খুলনা, বাংলাদেশ | ১৪ আশ্বিন, ১৪২৯ | ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২

Breaking News

  গত ২৪ ঘণ্টায় সারা বিশ্বে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১ হাজার ১৬ জন ও আক্রান্ত হয়েছেন ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৮৬১ জন

রাহুগ্রাস (পর্ব ০৭)

গৌরাঙ্গ নন্দী

চিংড়ি চাষ এখন এই এলাকার মানুষের কাছে একটি প্রধান সত্যি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ধানের ক্ষেতগুলো নোনা পানিতে তলিয়ে আছে। সেগুলোতে চিংড়ি পোনা ছেড়ে দেওয়ায় হয়েছে চিংড়ি ঘের। কেউ কেউ নোনা জল সরিয়ে জুলাই-আগস্টের দিকে জমি খালি করে দেয়। কিন্তু তাতে আর আমন ধানের চাষ ভালো হয় না। কোনো কোনো বার হয়তো ধানের পাতো ঠিকঠাক ফেলা যায় না। দেরি হয়ে যায়। কোনো বার নোনায় পুড়ে যায়। কোনোবার ঠিকঠাক বৃষ্টি হয় না; সময়মতো বৃষ্টি না হলে ঠিকঠাক পাতা ফেলানো যায় না, আবার সেই পাতা তুলে গোছা গোছা করে ধানের চারা মাটিতে পুঁতে দেয়াও যায় না। এলাকার মানুষগুলো এই আমন ধান চাষের উপর নির্ভরশীল ছিল। একটাই ফসল। এই ফসল তুলেই তাতে সারা বছরের খাবার ধান রাখা, আর উদ্বৃত্ত ধান বিক্রি করে অন্যান্য প্রয়োজন মিটিয়ে থাকে। যারা ভাগ চাষ করতো তারা ফলন পেতো অর্ধেক। বাকী ধান পেতো জমির মালিক। ধান উৎপাদনে খুব বেশী খাটুনি ছিল না। বর্ষার শুরুতেই জমির এক কোণে বীজ ধান ফেলে দেওয়া। এরই নাম পাতো দেওয়া। ধানের কচি কচি সবুজে ছাওয়া গাছ বিঘত খানেকের চেয়ে বড় হলে তা তুলে রুয়ে দেওয়া। বর্ষাকালেই এসব কাজ। বর্ষায় মাটি নরম হয়ে যায়, তাতেই চাষ দেয়া। গরু আর কাঠের লাঙলে চাষবাস।

সাধারণভাবে এই এলাকায় মোটা জাতের ধান বেশী চাষ হতো। বজ্রমুড়ি, জামাইনাড়–, হরকোচ প্রভৃতি নানান জাতের ধান। বীজ ধান ঘরেই রাখতো সকলে। শিবুও দেখেছে ধান কেটে উঠোনে এনে গাদা করলে সেখান থেকে তার বাবা যতœ করে গোছা গোছা পুষ্ট ধান আলাদা করতেন। সেই ধান আলাদা করে মলন দিতেন। অনেক সময় শুধুমাত্র ধানের গোছা ধরে মাটিতে আছড়ে আছড়ে ধান ছাড়াতেন। সেই ধান তার মা তুলতেন। ঘরের মধ্যে বাঁশের চটার বড় পাত্রে তা রাখতেন, এটাই বীজধান। আবারও সেই বর্ষাকালে এই ধানের খোঁজ পড়তো। বাবা-মা উভয়ে এর তদারকি করতেন। চিংড়ি চাষ শুরু হওয়ার পর থেকে সবকিছু ওলোট-পালট হয়ে গিয়েছে। শিবুর বাবাও মারা গেছে। প্রথম প্রথম দু’-এক বছর তিনি খুব হা-হুতাশ করেছেন। তারপর একদিন জ¦রে পড়লেন। দু’দিন যেতে না যেতেই চিরঘুমে হারিয়ে গেলেন।

