীদের আড্ডার বিষয়টি এলাকার মানুষ জানলেও ইব্রাহীম ও রিয়াজুল বাহিনীর ভয়ে অনেকেই নিরব থাকত। অবৈধ ব্যবসার নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য লাকীর কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা নিত তারা।

ঘটনার দিন দুপুর সোয়া ১২ টার দিকে ইব্রাহীম, রিয়াজুল ও রাহাত লাকী বেগমের বাড়িতে এসে টাকা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকার করায় প্রথমে তাকে মারধর করে তারা। পরে গলার হার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। হত্যাকান্ডের সময় রিয়াজুল পা চেপে ধরে, রাহাত হাত ও ইব্রাহীম গলায় গামছা পেচিয়ে হত্যা করে। হত্যার পর দেহ থেকে খুলে নেওয়া হয় স্বর্ণালংকার। পরে নিজেদের দোষ স্বীকার করে রিয়াজুল ও রাহাত আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে।

যেভাবে আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়

হত্যাকান্ডের প্রথমদিকে মামলাটি তদন্ত করেন রূপসা থানার এসআই রাজিউর রহমান। তদন্তে নেমে ঘোরপাক খান তিনি। ২০১৯ সালে ২৮ সেপ্টেম্বর মামলাটি গ্রহণ করেন পিবিআই’র পুলিশ পরিদর্শক সরদার বাবর আলী। তিনিও এ মামলার কোন রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি। ২০২০ সালের ৩০ জুন মামলাটি গ্রহণ করেন পিবিআই’র পুলিশ পরিদর্শক মো: শহীদুল্লাহ। প্রথমদিকে তিনি তেমন ক্লু উদ্ধার করতে না পারলেও ওই এলাকার প্রতিটি মানুষের ব্যাপারে তন্ন তন্ন করে খোঁজ নিতে থাকেন। ২০২০ সালের ১৮ আগস্ট রাহাত ওরফে টিংকুকে সন্দিগ্ধ হিসেবে আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের কাছে হত্যাকান্ডে নিজের ও অপর দু’জনের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে। পরে আদালতে গিয়ে জবানবন্দি প্রদান করে। ২০২১ সালের ৯ জুন রাহাতের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ইব্রাহীম ও ২৬ জুন রিয়াজুলকে আটক করেত সক্ষম হন পিবিআইয়ের এ কর্মকর্তা। পরবর্তীতে রিয়াজুলও আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়।

মামলাটি বেশ চাঞ্চল্যকর বলে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেছেন। খুলনা গেজেটের এ প্রতিবেদকের সাথে আলাপকালে তিনি আরও জানান, এ গ্যাং এর বিরুদ্ধে নিহতের পিতাও প্রথমে তথ্য দিতে ভয় পেয়েছিল। মামলাটি তিনি অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে করেছিলেন।

রিয়াজুল এলাকার মাদক ব্যবসায়ী। খুব চতুর প্রকৃতির লোক। কিশোর গ্যাংএর নেতা। পুলিশ নদী পার হলেই সটকে পড়ে সে। জানা যায়, রূপসা উপজেলার রামনগর এলাকার এক জনপ্রতিনিধির শালীর ছেলে রিয়াজুল। এলাকাবাসী জানায়, রিয়াজুল হাজতে বন্দি থাকলেও তার কিশোর গ্যাংএর সদস্যরা এখনও রামনগর-রহিমনগর এলাকায় বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতি রহিমনগর গাজী মেমোরিয়াল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠ থেকে পুলিশ ক্যাম্প উঠে যাওয়ায় সেখানে সন্ধ্যার পরে বসছে রিয়াজুল বাহিনীর মাদকের আড্ডা। এ গ্রুপের সদস্যরা শত অপকর্ম করলেও মুখ খুলতে সাহস করেনা এলাকাবাসী।

ইব্রাহীম পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির আঞ্চলিক নেতা বিডিআর আলতাফের সহযোগী ছিলো। তার নামে রূপসা থানায় হত্যা মামলাসহ প্রায় ৮ টি মামলা রয়েছে। ওই এলাকায় নানা ধরণের অপকর্ম হলেও তার ভয়ে কেউ কিছু বলতে সাহস পায়না।

রাহাত ওরফে টিংকুর বিরুদ্ধে রূপসা থানায় অস্ত্র ও মারামারিসহ বেশ কয়েকটি মামলা রয়েছে। সে রিয়াজুল বাহিনীর অন্যতম সদস্য ও মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত।

বর্তমানে টিংকু ও ইবি উচ্চ আদালত থেকে জামিনে ছাড়া পেয়ে এলাকায় রয়েছে। তারা জামিনে থাকায় আতঙ্কে রয়েছে এলাকাবাসী।

খুলনা গেজেট/ টি আই




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

© 2020 khulnagazette all rights reserved

Developed By: Khulna IT, 01711903692