খুলনা, বাংলাদেশ | ১০ বৈশাখ, ১৪৩১ | ২৩ এপ্রিল, ২০২৪

Breaking News

রাহুগ্রাস (পর্ব ০৬)

গৌরাঙ্গ নন্দী

চিংড়ি চাষের এলাকা বাড়তে থাকে। দাকোপে আসার আগে পাইকগাছা-কয়রার বিশাল জায়গা জুড়ে, তারও আগে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর, আশাশুনি উপজেলায় চিংড়ি চাষ বেড়েছে। ক্ষতির শিকার মানুষগুলো নানান জায়গায় প্রতিবাদ করছে। প্রতিবাদের ফল হয়েতো ভালো হয়নি, চিংড়ি চাষের বিস্তার ঠেকানো যায়নি, কিন্তু মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছে। শহুরে দাপুটে মাস্তানদের হাতে সকলেই শুধু শুধু একতরফা মার খায়নি। নানান জায়গায় প্রতিবাদকারীরা হত্যার শিকার হয়েছে। কোন কোন জায়গায় মানুষ মরেছে, কি কারণে হত্যা করা হয়েছে, তা কেউ বুঝতে পারেনি। চোরাগোপ্তা হামলা, হত্যাকাণ্ড। এসব ঘটনায় বেশীরভাগ ক্ষেত্রে থানা-পুলিশ মামলা নেয়নি। ডহুরির বিলে চিংড়ি চাষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের সংগঠক শিক্ষক গোবিন্দ মণ্ডলকে চিংড়ি চাষী আতিয়ার খাঁ-এর লোকেরা গুলি করে হত্যা করে। কিছুই হয়নি। বটিয়াঘাটার করেরঢোনে জাবেরকে হত্যা করে। এরকম আরও অনেক ঘটনা আছে। তবে ব্যতিক্রম পাইকগাছার দেলুটিতে করুণাময়ী সরদার হত্যাকা-ণ্ডর ঘটনা। এই ঘটনাটিতে দেশজুড়ে শোরগোল ওঠে। ঢাকা থেকে একদল সাংবাদিক আসে, মানবাধিকার কর্মীরা আসে। পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হয়।

এরও কারণ আছে। করুণাময়ী হত্যাকাণ্ডটিতে মামলা করে এনজিও ’নিজেরা করি।’ প্রথমে পুলিশ মামলা নিতে চায়নি। কারণ, প্রতিপক্ষ বেজায় ক্ষমতাধর। শাসক দল জাতীয় পার্টি নেতা ওয়াজেদ আলী বিশ্বাস। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় এই ঘটনায় মামলা হয়। ঘটনাটি মানুষের মাঝে জিইয়ে রাখার জন্য ‘নিজেরা করি’ প্রতি বছর হত্যাকাণ্ডের দিনটি স্মরণ করে। হত্যাকাণ্ডস্থলে তাঁর স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়েছে। সেখানে সমবেতদের পক্ষ হতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হয়। সমাবেশ হয়। নানান জন বক্তৃতা করেন। নোনা পানির বিরুদ্ধে শ্লোগান নেন। নোনা পানির চিংড়ি চাষের বিরুদ্ধে অবস্থান ঘোষণা করেন। কিন্তু নোনা পানির চিংড়ি চাষ থামে না।

আজ দেলুটির করুণাময়ী সরদারের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। সেখানে জমায়েত হবে। দলে-দলে লোক যাচ্ছে। পাশের বাড়ির অসীম দাদাও যাচ্ছে। শিবু তার পিছু নিয়েছে, সেও যেতে চায়। অসীম শিবুকে বলে, ’কাকিমার কাছ থেকে তুমি যদি অনুমতি আনতি পারো, তালি যাতি পারবা। তা না হলি পারবা না।’ শিবু দৌড়ে গিয়ে মায়ের কাছে বায়না ধরে। একাধিকবার বলায় মা তার বোকা ছেলেটাকে অনুমতি দেয়। বলে, ‘দেখো, তুমি কিন্তু অসীমির কাছ ছাড়া হবা না। অন্য কোথাও চইলে যাবা না।’ শিবু অনুমতি পেয়েই একটি ইঞ্জিনে চলা নৌকায় চেপে বসে। অনেকেই সেই নৌকায়। সকলেই বলাবলি করছে, ওই এলাকার মানুষের বীরত্বের কথা, প্রতিবাদের কথা, একজন নারীর এগিয়ে গিয়ে মৃত্যুকে বরণ করে নেয়ার কথা।

