খুলনা, বাংলাদেশ | ৬ কার্তিক, ১৪২৭ | ২২ অক্টোবর, ২০২০

Breaking News

  স্বাস্থ্যবিধি মেনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপনের আহবান প্রধানমন্ত্রীর
  বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপ ক্রিকেটের ফাইনালে উঠেছে মাহমদুল্লাহ রিয়াদ একাদশ ও নাজমুল হোসেন শান্ত একাদশ
  ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ‘সংকটাপন্ন’, আছেন লাইফ সাপোর্টে
  পাকিস্তানের ভিসা পেতে পদদলিত হয়ে ১৫ আফগান নিহত
  নভেম্বরে খুলছে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষামন্ত্রীর ইঙ্গিত

বৃক্কের যত্ন

ডা. হিমেল ঘোষ

বৃক্ক মানব শরীরের অত্যাবশ্যকীয় গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। আমাদের দেহে বৃক্কের সংখ্যা দু’টি যা দেহে পানি ও বিভিন্ন খনিজ পদার্থের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি নানা রকম দূষিত পদার্থও শরীর থেকে ছেঁকে পৃথক করে ফেলে। তাই আমাদের সুস্থ থাকার জন্যই বৃক্কের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

বৃক্কের সঠিক যত্ন নেওয়ার জন্য দৈনিক ২-৩ লিটার পানি পান করা জরুরি। পর্যাপ্ত পানি পান করলে কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশেই কমে যায় এবং এর স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় থাকে। এছাড়া অতিরিক্ত লবণযুক্ত খাদ্য যেমন ফাস্ট ফুড, অতিরিক্ত ভাজাপোড়া খাবার ইত্যাদি যথাসম্ভব পরিহার করুন, কারণ খাবারে অতিরিক্ত লবণ দেওয়া বা খাবারের সাথে আলাদা করে লবণ খাওয়া বৃক্কের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এটি উচ্চরক্তচাপও বয়ে নিয়ে আসে। পর্যাপ্ত পানি পান এবং খাবারে অতিরিক্ত লবণ পরিহারের পাশাপাশি আপনার ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন। অতিরিক্ত শারীরিক ওজন কিডনির বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি অনেকটাই বাড়িয়ে তুলে।

ধূমপান ও মদ্যপানের কারণে বৃক্কে রক্ত চলাচল ব্যাহত হতে পারে। ফলে বৃক্কের কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়। এজন্য ধূমপান এবং মদ্যপান থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়। এছাড়া ডায়াবেটিস থাকলে তা অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে রাখুন। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিনটি ‘ডি’- ডায়েট, ড্রাগ ও ডিসিপ্লিন মেনে চলুন। নিয়মিত রক্তে শর্করার পরিমাণ নির্ণয়ের জন্য রক্ত পরীক্ষা করাতে পারেন। কোমলপানীয় বা বিভিন্ন রকমের এনার্জি ড্রিংকসও কিডনির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। তাই সুস্থ থাকতে এগুলি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করুন। রক্তচাপ ক্রমাগত ১৪০/৯০ মি.মি.(পারদ) এর বেশি থাকলে কিডনির সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি অনেক বৃদ্ধি পায়। তাই ডায়াবেটিসের পাশাপশি উচ্চ রক্তচাপও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এজন্য নিয়মিত শরীরচর্চার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এছাড়া যেকোনো ওষুধ সেবনে সতর্ক হোন। ব্যথানাশকসহ কম-বেশি অনেক ওষুধই কিডনির জন্য ক্ষতিকর। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতীত কোন ওষুধই গ্রহণ করা একদমই ঠিক নয়।

দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব না করে থাকা প্রাত্যহিক সমস্যাগুলোর একটা। বিশেষত পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেটের অভাবে শহরাঞ্চলের নারীরা এই সমস্যায় বেশি ভোগেন। দীর্ঘক্ষণ মূত্রাশয় পূর্ণ করে রাখা শরীরে নানাবিধ জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। পেশির ওপর চাপ থেকে ডাইভারটিকিউলোসিসের মতো জটিল রোগ হতে পারে। এ ছাড়া দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব না করা থেকে হাইড্রোনেফ্রোসিস বা কিডনিতে প্রস্রাবের চাপ বেড়ে যাওয়ার সমস্যা তৈরি হয়। এসব থেকেই কিডনি কর্মক্ষমতা হারায় এবং ডায়ালাইসিস প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। তাই কিডনির সুস্থতার জন্য দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব আটকে রাখা থেকে বিরত থাকুন।

কোনো কারণে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়লে সেক্ষেত্রে লাল মাংস বেশি খাওয়া ঠিক না। বেশি প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার কিডনির ওপর তখন অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। তবে কিডনির সমস্যা না থাকলে বা চিকিৎসকের নিষেধ না থাকলে এমন প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খেতে তেমন বাঁধা নেই।

