খুলনা, বাংলাদেশ | ১৭ আষাঢ়, ১৪২৯ | ১ জুলাই, ২০২২

Breaking News

  গত ২৪ ঘণ্টায় সারা বিশ্বে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ১ হাজার ৩৮০ জন ও আক্রান্ত হয়েছেন ৭ লাখ ১৯ হাজার ৪৮০ জন

প্রলয়ঙ্কারি ঘূর্ণিঝড় আইলার রেশ কেটে গেলেও ক্ষতচিহ্ন রয়ে গেছে উপকূলে

রুহুল কুদ্দুস, সাতক্ষীরা

আজ ২৫ মে, প্রলয়ঙ্কারি ঘূর্ণিঝড় আইলা আঘাত হানার দিন। উপকূল দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আইলা আঘাতের ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি অনেকে। সে দিনটির কথাও এখনো ভুলতে পারেনি উপকূলের মানুষ। ঘূর্ণিঝড় আইলা প্রভাবে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে পাউবো’র দূর্বল বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে কপোতাক্ষ নদ ও খোলপেটায়া নীর লোনা পানিতে তলিয়ে যায় বিস্তীর্ণ জনপদ। ধ্বসে পড়ে বহু কাঁচা ঘরবাড়ি, মারা যায় গবাদি পশু, হাসমুরগি, মাছের ঘের ও ফসলি জমি তলিয়ে গিয়ে কোটি কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখিন হয় মানুষ। বহু মানুষ বাড়িঘর হারিয়ে বেড়িবাঁধ ও উচু স্থানে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করতে থাকে। বিধ্বস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো সে কথা মনে করে আজও আতকে উঠেন।

সাতক্ষীরার প্রতাপনগর, আশাশুনি, শ্যামনগর ও খুলনার কয়রার মানুষের কাছে ঝড় ঝাপটা নদী ভাঙন, বিশেষ কিছু নয়। কপোতাক্ষ নদ আর খোলপেটুয়া নদীর সাথে যুদ্ধ করেই বেড়ে উঠছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। তবে আইলার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়লে এখনও শিউরে ওঠেন এলাকার মানুষ। অন্যান্য সময় নদী ভাঙলে হয়তো কোন একটি জায়গা থেকে বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়। কিন্তু ২০০৯ সালের ২৫ মে আইলার প্রভাবে একসাথে ভেঙে যায় প্রতাপনগরের চাকলা, চুইবাড়িয়া, কুড়িকাহুনিয়া, হরিষখালীসহ বেশ কয়েক জায়গা থেকে। প্রায় দেড়বছর প্লাবিত ছিল প্রতাপনগরের সুভদ্রাকাটি, রুইয়ারবিল ও দিঘলার আইটবাসী।

প্রতাপনগর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান শেখ জাকির হোসেন জানান, চতুর্দিকের পানির চাপে লন্ডভন্ড হয় সুভদ্রাকাটি, রুইয়ারবিল, চাকলা, দিঘলার আইট, কুড়িকাহুনিয়া, শ্রীপুর, দরগাতোলার আইট ও প্রতাপনগর গ্রামের কিছু অংশ। এছাড়া প্লাবিত হয়, নাকনা, গকুলনগর, সোনাতনকাটি, ও কল্যাণপুর। পুরো ইউনিয়ন তখন পানিতে একাকার। কয়েক মাসের মধ্যে ইউনিয়ের উত্তর অংশ বসবাসের উপযোগী করা গেলেও অবর্ণনীয় দূর্ভোগ পোহাতে হয় দক্ষিণ দিকের চারটি গ্রামের কয়েক হাজার বাসিন্দাকে। আইলার তান্ডবে ইউনিয়নের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ চাকলা গ্রামের মানুষ। ওই গ্রামের দু একটি পাকা ঘর ছাড়া অস্তিত্ব ছিলনা অধিকাংশ বসত ঘরের। পানির তোড়ে বেড়িবাঁধ ভেঙে সৃষ্টি হয বিশাল খাল। চাকলা থেকে শুরু হয় সেই খাল পৌঁছে যায় রুইয়ারবিল পর্যšন্ত। এদিকে চুইবাড়িয়া থেকে একই রকম খালের উৎপত্তি হয়েছিল।

চাকলা গ্রামের সাবেক ইউপি মেম্বর ভুক্তভোগি গোলাম রসুল জানান, চাকলার খালের পানির প্রভাবে প্রায় দেড়বছর প্লাবিত ছিল সুভদ্রাকাটি, রুইয়ারবিল ও দিঘলার আইট গ্রামবাসী। মাঝে কয়েকবার স্থানীয়রা বাঁধ দেয়ার চেষ্টা করলেও তা সম্ভব হইনি। বাধ্যহয়ে সেনাবাহিনী তলব করে সরকার। তাদের সহযোগিতায় চাকলায় বাঁধ দেয়া সম্ভব হয়।