সেখানে নোনা পানি তুলে চিংড়ি চাষ করতে যায় জাতীয় পার্টি নেতা ওয়াজেদ আলী বিশ্বাস। তার লোকজন একদিন দ্বীপ এলাকাটির এক কোণে বাঁধ কেটে দেয়। খবর পেয়ে এলাকাবাসী তা প্রতিরোধ করে। কয়েকশ’ গ্রামবাসী বাঁধ কাটতে বাধা দেওয়ায় সেদিন তারা আর বাঁধ পুরোপুরি কাটতে পারেনি। আসলে সেদিন যারা ছিল, তারা সকলেই ছিল ভাড়াটে শ্রমিক। তাদের মধ্যে নেতা গোছের একজন ছিল। সে আর গ্রামবাসীর বাধার মুখে কাজ করতে চায়নি। সে গ্রামাসীকে বলে, ‘আমরাতো বাঁধ কাটার চুক্তি করেছি, ঘেরমালিক এখন নেই, তাদের সাথে আপনারা কথা বলুন।’ কিন্তু গ্রামবাসী তাকেই ধরে। বলে, ‘ঘের মালিককে যখন পাচ্ছি না, তখন তোমাকেই বলছি, বাঁধ কাটতি পারবে না। নোনা পানি তুলতে দেবো না।’

সেদিনের মতো কাজে ক্ষান্ত দিয়ে তারা ওয়াজেদ সাহেবকে খবর পাঠায়। তিনি খুলনা জেলা শহরে ছিলেন। ঘটনা শুনেতো হতবাক। গ্রামের লোকজন তার কাজে বাধা দিয়েছে। তারা নোনা পানি তুলতে দেবে না। গ্রামের মানুষের এতো সাহস! তিনি পাইকগাছার একাধিক জনের সাথে কথা বলে গ্রামের মাথা-গোছের মানুষদের সাথে কথা বলতে বলেন। তাদেরকে যেকোনভাবে ম্যানেজ করতে বলেন। প্রয়োজনে তাদের টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ করতে হবে। নোনা পানি তোলার সময় এখুনি। এই সময় বাঁধ না কাটতে পারলে, নোনা পানি যেমন উঠবে না; তেমনি নোনা পানির সাথে চিংড়ি পোনাও উঠবে না। পাশাপাশি তিনি থানায় কথা বলেন। পুলিশের ইন্সপেক্টরকে বলেন, ‘সরকার চায় চিংড়ি চাষ হোক, আমি চিংড়ি চাষ করতে চাই, কিন্তু গ্রামবাসী না-কি নোনা পানি তুলতে দেবে না। এতো সরকারি কাজে বাধা। এতো মেনে নেয়া যাবে না।’

লোকজন খবর নিয়ে আসে ওয়াজেদ আলীর কাছে, দেলুটির ওই মানুষগুলো বিশেষ করে ভূমিহীন পুরুষ-নারীরা সমিতি করেছে। ওই এলাকায় নেদারল্যান্ড সরকারের সহায়তায় পাউবো একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সেই প্রকল্পের আওতায় সেখানকার ভূমিহীন নারী-পুরুষকে সংগঠিত করা হয়েছে। প্রকল্পের উদ্দেশ্য, নোনা পানি ব্যবহার করে ফসল ফলানো। আর নদীপাড়ের খাসজমিগুলো এসব ভূমিহীন সমিতিগুলোর মাঝে বরাদ্দ দিয়ে তাদের আয়ের ব্যবস্থা করা। যে কারণে তারা বেশ সংগঠিত। নোনা পানি মোটেই তুলতে দিতে চায় না। কিন্তু জাতীয় পার্টি নেতা ওয়াজেদ আলি গজ-গজ করতে থাকেন। না খাওয়া মানুষগুলোর এত্ত বড় সাহস! আমার কাজে বাধা। তিনি কোনভাবেই হাল ছেড়ে দিতে রাজি নন।