শিবু’র বেশ মনে আছে সেই দিনটির কথা। সেদিনও সে সকালের ভাটায় চিংড়ি পোনা ধরতে গিয়েছিল। নদীতে এখন সে এবং আরও অনেকে বিশেষ করে যেসব ভাগচাষী পরিবারগুলোর নিজের জমি কম, অন্যের জমিতে চাষবাস করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, তারাই বেশী সমস্যায় পড়েন। তাদের কাজ থাকে না। চিংড়ি ঘেরগুলোয় সব শহুরে গুÐাদের নিয়োগ দেয়া। আর একটি বড় ঘেরেও হাতে গোণা কয়েকজন শ্রমিকেরই কাজের সংস্থান হয়। ঘের মালিকরা গ্রামের মানুষদের প্রতিপক্ষ ভাবে, শত্রæ মনে করে, তাই এসব ঘেরে তাদের কাজ দেয় না। ফলে এসব মানুষেরা কাজের আশায় নতুন জায়গা খোঁজে। কিন্তু কোথায় কাজ? চাইলেইতো আর কাজ পাওয়া যায় না। এ কারণে তাই ছেলে-মেয়ে, পুরুষ-নারী সকলেই নদীতে নেমে যায়। নদীতে ভাটার টান হলেই বাঁশ বা কাঠ দিয়ে ত্রিভ‚জাকৃতির একটি কাঠামোর সাথে জাল বেঁধে তাই নিয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়া। এই জালগুলোর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, ত্রিকোণাকৃতির কাঠামোর সাথে এটি সংযুক্ত থাকে, আর এর পিছনের দিকটি সরু হয়ে লম্বাকৃতির হয়। ত্রিকোণ কাঠামোর সাথে দড়ি বাঁধা থাকে, সেই দড়ি টেনে নিয়ে কেউ নদীর পাড়ের দিকটায় কোমর বা বুক সমান পানিতে টেনে নিয়ে এগিয়ে যান। নদীর পানির শ্রোতে মাছের পোনাগুলো ওই জালের পিছনের অংশে আটকে যায়। কিছু সময় পর পর জালের পিছনের অংশে আটকে পড়াদের একটি বড় পাত্রে রাখা হয়। এতে নানা ধরণের মাছের পোনা ধরা পড়ে। অনেক সময়ে নানাবিধ অপদ্রব্যও ধরা পড়ে। গাছের পাতা থেকে শুরু করে সাপ পর্যন্তও। সেসব হতেই পাটের আঁশের মতো সরু ইঞ্চিখানেক লম্বা বাগদা চিংড়ির পোনা ঝিনুক দিয়ে বেছে বেছে আলাদা করা। কঠিন এক কাজ!

শুরুতে শিবুও ওই চিংড়ির পোনা খুঁজে পেতো না। নদীর জল এমনিতে ঘোলা। বালু মেশানো ওই জলে এমনিতেই কিছু চোখে পড়ে না। তার উপর নানান জাতের মাছের পোনা, ছোট সু²। এরমধ্যে পাটের আঁশের ন্যায় সরু তিড়বিড় করে চলা চিংড়ির পোনা চেনা খুবই কষ্টের। সকলেরই প্রথম প্রথম খুব কষ্ট হয়েছে। সেও অনেক কষ্টে সেই পোনা চিনেছে। পানির মধ্যে এক চিলতে আধা ইঞ্চির মতো লম্বা সাদা পাটের আঁশের ন্যায় পোনা। এখন শিবু ভালো চেনে। অনেক পোনার মধ্যে হতে বাগদা চিংড়ির পোনা সে আলাদাও করতে পারে। এখন সে জাল টানে। পোনা বাছে। কোন কোনদিন এক ভাটার সময় চারশো থেকে পাঁচশো বা তারও বেশী পোনা ধরে সে। বিক্রিও হয় ভালো। ওই চিংড়ির পোনা ঘের মালিকের লোকেরা কিনে নেয় বিশ থেকে পঁচিশ টাকা প্রতি শ’। তার বড় দুই ভাইয়ের সাথেই সে পোনা ধরতে আসে। সেদিনও এসেছিল। বাবার জ¦র। বারান্দায় তিনি শুয়েছিলেন। বাড়ির পাশের মনো দা এসে খবর দেয়। ’এই তোরা এখুনি বাড়ি চল। তোদের বাবা যেন কেমন করতিছে।’