রাত জেগে থাকা বা সময়মত ঘুমাতে না পারা আমাদের অনেকেরই নিয়মিত নাগরিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ঘুম শরীরের জন্য নানা কারণে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমের সময়ই শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোর টিস্যু নবায়ন ঘটে। ফলে নিয়মিত অনিদ্রা চলতে থাকলে কিডনিসহ শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোর এই কাজ বাধাগ্রস্ত হয়। এতে কিডনির স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা কমে যায়। তাই নিয়মিত ও পরিমিত ঘুম কিডনির সুস্থতার জন্য অপরিহার্য।

কিডনির জটিলতাজনিত রোগীর সংখ্যা আমাদের দেশে কিন্তু দিন দিনই বাড়ছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ঘনঘন প্রস্রাবে ইনফেকশন, অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ, অনিয়ন্ত্রিত খাওয়া-দাওয়া, অতিরিক্ত ওজন ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে এ ঝুঁকি উত্তরোত্তর আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। সুস্বাস্থ্যের জন্য আবশ্যকীয় বিষয়াবলি মেনে চললেই বৃক্কও ভালো থাকবে আর নিরোগ, সুস্থ ও সমৃদ্ধ জীবনযাপনও সম্ভবপর হবে। কিডনির জটিলতাজনিত রোগীর ক্ষেত্রে দৈনন্দিন খাদ্যতালিকাতেও কিছু পরিবর্তন আনা বাঞ্ছনীয়, যেমন –

ক্যালরি : কিডনি রোগীদের সাধারণত ক্যালরির চাহিদা অন্যান্য রোগীর তুলনায় বাড়ানো হয়। যথাযথ শক্তি প্রদান করার মাধ্যমে রোগীর মাংসপেশির সবলতা বজায় রাখতে ক্যালরি সাহায্য করে। সাধারণত প্রতি কেজি ওজনের জন্য রোগী ভেদে ৩০ থেকে ৩৫ কিলোক্যালরি পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। এই ক্যালরি রোগীকে শক্তি প্রদান করা ছাড়াও সচল এবং কর্মক্ষম রাখে।

শর্করা : কিডনি রোগীর মোট ক্যালোরি চাহিদার বেশিরভাগই শর্করার মাধ্যমে পূরণ হয়। শর্করা কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে বন্ধুবৎসল। খাবারে অন্যান্য পুষ্টি উপাদানের যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ করতে হয় বলে শর্করাকেই বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে শর্করার মাত্রা বিবেচনা করে কার্বোহাইড্রেট হিসাব করা হয়। ভাত, ময়দা, রুটি, চিড়া, সুজি, চালের গুঁড়া, চালের রুটি, সাগু, সেমাই ইত্যাদি কিডনি রোগীর জন্য উত্তম কার্বোহাইড্রেট।

আমিষ : প্রোটিন নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি। দীর্ঘ মেয়াদি কিডনি রোগে প্রতি কেজি ওজনের জন্য দশমিক পাঁচ থেকে দশমিক আট গ্রাম প্রোটিন বরাদ্দ করা যেতে পারে। যদিও এ হিসাব নির্ভর করবে রোগীর অবস্থা ও বিভিন্ন পরীক্ষার রিপোর্টের ওপর। সাধারণত ডাল, বাদাম, কাঁঠালের বিচি, সিমের বিচি ইত্যাদি রোগীকে বর্জন করতে হয়। প্রতিদিনের দৈনিক প্রোটিনের চাহিদা ডিমের সাদা অংশ, মাছ, মুরগির মাংস ও দুধ বা দই ইত্যাদি থেকে হিসাব করে বরাদ্দ করা হয়। গরু, খাসির মাংস, কলিজা, মগজ ইত্যাদি অবশ্যই এড়িয়ে যেতে বলা হয়।

চর্বি : বেশিরভাগ কিডনি রোগীই উচ্চ রক্তচাপের সমস্যায় ভোগেন। কিডনি রোগীদের যাতে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে না যায়- রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে তাই চর্বির হিসাব যথাযথভাবে করতে হয়। সাধারণত স্যাচুরেটেট বা সম্পৃক্ত চর্বি জাতীয় খাবার, ভাজাপোড়া খাবার, ফাস্ট ফুড, ডিমের কুসুম এড়িয়ে যেতে হয়। রান্নার তেল ব্যবহারের ক্ষেত্রে উদ্ভিজ্জ তেল, সূর্যমুখীর তেল বা কর্ন অয়েল ইত্যাদি ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হয়। অনেক কিডনি রোগী ভয়ে তেল খাওয়া বন্ধ করতে দেখা যায়। যা একেবারেই স্বাস্থ্যসম্মত নয়। প্রতিদিনের রান্নায় চার চা চামচ (২০ এমএল) তেল ব্যবহার করলে ভালো।