আইলার ভোগান্তির বর্ণনা দিতে গিয়ে সুভদাকাটি গ্রামের এক নারী জানান, জোয়ারের সময় বাড়ির শিশু ও বৃদ্ধরা রাস্তায় যেয়ে অপেক্ষা করত, আবার ভাটায় পানি নেমে গেলে ঘরে ফিরত তারা। দেড় বছর ধরে ঠিকমত রান্নাবাড়া খাওয়া গোসল ছিল না তাদের। দিনের বেলায় মেয়েরা প্রাকৃতিক কাজ সারতে পারতো না। তাদরেকে সন্ধ্যার জন্য অপেক্ষা করতে হতো। সে সময়ের সেই কষ্টের কথা এখন বলে বোঝানো যাবে না।

কুড়িকাউনিয়া গ্রামের মাষ্টার সফিকুল ইসলাম জানান, খুবই হৃদয়বিদারক ছিল সেই সব দৃশ্য, যখন মরদেহ নিয়ে স্বজনরা ছোটছুটি করতেন দাফন যোগ্য যায়গা খুজতে। কারণ, কবর দেয়ার মত শুকনো মাটিও ছিলনা গ্রামের কোন জায়গায়।
আইলার আঘাতে সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন লোনা পানিতে তলিয়ে যায়। ৭৬ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ পুরোপুরি এবং ৩৬২ কিলোমিটার বাঁধ আংশিকভাবে ধ্বসে পড়ে। ঘূর্ণিঝড়ের কয়েক মাস পর থেকে এলাকাগুলোয় গাছপালা মরতে শুরু করে ও বিরানভূমিতে পরিণত হয়। আক্রান্ত এলাকাগুলোয় পানীয় জলের উৎস সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। তবে
আইলা-পরবর্তী সময়ে উপকূল ভাগের মানুষের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। কারণ ঘূর্ণিঝড় আইলার রেশ কেটে গেলেও তার ক্ষতচিহ্ন রেখে গেছে দক্ষিণাঞ্চলের ব্যাপক এলাকায়। অনেকে এলাকা ছাড়া হয়েছে আবার অনেকের পেশা বদলে গেছে। জীবীকার তাগিতে। পুকুরে মিঠা পানির বদলে নোনা পানি। ফলে উপকলীয় এলাকায় পানীয় জলের সংকট নিত্যদিনের ঘটনা। নোনা জলের আগ্রাসনে জমিতে উৎপাদন কমে যায়। বর্তমানে উপকূল এলাকায় লবণাক্ততা সহিষ্ণু জাতের ধানের বীজ সরবরাহ করছেন কৃষি অফিসে।

এদিকে আইলার ১৩ বছর পরও বিভিন্ন বাঁধের ভাঙন মেরামত না হওয়ায় আতঙ্কে রয়েছে উপকূলবাসী। সামান্য ঝড়ে বাঁধ ভেঙে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে উপকূলের মানুষ। কোনো কোনো গ্রাম ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে কপোতাক্ষ নদ আর খোলপেটুয়া নদীর পানিতে। লোনা পানির আগ্রাসনে খাবার পানি দুষ্প্রাপ্য হয়ে পড়েছে অনেক এলাকায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত উপকুলের মানুষের একটাই দাবি টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা।

প্রসঙ্গতঃ বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় আইলার সৃষ্টি হয় ২০০৯ সালের ২১ মে। উপকূলে আঘাত হানে ২৫ মে। এর ব্যাপ্তি ছিল প্রায় ৩০০ কিলোমিটার এলাকায়। যা ঘূর্ণিঝড় সিডরের থেকে ৫০ কিলোমিটার বেশি। তবে পরে বাতাসের বেগ কমে ৮০-১০০ কিলোমিটার হয়ে যাওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি, সিডরের তুলনায় কম হয়। সাতক্ষীরাসহ উপকূলের বেশ কয়েকটি জেলায় মারা যায় প্রায় সাড়ে তিনশ’ মানুষ। সবচেয়ে বেশী ক্ষতির শিকার সাতক্ষীরার আশাশুনি, শ্যামনগর এবং খুলনার কয়রা ও দাকোপ উপজেলার মানুষ। এর মধ্যে বেশী খারাপ ছিল আশাশুনির প্রতাপনগর, ও শ্যামনগরের গাবুরা, পদ্মপুকুর এবং খুলনার ৩/৪/৫ নম্বর কয়রা এবং বেদকাশী। এসব এলাকার মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সময় লাগে অন্তত ৩ বছর। লোকালয় আর নদীর পানি মিলেমিশে একাকার ছিল অন্তত দুই বছর।

খুলনা গেজেট/ টি আই




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।

© 2020 khulnagazette all rights reserved

Developed By: Khulna IT, 01711903692