তার অনুগত লোকেরা হরিণখোলার কয়েকজনকে তার কাছে নিয়ে আসে। তাদের সুবিধা দেওয়ার কথা বলে। আরও বলে তারা যেন গ্রামের লোকদের তার পক্ষে নিয়ে আসার চেষ্টা করে। কিছু নগদ অর্থও তাদের হাতে গুঁজে দেয়। তারা মুখের উপর না বলতে পারেনি। আবার পুরোপুরি দায়িত্বও নিতে পারেনি। বলে, আমরা দেখি সকলের সাথে আলাপ-আলোচনা করে, কতদূর কি করতে পারি।

গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে গ্রামের কানু সরদার, অনুপ মন্ডল, মুহসিন ঢালি, হরষিত বাছাড় প্রমূখেরা ওয়াজেদ আলী বিশ্বাসের সাথে বৈঠক করতে গিয়েছিল। এ খবরে গ্রামের লোকেরা উত্তেজিত। তারা দল বেঁধে খেয়াঘাটে জড়ো হয়, খেয়াঘাটেই তাদের আটকে জানতে চাওয়া হবে, তারা কেন গ্রামের গরীব মানুষের বিপক্ষে গেল। তারাতো ধনী নয়, তাদেরতো বেশী জমি নেই। কারও এক বিঘে, কারও দুই বিঘে জমি। বর্গা চাষ করে। বেশী জমির মালিকেরা দলে দলে একবারে অনেক টাকার আশায় চিংড়ি চাষে ঝুঁকছে। কিন্তু গরীব মানুষের কি! অন্যান্য এলাকার গরীব কৃষক, ক্ষেতমজুর, দিনমজুররা সবাই নদীতে চিংড়ি পোনা ধরা শুরু করেছে। চিংড়ি পোনা ধরে। তাই বিক্রি করে, এরাও কি তাই করতে চায়। বাড়ির মেয়েরাও তেকোনা ছোট জাল নিয়ে নদীতে নেমে পড়ুক। এরা কি তাই চায়।

যারা ওয়াজেদ আলির সাথে কথা বলেছিল, তারা পরিস্থিতি বুঝতে পেরে গ্রামবাসীকে আশ্বস্ত করে এই বলে যে, একজন মানুষ ডেকেছিল তাই তারা কথা বলতে গিয়েছিল। কথা বলা মানেতো গ্রামবাসীর দায়িত্ব নেওয়া না। আমরা সমিতির সভায় সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই পোল্ডারে নোনা পানি উঠবে না, মানে নোনা পানি উঠবে না। ওয়াজেদ আলীর লাঠি-বন্দুকের ভয় আমরা করি না। প্রতিদিনই হরিণখোলা ও আশেপাশের গ্রামে ভুমিহীন সমিতির বৈঠক হতে থাকে। প্রতিটি বৈঠকে এক আলোচনা, সকলকে সতর্ক করা; সকলকে সতর্ক থাকতে বলা, যে কোন সময়ে ওয়াজেদ আলীর লোকজন আবারও সেজেগুজে এসে বাঁধ কেটে দিতে পারে। বাঁধ কাটতে এলে তাদের প্রতিরোধ করা হবে। ঠেকাতে হবে। এজন্যে তারা দিনে-রাতে নদী-তীরে পাহারা বসায়। যাতে যেকোন সময় লোকজন এলে গ্রামবাসীকে যেন খবর দেওয়া যায়, গ্রামবাসী যেন এসে জড়ো হতে পারে। অন্তত: দুই দফা এভাবে তারা আক্রমণ প্রতিহত করে।

এরপর দুই পক্ষেই যেন সাজ সাজ রব পড়ে। ওয়াজেদ আলী তার লোকজনকেও জড়ো করতে থাকে। পরিকল্পনা করতে থাকে, কিভাবে কেমন করে একদিনেই একাধিক জায়গার বাঁধ কেটে দেওয়া যায়। পাশাপাশি পুলিশকেও জানিয়ে রাখে, তারা যেভাবেই হোক ২২নং পেল্ডারে পানি তুলবে। একবার নোনা পানি তুলতে পারলে আর পায় কে! তখন কেউ আর কিছুই করতে পারবে না। অনদিকে, হরিণখোলা ও আশেপাশের ভুমিহীন সমিতিগুলোও সকাল-বিকাল সভা করে চলে। ছোট ছোট দলে আলোচনা, বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে আলোচনা। আলোচনায় একটাই কথা, আমরা জান দেবো, তবুও নোনা পানি তুলতে দেবো না। এ কারণে সকলকে সদা সতর্ক থাকা। দিন-রাত পালা করে নদীর পাড় ধরে ভূমিহীনরা পাহারা দিতে শুরু করে।

