খুলনা, বাংলাদেশ | ১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ | ২৫ মে, ২০২৪

Breaking News

  ঘূর্ণিঝড়ের রূপ নিয়েছে ‘রেমাল’, মোংলা-পায়রা সমুদ্রবন্দরে ৭ এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত
  উপকূলীয় এলাকায় লঞ্চ চলাচল বন্ধের নির্দেশ

মুরগী নিয়ে ঘোড় দৌড়, সিন্ডিকেটে পোল্ট্রি শিল্প

গেজেট ডেস্ক

মুরগির দাম নিয়ে দেশে চলছে তুঘলকি কাণ্ড। সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে ব্রয়লারের দাম। সোনালি, লেয়ার, দেশি মুরগির দামও বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। সাধারণ মানুষের পাত থেকে হারাতে বসছে প্রয়োজনীয় এ আমিষ। ভোক্তা অধিকার বলছে, ব্রয়লারের দাম ২৯০ টাকা কেজি কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। খামারি ও করপোরেট পর্যায়ের খরচ বিবেচনায় সর্বোচ্চ ২০০ টাকা কেজি হতে পারে। পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, কন্ট্রাক্ট ফার্মিং ও করপোরেট কারসাজিতেই মুরগির দামে এ আগুন।

জানা যায়, সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতি আমলে নিয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। এতে বলা হয়, দেড় থেকে দুই মাসের ব্যবধানে ব্রয়লার মুরগির দাম হয়েছে দ্বিগুণ। এ দাম অযৌক্তিক। কারণ, খাবারসহ অন্য ব্যয় বাড়ার পরও এক কেজি ব্রয়লার মুরগির উৎপাদন খরচ করপোরেট প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা। প্রান্তিক খামারি পর্যায়ে খরচ ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা।

এমন পরিস্থিতিতে ভোক্তাদের প্রশ্ন, মুরগির অযৌক্তিক দাম কার্যকর করছে কারা। কারা সমন্বয় করে সারা দেশের মুরগির ব্যবসায়ীদের। কার ইশারায় চলছে বাজার। আর কোথায় যাচ্ছে মানুষের পকেট কেটে লুটে নেওয়া বাড়তি হাজার হাজার কোটি টাকা!

ভোক্তাদের অভিযোগের বিষয়ে কথা হয় বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমন হাওলাদারের সঙ্গে। তিনি বলেন, মুরগির বাজারে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো সিন্ডিকেট করেছে। ব্রয়লার মুরগির এ বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হয় এক অদৃশ্য এসএমএসের মাধ্যমে। করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিদিন মেসেজের মাধ্যমে মুরগি, ডিম, বাচ্চা ও খাবারের দাম নির্ধারণ করে।

‘রাতে সারা দেশ থেকে রাজধানীর বিভিন্ন পাইকারি বাজারে মুরগি আসে। কাপ্তানবাজার, কারওয়ান বাজারের মতো এসব বাজারে করপোরেট কোম্পানির লোক থাকে। যারা বাজারের সরবরাহ ও চাহিদা সম্পর্কে কোম্পানিকে জানায়। এরপর সকালে কোম্পানিগুলো মুরগি ও ডিমের মূল্য নির্ধারণ করে দেশের বিভিন্ন বাজারে এসএমএস পাঠায়। সে সময় তারা তাদের মুরগি (করপোরেট কোম্পানি ও তাদের চুক্তিবদ্ধ খামারের উৎপাদিত মুরগি) লাভজনক করতে বাজারের দর ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করে।’

সুমন হাওলাদার বলেন, এ বাজারে প্রান্তিক খামারি ও করপোরেট কোম্পানির মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়। তাই যখন প্রান্তিক খামারিদের হাতে মুরগি থাকে, তখন করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো দাম কমিয়ে দেয়। এরপর লোকসানে প্রান্তিক খামারিরা মুরগি উৎপাদন কমিয়ে দিলে সরবরাহ তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তখন আমাদের হাতে (প্রান্তিক খামারি) পণ্য থাকে না, তারা দাম বাড়িয়ে দেয়।

করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে এমন দোষারোপ উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। কারণ সবশেষ গত অক্টোবরে যখন মুরগির বাজার অস্থিতিশীল হয়েছিল, তখন এমন প্রমাণ পেয়েছে ভোক্তা অধিকারও। সে সময় তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনে মুরগির বাজারে অস্থিরতার জন্য কাজী ফার্মস গ্রুপ, সাগুনা ফুড অ্যান্ড ফিডস, আলাল পোল্ট্রি অ্যান্ড ফিশ ফিড, নারিশ পোল্ট্রি, প্যারাগন পোল্ট্রির এবং সিপি বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এছাড়া ওই সময় কাজী ফার্মের সাভারের ডিপোতে মেসেজের মাধ্যমে বাজারে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টির প্রমাণ মেলে ভোক্তা অধিদপ্তরের অভিযানে।

ওই মামলার কার্যকর কোনো অগ্রগতি এখনো চোখে পড়েনি। এ বিষয়ে উষ্মা প্রকাশ করে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, আমরা সরকারের বিভিন্ন মহলে বারবার বলছি, বাজার সিন্ডিকেটকারীদের দ্রুত কার্যকর শাস্তির আওতায় আনুন। কিন্তু সেটা কখনো কোথাও দৃশ্যমান হচ্ছে না। যদি অপরাধ করে অপরাধী শাস্তি না পায়, তাহলে তাদের সাহস বেড়ে যায়। এটাই সবক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বাজারেও সেটা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ভোক্তাদের স্বার্থে প্রতিযোগিতা কমিশন দীর্ঘসময় কিছুই করেনি। প্রথমে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। কিন্তু সময়মতো মামলাগুলোর নিষ্পত্তি হচ্ছে না। কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এখনো।

এদিকে মামলা প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের চেয়ারপারসন প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, যে মামলাগুলো হয়েছিল, সেটার কার্যক্রম এখনো চলমান। মামলার কতগুলো গ্যাপ আছে। যেমন মামলা হয়েছে, তাদের কাছ থেকে আমরা প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট চেয়েছি। তারা সাবমিট করেছে। এরপর কমিশন থেকে বলা হয়েছে, এটা সরেজমিনে তদন্ত করা হবে। এ তদন্ত চলমান। প্রায় শেষের পথে।

বাংলাদেশ পোল্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, এখন প্রান্তিক খামারিদের কাছে মুরগি নেই। মুরগির বাজারের দুই-তৃতীয়াংশ সরবরাহ হচ্ছে করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানগুলোর চুক্তিবদ্ধ খামারিদের মাধ্যমে। সংগঠনটি বলছে, দেশের প্রান্তিক খামারিরা মুরগি ও ডিমের দাম না পেয়ে খামার বন্ধ করে দিয়েছে। এক লাখ ৬০ হাজার খামারের মধ্যে চালু আছে ৬০ হাজার। তারপরও সব খামারে মুরগি নেই।

সরাসরি মুরগি উৎপাদনে করপোরেট কোম্পানিগুলোর শেয়ার রয়েছে ২০-২৫ শতাংশ। তবে বাচ্চা, ফিড ও অন্য উপকরণ তাদের শতভাগ দখলে। এসব উপকরণ ব্যবহার করে যখন তারা মাংস ও ডিম উৎপাদনে যাচ্ছে, তখন সাধারণ খামারিরা টিকতে পারছে না। এর মধ্যে আবার করপোরেট কোম্পানিগুলো বন্ধ হওয়া খামারে কম মূল্যে ফিড ও বাচ্চা দিয়ে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং করছে। সেজন্য নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে তাদের হাতে বলে দাবি করছেন খামারিরা।