এ কথা শুনে তিন ভাই হাতের জাল গুটিয়ে পোনার হাড়িটা ধরে যত দ্রত পারে বাড়িতে এসে পৌঁছায়। বাড়িতে ঢোকার আগেই রাস্তা হতে মায়ের কান্না শুনতে পায়। মায়ের আর্ত-চিৎকার, ’দু’দিনির জ¦রেই মানুষটা চইলে গেলো। ওরে তুমি আমারে ছাইড়ে চইলে গিলে কেন?’ বাড়ির মধ্যে তখন আশেপাশের বাড়ির কয়েকজনও এসে পৌঁছেছে। কে যেন বলে ওঠে, ’এখন বারান্দা হতে মরদেহ উঠোনে নামাতি হবে।’ শিবুর দাদারা এবং আরও কয়েকজন মিলে মরদেহ উঠোনে নামায়। মরদেহটি একটি চাদর দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। কে যেন একটি তুলসিগাছ মাথার কাছে এনে রাখে। মরদেহর বুকের উপর কেউ একজন শ্রীমদ্ভাগবত গীতা এনে রাখে। কেন এসব, এ প্রশ্ন শিবুর মাথায় ঘুরপাক খায়। কিন্তু কার কাছে সে জানতে চাইবে। নিজে নিজেকেই প্রবোধ দেয়, না, এসময় সকলের মন খারাপ, এখন কারও কাছে কিছু জিজ্ঞেস করা যাবে না। তারও মন খারাপ। বাবাটা মরেই গেল। চিংড়ি চাষের কাল শুরু হওয়ার পর থেকেই তিনি কেমন যেন মন-মরা থাকতেন। প্রথমবারে যখন ঠিকমতো ধানের চারা লাগাতে পারেননি, তখন থেকেই তিনি অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। বলতেন, ’আমরা কৃষক। ধান ফলাই। আমন ধান। ওই আমাদের ফসল। ওতেই সবকিছু। তাই যদি না ফলাতে পারি, তাহলে কি করে সংসার চলবে! জীবন কিভাবে চলবে! আমাদেরতো চিংড়ি বেচে নগদ টাকা হলি পেট ভরবে না। বড়ান ধানের ভাইটেল চালের স্বাদই যে আলাদা। সেই ছোটবেলা থেকে এই কইরে আসছি। আজও এইটে জানি। এহোন আমাইগে কি হল!’

চিংড়ি চাষের জবরদস্তি শুরুর পর্ব একটু থিতু হলে, ওই চাষের পক্ষে অনেক কথা শোনা যেতো। চিংড়িতে অনেক টাকা। নগদ টাকা। নগদ টাকা থাকলে ধান কি কাজে লাগবে। চাল কিনে খাওয়া যাবে। জমিতে ধান উৎপাদন করতেই হবে, বিষয়টি এমন নয়। এসব বিতর্কে বাবা খুবই বিমর্ষ হতেন। কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলেন। বলতেন, ’আমরা মাছে-ভাতে বাঙালি। আমরা ভাত খাই। বিলি ধান হয়। আর খালে-নদীতি মাছ হয়। খালে একবার জাল খেপ দিলি এক ঝুড়ি মাছ পাওয়া যায়। নানা রকমের মাছ। কালো রংয়ের নানান সুস্বাদু মাছ, আবার সুন্দরবনতো মাছের খনি। সেখানেও হাজার রকমের মাছ। এই মাছ দুনিয়ার আর কোথাও পাওয়া যায় না। এক এক অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য এমনি। সুন্দরবনের এই অঞ্চল আবাদ করে বসতি। নতুন এই জমিতে ধানের ফলন, খালে-নদীতে মাছের ফলনও ভালো ছিল। তা সব এখন ওই চিংড়ি চাষীদের পেটে যাচ্ছে। সকল কিছুর দখল তারা নিচ্ছে। গ্রামের খালগুলোও একে একে তারা দখলে নিচ্ছে। মানুষ আর চাইলেই খালে জাল ফেলতে পারে না। অরাজকতা। কেউই দেখার নেই। কেউ কথা বলার নেই। এভাবে কি বাঁচা যায়।’ এই দুর্ভাবনায় কি শেষ পর্যন্ত বাবা মারা গেল?