শোনা যায়, ৭ নভেম্বর তারিখে ওয়াজেদ আলির লোকেরা বাঁধ কাটতে আসবে। সত্যিই কি সাত তারিখে আসবে! সকালে না দুপুরে! না-কি ভোর রাতে; এসব নিয়ে নানান কানাঘুষা চলতে থাকে। ভূমিহীনদের পাহারা রাতের বেলা আরও কড়াকড়ি হয়। সকাল হতে না হতেই কয়েক ট্রলার ভর্তি লোক হরিণখোলার পাড়ে এসে নামে। একদল নামে কোদাল, শাবল নিয়ে আর এক দলের কাছে লাঠিশোটা, বন্দুক, ধারালো অস্ত্র। কারও-কারও কাছে বস্তাভর্তি বোমা। হৈ-হৈ করে ইঞ্জিনে চলা নৌকা থেকে নেমেই একদল মানুষ নদীর পাড় ধরে খাল কাটতে শুরু করে। ওই খাল নিয়ে যাবে বাঁধ পর্যন্ত। একদল বাঁধের উপরে কাটতে শুরু করে; আর তাদের পাহারা দিয়ে রাখে একাধিক অস্ত্রধারী দল।

ঘ্যাঙরাইল নদীতে তখন সবে ভাটা শুরু হয়েছে। তাদের লক্ষ্য পুরো ভাটায় বাঁধ কাটার কাজ সম্পন্ন করতে পারলে জোয়ার এলেই জোয়ারের নোনা পানি হু-হু করে বিলে গিয়ে ভাসিয়ে দেবে। ভূমিহীনরাও বসে ছিল না। তারাও দল বেঁধে মিছিল নিয়ে এগুতে থাকে। বাঁধ কাটার স্থানে আসার আগেই একদল লোক তাদের বাধা দেয়। মিছিলকারীরা বাঁধ কাটতে নিষেধ করে। এই নিয়ে তর্কাতর্কি, চিৎকার চেচামেচি, থেকে মারামারি। ওয়াজেদ আলির লোকদের সাথে ভূমিহীনরা পেরে ওঠে না, তারা পিছু হঠে। ততোক্ষণে পুরো গ্রামে খবর পৌঁছে গেছে যে, ওয়াজেদ আলির লোকেরা এসে বাঁধ কাটছে, ভূমিহীনদের সাথে মারামারি হচ্ছে।

তখন বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। রাস্তার মাটি বৃষ্টিতে ভিজে পিচ্ছিল হয়ে গিয়েছে। কোথাও-কোথাও এরই মধ্যে কাদা হয়ে গিয়েছে। তারই মধ্যে প্রতিটি ভূমিহীন পরিবারের পুরুষ-নারী-শিশু সদস্যরা পিঁপড়ের সারির মতো বেরুতে শুরু করে। কে যেন শ্লোগান দিতে শুরু করে, ‘জান দেবো, তবু বাঁধ কাটতি দেবো না।’ ‘ওয়াজেদের গুন্ডারা হুঁশিয়ার, সাবধান।’ বৃষ্টি, বাতাসের ঝাপটা, জোয়ারের মুখে আসা নদীর গর্জন সব মিলে যেন ওয়াজেদের ভাড়াটে লোকদের উপর হামলে পড়তে চায়। বিপুল সংখ্যক নর-নারী আসতে দেখে ওয়াজেদের লোকেরাও বেশ চিন্তিত হয়ে পড়ে। কি করা যাবে। এতো মানুষকে কি করে ঠান্ডা করবে। মুহূর্তেই তারা কর্তব্য ঠিক করে ফেলে। বোমা মেরে লোকগুলোকে হঠিয়ে দেয়া হবে, না হলে গুলি চালানো হবে। শ্লোগান দিতে দিতে মিছিলকারীরা তাদের দিকে এগিয়ে যায়। হাত বিশেক দূরে থাকতেই প্রতিপক্ষ বোমা ছুঁড়তে শুরু করে। একের পর এক বোমা। কোন কোনটি বিকট আওয়াজ করে ফুটছে, বেশীরভাগ জল-কাদায় পড়ে ফুঠছে না। যা দু-একটা ফুটেছে, তাতেই ধোঁয়ার কুন্ডলীতে রাস্তা অন্ধকার করে ফেলে। গ্রামবাসী হকচকিয়ে যায়। কেউ কেউ পিছু হঠে। তারই মধ্যে এক নারী এগিয়ে আসে। হালকা-পাতলা গড়নের। রোদে পোড়া তামাটে বর্ণের গায়ের রঙ। কোমরে তার শাড়ির আঁচল প্যাচানো। তিনি বলে ওঠেন, ‘আমাদের পিছিয়ে গেলে চলবে না। আমাদের এগুতে হবে। ওদের আক্রমণে ভয় পেলে, ওরা জিতে যাবে, ওদের জিততে দেয়া যাবে না।’ তিনি এগিয়ে চলেন।