খামারি সালাম মিয়া বলেন, নিজে মুরগি তুললে ৬৫ থেকে ৮৫ টাকা পর্যন্ত দাম দিয়ে বাচ্চা কিনতে হবে এখন। কন্ট্রাক্টে করলে কম দামে বাচ্চা-খাবার-ওষুধ সব দেবে কোম্পানি। পুঁজি স্বল্পতা ও বড় লোকসানের ভয়ে সবাই বাধ্য হয়ে কন্ট্রাক্ট ফার্মিং করছে।

তিনি জানান, বর্তমানে বাচ্চা ও ফিডের দামও এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ। সে কারণে কেউ মুরগি পালন করতে সাহস পাচ্ছে না। কারণ সব খামারি মুরগি করলে দাম দ্রুত কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। করপোরেটরা সিন্ডিকেট করে।

ব্রয়লারের মাংস বিক্রিতে অনিয়মের তথ্য তুলে ধরেছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামানের সই করা এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরার পাশাপাশি দাম নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে আটটি সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনটিতে ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, মুরগির খাবারসহ অন্য সব ব্যয় বাড়ার পরও এক কেজি ব্রয়লার মুরগির উৎপাদন ব্যয় করপোরেট প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকা।
অন্যদিকে প্রান্তিক খামারি পর্যায়ে খরচ ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা। তাতে বর্তমান উৎপাদন খরচ অনুযায়ী প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির দাম সর্বোচ্চ ২০০ টাকা হতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল্যতালিকা টাঙানো বাধ্যতামূলক থাকলেও তা করা হচ্ছে না, পাইকারি পর্যায়ে পাকা রসিদ বা ক্যাশ মেমো সংরক্ষণ করা হয় না, ক্রেতাকে পাকা রসিদ দেওয়া হয় না, দোকানে অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, ওজনে কম দেওয়া হয় এবং পাইকারি ও খুচরা দামে বিস্তর ব্যবধান।

অধিদপ্তরের সুপারিশে বলা হয়েছে, ব্রয়লার মুরগির যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণে কোনো অনিয়ম কিংবা মনোপলি (একচেটিয়া) হচ্ছে কি না তা খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনকে অনুরোধ করা যেতে পারে। কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী যেন অযৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ করে বাজার অস্থিতিশীল করতে না পারে, সে লক্ষ্যে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। যেসব বাজারে মূল্যতালিকা প্রদর্শন করা হবে না, সেসব বাজার কমিটি বিলুপ্ত করারও সুপারিশ করেছে অধিদপ্তর।

এসব বিষয়ে ভোক্তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, আমরা বারবার এ বাজার নিয়ন্ত্রণে সুপারিশ করেছি। সমস্যাগুলো সরকারের বিভিন্ন মহলে জানিয়েছি। তবে কার্যকর করা বা দাম নির্ধারণ করা আমাদের কাজ নয়। বাজারে প্রচুর অসামঞ্জ্য রয়েছে সেটা সত্য।

তিনি বলেন, একচেটিয়াভাবে মুরগির বাজার কারও দখলে চলে যাচ্ছে কি না, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনকে তা খতিয়ে দেখতে বলেছি। আগেও বলা হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে কার্যকর দর নির্ধারণে বলা হচ্ছে বারবার।

পোল্ট্রি পণ্যের দাম সহনীয় রাখতে ২০১০ সালে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করেছিল। কমিটির একটি কৌশলপত্র তৈরি করার কথা ছিল। ওই সময় কমিটিকে একদিনের বাচ্চার দাম নির্ধারণ এবং বাজার মনিটর করে ডিম-মুরগির দাম নির্ধারণে সরকারকে সহায়তা করার দায়িত্বও দেওয়া হয়। কিন্তু গত এক যুগেরও বেশি সময় এই কমিটি ডিম-মুরগির দাম নির্ধারণ বা নিয়ন্ত্রণে কোনো ভূমিকা রাখেনি।

খুলনা গেজেট/কেডি




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

© 2020 khulnagazette all rights reserved

Developed By: Khulna IT, 01711903692

Don`t copy text!