শিবু মোটেই বুঝে উঠতে পারে না। তবে বাবার আর একটি কথা তার খুব মনে পড়ছে। তার বড় দাদা যেদিন তেকোনা ছোট্ট জাল নিয়ে নদীতে চিংড়ি পোনা ধরার জন্যে যায়, সেদিন তিনি খুব হতাশ হয়েছিলেন।চিংড়ি চাষ আইসে আমরা জাইলে হইয়ে গেলাম! ছিলাম কৃষক, হলাম জাইলে। খেতে-খামারে আমরা ঘুরে বেড়াতাম। চাষবাস করতাম। এখন আমরা সব নদীতি। আমরা সব জাইলে! এখন চিংড়ির পোনা ধইরে তাই বিক্রি কইরে আমাদের সংসার চলবে! একি অনাসৃষ্টি!’ অবশ্য, অনাসৃষ্টি যে কি, তা শিবু বোঝেনি। শিবু জানতেও চায়নি। একদিন সেও দাদাদের সাথে চিংড়ি পোনা ধরার সঙ্গী হয়। আজও চিংড়ি পোনা ধরার সময়ই বাবার মৃত্যুর কথা শুনতে পায়। আচ্ছা, খবরটি যে দিয়েছিল, সেতো তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে আসতে বলেছিল, বাবা মারা গিয়েছিল, তাতো বলেনি। বাবা কি তখন মারা গিয়েছিল? না-কি, সে খবর নিয়ে যেতে না যেতেই মারা গেল!

বড়রা নিজেদের মধ্যে শশ্মাণযাত্রা কখন, কিভাবে হবে; কে এলো, নিকটজন আর কেউ আসবে কি-না, তাই নিয়ে কথা বলছিলেন। নির্দিষ্ট সময়ে শশ্মাণযাত্রা হ’ল। গ্রামের অনেক মানুষেরা তাতে যোগ দেয়। ঢাকি’র পাড়ে নির্দিষ্ট জায়গাটিতে দাহ করা হয়। মুখাগ্নি করে তার বড় দা’। শিবু তার দাদাদের সাথেই ছিল। একসময় তারা বাড়ি ফেরে। মায়ের পরণে দেখে সাদা থান। বাবা মারা গেছে, তাই মায়ের এই বেশ। স্বামী মারা গেলে স্ত্রীর এই আচার। তার মানে স্বামীর অবর্তমানে স্ত্রীর জীবন থেকে সব রং মুছে যাবে! এ কেমন আচার! এটাই বা কেমন। একজন পুরুষ একজন নারীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একটি নতুন জীবন গড়ে তোলে। তাই বলে একটি সময় স্বামীর অবর্তমানে স্ত্রী অর্থাৎ ওই নারীর সবকিছু হারিয়ে যাবে! আচ্ছা, তাহলে ওই পাড়ার খগেন খুড়োর স্ত্রী মারা গেলে তিনি আবার বিয়ে করেছিলেন কেন? স্ত্রী মারা গেলে স্বামী যদি আবার বিয়ে করতে পারে, তাহলেতো স্বামী মারা গেলে স্ত্রীও আবার বিয়ে করতে পারে। অবশ্য, মা এখন আবার বিয়ে করবে! তাই হয় না-কি! আপন মনেই এসব ভেবে শিবু ফিক করে হেসে ওঠে। চারিদিকে এক গম্ভীর পরিবেশ। সদ্যই এই বাড়ির প্রবীণ সদস্য আকাশের তারা হয়ে গেছেন, এখন এভাবে হাসাটা বেমানান; তা বুঝতে পেরেই শিবু মুখ লুকাতে একদিকে সরে যায়।