এই নারী ভূমিহীন নারী সমিতির নেত্রী করুণাময়ী সরদার। করুণা এগুচ্ছে। সঙ্গী হয়েছে আরও শত জন। মুখে শ্লোগান, মুষ্ঠিবদ্ধ হাত শ্লোগানের সাথে উঠছে। ‘ওয়াজেদের গুন্ডারা, হুঁশিয়ার, –সাবধান।’ গুড়ুম, গুড়ুম, বিকট আওয়াজ। সকলেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। গোঙানি, চিৎকার। কেউ-কেউ তখন ঘটনাটি বুঝতে পারে নি; কয়েক সেকেন্ড পরেই একাধিক জন চিৎকার করে ওঠে; গুলি, ওরা গুলি করছে। অনেকেই লুটিয়ে পড়েছে। কেউ-কেউ আহতদের শরীরের উপর দিয়েই দৌড়ে পালাচ্ছে। আর প্রতিপক্ষ গুলি ও বোমা ছুঁড়ে চলেছে।

বেশ কিছু পরে গুলি-বোমার শব্দ থামে, ওয়াজেদের লোকেরা আহতদের মধ্যে কাকে-কাকে যেন তুলে নিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকা করে ছুটে পালায়। যারা আহত হননি, তারা আহতদের উদ্ধার করে। তাদের চিকিৎসার প্রয়োজন। এজন্যে পাইকগাছা, খুলনায় পাঠাতে হবে। কেউ-কেউ ইঞ্জিনচালিত নৌকা জোগাড় করতে ছোটেন। কেউ-কেউ নৌকায় তোলেন। কিন্তু করুণাময়ী সরদার, যে ছিল মিছিলের সামনে, তিনি কোই? না, তাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সকলেই গোটা এলাকায় ছড়িয়ে খুঁজতে থাকে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তার পরনের শাড়ির এক অংশ, চুলের এক গোছা, মাথার ঘিলু-রক্ত প্রভৃতি বাবলা গাছের ডালে খুঁজে পায়। তখন তারা নিশ্চিন্ত হয়, করুণাময়ীর দেহটি ওয়াজেদের লোকেরাই নিয়ে সরে পড়েছে। এখানে কোন ঘটনা ঘটেনি, কেউ মারা যায়নি, তাই প্রমাণের জন্যই তারা মরদেহটি নিয়ে সরে গিয়েছে।

না, ওই ঘটনার পর ওয়াজেদ আলি সেখানে আর চিংড়ি চাষ করার জন্যে নোনা পানি তোলার চেষ্টা করেনি। এর জন্যে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। করুণাময়ী হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয় থানা-পুলিশ কোন মামলা গ্রহণ করেনি। মামলা গ্রহণ, প্রশাসনকে পক্ষে আনা প্রভৃতি ঘটনায় নেদারল্যান্ড সরকারের দূতাবাসের পক্ষ হতে অনুরোধ করেছিল। কারণ, নেদারল্যান্ড সরকারের সহায়তায় এই ২২নং পোল্ডারে পাউবো একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছিল। সেই প্রকল্পের স্বার্থে তারা নোনা পানি ওঠানোর বিরোধিতা করছিল।