সবজি : রক্তে পটাশিয়াম, ইউরিক এসিডের মাত্রা, ফসফরাস ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে সবজির পরিমাণ হিসাব করা হয়। অতিরিক্ত পিউরিন ও পটাশিয়াম সমৃদ্ধ শাকসবজি, পিচ্ছিল ও গাঢ় লাল রঙের শাকসবজি এড়িয়ে যেতে হবে। কিডনি রোগীদের জন্য চালকুমড়া, চিচিঙ্গা, ঝিংগা, লাউ, করলা, সজনা, ডাঁটাশাক, লালশাক, কচুশাক, পেঁপে, হেলেঞ্চা শাক ইত্যাদি সবজি উপকারী। উপকারী হলেও এগুলোর পরিমাণ মেনে চলাও কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। কাঁচা সবজির সালাদ, সবজি স্যুপ, ফুলকপি, বাঁধাকপি, পালংশাক, কচু, মুলা, পুঁইশাক, ঢেঁড়স, গাজর, কাঁঠালের বিচি, শিমের বিচি, মুলাশাক ইত্যাদি কিডনি রোগীদের এড়িয়ে চলতে পরামর্শ দেওয়া হয়।

ফল : কিডনি রোগীদের ফল খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হয়। অক্সালিক এসিড, ইউরিক এসিড, পটাশিয়াম, রক্তচাপ ছাড়াও আরও অনেক কিছু বিবেচনা করে ফল নির্ধারণ করা হয়। তিন চারটি ফল রোগী ভেদে সীমিত আকারে দেয়া হয়। যেমন : আপেল, নাশপাতি, পাকা পেঁপে, পেয়ারা ইত্যাদি। অনেকেই কিডনি রোগ হলে ফল খাওয়া বন্ধ করে দেন। যা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। এ ক্ষেত্রে রক্তে পটাশিয়ামের মাত্রা বিবেচনা করে ফল নির্ধারণ করতে হবে। ডাব, কলা, আঙুর একেবারেই খাবেন না, কেননা এতে পটাশিয়ামের পরিমাণ অনেক বেশি।ৎ

লবণ : লবণ বা সোডিয়াম নিয়ন্ত্রিত পথ্য কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে জরুরি। রক্তচাপ, রক্তে সোডিয়ামের মাত্রা, ইডিমা বা শরীরের পানি পরিমাপের ওপর ভিত্তি করে লবণের পরিমাপ করা হয়। সাধারণত দুই থেকে পাঁচ গ্রাম লবণ নির্ধারণ করা হয় যা নির্ভর করবে আপনার শারীরিক অবস্থার ওপর। আলাদা লবণ গ্রহণ পরিহার করতে হবে এবং অতিরিক্ত সোডিয়ামযুক্ত খাবার এড়িয়ে চলতে হবে, যেমন : চিপস, পাপড়, চানাচুর, আচার ইত্যাদি। এই নিয়ম শুধু কিডনি রোগীর চিকিৎসায় নয়, কিডনি রোগ প্রতিরোধেও সাহায্য করে।

তরল বা পানীয় : কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে তরল নিয়ন্ত্রণ জরুরি। দৈনিক চা, দুধ, পানি সব মিলিয়ে তরলের হিসাব করা হয়। কোন রোগীকে কতটুকু তরল বরাদ্দ করা হবে তা নির্ভর করে রোগীর অবস্থার ওপর। শরীরের ইডিমা, হিমোগ্লোবিনের মাত্রা, সোডিয়ামের মাত্রা, ইজিএফআর- এসবের মাত্রার ওপর ভিত্তি করে এক থেকে দেড় লিটার, কখনও কখনও দুই লিটার পর্যন্ত তরল বরাদ্দ হয়। অনেকেই অসুস্থ কিডনিকে সুস্থ করার জন্য অতিরিক্ত পানি খায়, এটি কিন্তু ভুল ধারণা।

দীর্ঘ মেয়াদি ক্রনিক কিডনি রোগী এ ধরনের খাবারের পরামর্শ মেনে চললে কিডনিকে আরো মারাত্মক জটিলতার হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হয়।

 

লেখক : এমবিবিএস(ঢাকা মেডিকেল কলেজ), বিসিএস(স্বাস্থ্য),
মেডিকেল অফিসার, উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র, ডুমুরিয়া, খুলনা।

খুলনা গেজেট / এমএম

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

© 2020 khulnagazette all rights reserved

Developed By: Khulna IT, 01711903692