শিবু’র কতো কথা মনে পড়ে। বাবা বলতেন, এই চিংড়ি সব খাবে। আজ আমাদের ধান খাচ্ছে, কাল গাছপালা খাবে, মাছ খাবে; সব, স-ব খাবে। নোনায় পুড়ে সব নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। হ্যাঁ, বাবা সে লক্ষ¥ণগুলো দেখে যেতে শুরু করেছিল, এখনতো কিছু নেই। আগে গাছপালাগুলো সব একে একে মরে গেল। বাড়ির উঠোনের কোণায় কতকগুলো নারকেল গাছ ছিল, তা নেই। আম গাছ নেই। চারিদিকে ধু ধু মাঠ। গরমের হলকা ওঠে। আগে এলাকায় যে হাজারো রকমের মাছ পাওয়া যেতো, তার কিছু নেই। এখন ভদ্রা নদীর ওপাড়ে বড় চিংড়ি ঘেরে পাঙ্গাস মাছের চাষ হয়। চিংড়ির উৎপাদনও কমে গেছে। সবচেয়ে বড় বিপর্যয় হয়েছিল গত বছর – ২০০৮ সালে। চালের সংকট দেখা দেয়। শোনা যায়, বিশ^জুড়েই না-কি খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছিল। আমাদের দেশের সরকারও না-কি টাকার থলে নিয়ে অনেক দেশে গিয়েছিল, কিন্তু চাল কিনতে পারেনি। সকল দেশই নিজের দেশের মানুষদের জন্যে চাল প্রয়োজন বলে অন্য দেশে চাল বিক্রি করতে চায়নি। আমরা চাল কিনতে পারিনি। টাকা থাকলেই চাল কেনা যাবে, তা যে সত্যি নয়, তা প্রমাণিত হয়। তাই দেখে, আবারও গ্রামের মানুষেরা ধান চাষে ঝুঁকছে। নোনা পানির আবারও বিরোধিতা শুরু হয়েছে। নোনা পানি আর তুলতে চায় না। অবশ্য, বহিরাগত চিংড়ি চাষীরা আর নেই। এখন এলাকার মানুষেরাই নিজেদের জমিতে চিংড়ি চাষ করে। প্রথম বছর দশেক চিংড়ির আয় বস্তা ভরে নিয়ে গিয়ে শহরের মানুষগুলো শহরে গিয়ে উঠেছে। এখানে আছে এখানকার মানুষগুলো। এরা আর নোনা পানি তুলে আর জমি নষ্ট করতে চায় না, নিজেদের খাবারের নিশ্চয়তার জন্যে ধানের চাষ করতে চায়। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের অঙ্গীকারও ছিল, তাঁরা জয়লাভ করলে এলাকায় নোনা পানি তুলতে দেবে না। বাগদা চিংড়ির চাষ হবে না, মানুষ ধান চাষ করবে।

নোনার বিষে তিতো হয়ে যাওয়া ভ‚মিতে এখন আর আগের মতো ধান হয় না। নতুন ধান উঠেছে। উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান। বলে উফশী। আসলে কৃত্রিম উপায়ে ল্যাবরেটরিতে এর উৎপত্তি। এই চাষে ফলন আগের দেশী ধানের চেয়ে বেশ ভালো। মানুষ তাই এই উফশী জাতের ধান উৎপাদন করতে চায়, আর এই চাষের ব্যাপকতায় হারিয়ে যাচ্ছে দেশী জাতের ধান। আমাদের মায়েরা আর সেই যতœ করে বীজ ধান রাখে না। বীজ ধান রাখার প্রয়োজন পড়ে না। কারণ, উফশী ধানের বীজ বাজার থেকে কিনে আনতে হয়। বাজারের ওই বীজে উৎপাদিত ধান হতে বীজ হয় না। কেউ কেউ চেষ্টা করেছিল, তবে তারা পারেনি।