বছর ঘুরে আবার সেই ৭ নভেম্বর। হরিণখোলার নদীতীরের বাঁধের উপর হাজার লোকের জমায়েত। শিবু শুধু মানুষ আর মানুষ দেখে। মানুষে ছেয়ে গেছে। ওই দূরে একটি স্টেজ দেখতে পায় সেখানে অনেক নেতা বসে আছে। একে-একে অনেক নেতা কথা বলে। সকলে ওয়াজেদ আলির বিরুদ্ধে কথা বলে, চিংড়ি চাষের বিরুদ্ধে কথা বলে, নোনা পানির বিরুদ্ধে কথা বলে। করুণাময়ীর শিক্ষা নিয়ে আত্মত্যাগের পথে চিংড়ি চাষ রুখে দেওয়ার কথা বলে। কিন্তু শিবু ভেবে পায় না, মানুষের এতো বিরোধিতা, এতো শপথ; তারপরও চিংড়ি চাষ কিভাবে বাড়ে। তাদের বাড়ির কোণায় এখন নোনা জল। সেই জলে চিংড়ি হয়। মালিক চিংড়ি ধরে। টাকা আয় করে। আর তাদের ধানও হয় না। টাকাও পায় না। এতো যদি চিংড়ি বিরোধিতা তাহলে গফুর সাহেবরা চিংড়ি চাষ করে কিভাবে! শিবুর মাথায় চক্কর দিতে থাকে। সে যেন কিছুই ভাবতে পারে না।

একটা ঘোরের মধ্যে সারাটা দিন কাটিয়ে এসে সে কোনমতে দুটো খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে। মা তাকে বলে, ‘তোরেত এইজন্যি কোথাও যাতি দিতি চাইনা। তুইতো কোনকিছু সহ্য করতি পারিস না। কি কারণে যে তুই বাটাছেলে হইয়ে জন্মাইছিলি, তা খিডা জানে। বিটা মানুষের কি অতো দুর্বল হলি চলে।’ কিছুই বলে নি শিবু। আস্তে করে গুটিশুটি মেরে বারান্দার এক কোণে শুয়ে পড়ে।

মা বলেছে শিবু দুর্বল। না, তাকে দুর্বল হলে চলবে না। সে গ্রামের ছেলেদের একত্রে জড়ো করে ওই চিংড়িচাষীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। মিছিল করবে। আওয়াজ তুলবে, ‘নোনা পানি চিংড়ির চাষ চলবে না।’ ’গরীব মারার চিংড়ি চাষ চলবে না।’ হ্যাঁ, সে পারবে। করুণাময়ী একজন নারী, সে যদি পারে, তাহলে শিবু পারবে না কেন! তাকে যে পারতেই হবে। শ্লোগান দিতে হবে; জোরে, আরও জোরে। কিন্তু কণ্ঠ দিয়েতো তার স্বর বেরুচ্ছে না। কেন! কেন, এমন হচ্ছে। এইতো সে শ্লোগান দিতে পারছে; এগিয়ে যেতে হবে তাকে। সে এগুনোর চেষ্টা করছে। আচমকাই শরীরে ব্যথা পেয়ে সে কঁকিয়ে ওঠে। শিবু নিজেকে উঠোনে আবিস্কার করে। বুঝতে পারে, সে এতোক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল করুণাময়ীর স্মরণসভায় গিয়ে সে নিজেকেও একজন চিংড়ি চাষ বিরোধী আন্দোলনের কর্মী-সংগঠক ভাবতে শুরু করেছিল। শ্লোগান দিচ্ছিল। আর তাই ভাবতে ভাবতেই বারান্দা থেকে গড়িয়ে একেবারে উঠোনে গিয়ে পড়েছে। শিবু চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। তার কান্নার শব্দ শুনে মা দৌড়ে এসে তাকে তোলার চেষ্টা করেন। সেখানেও বকুনি, ‘তুই কি ঠিকঠাক শুতিও পারিস না। আর কতোদিন পইড়ে উঠোনে গড়াগড়ি দিবি!’ (চলবে)

খুলনা গেজেট/এমএনএস




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

© 2020 khulnagazette all rights reserved

Developed By: Khulna IT, 01711903692

Don`t copy text!