শুধু কি দেশী জাতের ধান, দেশী মাছও গেছে। এখন আর খালে জাল ফেললেই মাছ মেলে না। অবশ্য, খালগুলো সবই চিংড়িচাষীদের দখলে। সরকার নিয়ম করেই চিংড়িচাষীদের নামে খালগুলো বরাদ্দ দিয়ে দেয়। এতে এলাকার মানুষ যেমন খালে নামতে পারে না, তেমনি ঘের-মালিকরা সবকিছুর নিয়ন্ত্রক হয়ে বসে। এতে সবচেয়ে ক্ষতি হয় খাবার জলের। খাবার জলের ভয়াবহ কষ্ট। সুন্দরবনের কোলে এই এলাকায় আগে কখনও মিষ্টি জলের সহজপ্রাপ্যতা ছিল না। মানুষ বড় বড় পুকুর কাটতো। সরকারের উদ্যোগেও বড় বড় পুকুর কাটা হতো। প্রায় প্রতিটি স্কুলে ছিল পুকুর। এসব পুকুরের পানি মানুষ পান করতো। এখন চারিদিকে নোনার ধাক্কায় বড় পুকুরগুলোর পানিও নোনা। আর ওই যে, সরকারের কাছ থেকে চিংড়ি চাষীরা, বড়লোকরা পুকুর লিজ নিয়ে তাতেও মাছ চাষের নামে চিংড়ি চাষ করে; এতে খাওয়ার পানির উৎসগুলো নষ্ট হয়ে গিয়েছে। আগে যেমন বড় পুকুরে মিষ্টি পানি জমা থাকতো, তেমনি খালেও থাকতো মিষ্টি পানি। কিন্তু এখন সকল জায়গার পানি নোনা। অনেক বাড়িতে বৃষ্টির জল ধরে রাখার ব্যবস্থা ছিল, বড় বড় মাইঠেয় মানুষ বৃষ্টি জল ধরে রেখে খেতো। দুই-তিন মাস হয়তো চলতো, তাতে পোকাও হতো, তবুও মানুষ এক ধরণের অভ্যাস গড়ে তুলেছিল। এখন একেবারে আকাল।

আর গেছে বাঁধ। নদীর পাশ বরাবর দেওয়া মাটির এই বাঁধে ইচ্ছেমতো কাঁটা-ছেঁড়ায় তা খুবই দুর্বল হয়ে গিয়েছে। এই কামারখোলা-সুতারখালি দুটো ইউনিয়ন নিয়ে দ্বীপটিতে বাঁধ শতছিন্ন। বাঁধের বাইরে নদীর পাড়ে একটুও জমি-মাটি নেই। নদীর পাড়ের মাটি কেটে বাঁধ পর্যন্ত আসায় নালা-খাল তৈরি হয়েছে। এতে নদীর পানির চাপ পড়েছে বেশী। ভাঙ্গন জোরদার হয়েছে। বাঁধের বাইরে, নদী-পারের জমি ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে নদীতে গেছে। এখন জোয়ারের পানি বাঁধের গায়ে ধাক্কা দেয়। আবার, জোয়ারে আসা পলি নদীর তলদেশে জমা হয়ে নদীর বুক উঁচু হচ্ছে। জোয়ারের সময় আগের চেয়ে পানি অনেক উঁচুতে উঠছে। আর ঝড়-ঝঞ্জার সময় সৃষ্ট জলোচ্ছ¡াসের ধাক্কায় বাঁধের ভাঙ্গন আরও বাড়ে, কখনও কখনও জোয়ারের পানি বাঁধ উপচিয়ে চলে আসে।

আইলায় মÐল বাড়ির পাশের ভাঙ্গনে আজ তাদের ভিটে-মাটি সব হারিয়ে গেছে। মÐল বাড়ির পাশে ওই চিংড়ি চাষীরা বাঁধ কেটে নোনা পানি তুলেছিল। পরে কখনও আর তা আটকায়নি। চিংড়ি চাষ এই এলাকায় প্রায় বন্ধ হলেও বাঁধে ভাঙ্গনের ক্ষত রয়ে গিয়েছিল। আইলায় সৃষ্ট জলোচ্ছ¡াসের ঝাপটা আর ওই ভাঙ্গনের জায়গাটি সহ্য করতে পারেনি। ওই ভাঙ্গন দিয়ে হু হু করে পানি প্রবেশ করে এলাকা তলিয়ে দেয়; আবার ভাঙ্গনও বাড়ে। সেই ভাঙ্গনে ছোট জালিয়াখালি গ্রামটিই ঢাকি’র পেটে চলে গিয়েছে। (চলবে)




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

© 2020 khulnagazette all rights reserved

Developed By: Khulna IT, 01711903692