জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পরেও দেশে রাজনৈতিক বিভাজন ও মতভেদ বিদ্যমান। একটি স্বাধীন দেশে জাতীয় ঐক্য সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তার অভাব রয়েছে। তিনি বলেন, “জনগণের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষাই একটি রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি, যা সংবিধানেও স্বীকৃত। কিন্তু যখন এই আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করা হয়, তখনই সৃষ্টি হয় অসন্তোষ ও আন্দোলন।” সমাধানের পথ হিসেবে তিনি সংলাপের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, সংঘাত নয়, বরং সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে এবং সংসদকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে হবে। তিনি স্বাধীনতা দিবসের অঙ্গীকার হিসেবে এমন একটি রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান জানান।
তিনি বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) বিকেলে মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে নগরীর আল ফারুক সোসাইটি মিলনায়তনে খুলনা মহানগরী জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও মহানগরী আমীর অধ্যাপক মাহফুজুর রহমানের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এমপি। মহানগরী জামায়াতের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল এমপির পরিচালনায় সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন ও উপস্থিত ছিলেন মহানগরী জামায়াতের নায়েবে আমীর অধ্যাপক নজিবুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট শাহ আলম, প্রিন্সিপাল শেখ জাহাঙ্গীর আলম ও আজিজুল ইসলাম ফারাজী, অফিস সেক্রেটারি মিম মিরাজ হোসাইন, মহানগরী কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আ ন ম আব্দুল কুদ্দুস, ইঞ্জিনিয়ার মোল্লা আলমগীর হোসেন, অধ্যাপক আবু রুবাবা, অধ্যাপক ইকবাল হোসেন, অধ্যাপক জুলফিকার আলী, আ স ম মামুন শাহীন, খুলনা সদর থানা আমীর এস এম হাফিজুর রহমান, সোনাডাঙ্গা থানা আমীর জি এম শহিদুল ইসলাম, খালিশপুর থানা আমীর আব্দুল্লাহ আল মামুন, দৌলতপুর থানা আমীর মোশাররফ আনসারী, আড়ংঘাটা থানা আমীর মুনাওয়ার আনসারী, ব্যবসায়ী সিদ্দিকুর রহমান, আব্দুস সালাম, জাহিদুর রহমান নাঈম, আব্দুল আওয়াল প্রমুখ।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেলেও দেশের মানুষ এখনো প্রকৃত স্বাধীনতার লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। তিনি বলেন, “আজকের এই মহান স্বাধীনতা দিবসে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি আমাদের বীর শহীদদের, যাদের আত্মত্যাগের মাধ্যমে আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন দেশ—বাংলাদেশ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার এত বছর পরও ঘোষিত লক্ষ্য—সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার বাস্তবায়িত হয়নি।”
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশে এখনও বৈষম্য প্রকট। একদিকে কিছু মানুষ বিপুল সম্পদের মালিক, অন্যদিকে অনেক মানুষ ন্যূনতম প্রয়োজন থেকেও বঞ্চিত। অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এই বৈষম্য স্বাধীনতার চেতনার পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিচারব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। “ক্ষমতাসীনদের জন্য এক ধরনের বিচার, আর সাধারণ মানুষের জন্য আরেক ধরনের বাস্তবতা—এটি কোনোভাবেই একটি স্বাধীন দেশের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না,” যোগ করেন তিনি।
বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার প্রসঙ্গ টেনে জামায়াতের এই নেতা বলেন, আধিপত্যবাদের ধরন বদলেছে। এখন সরাসরি দখল নয়, বরং অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “একটি দেশ বাহ্যিকভাবে স্বাধীন থাকলেও, যদি তার সিদ্ধান্ত গ্রহণে অন্য শক্তির প্রভাব থাকে, তবে সেই স্বাধীনতা পূর্ণাঙ্গ নয়।”
তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার পরও কেন নতুন করে স্বাধীনতার কথা বলতে হয়—এর কারণ হলো এখনো সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানা মতপার্থক্য থাকলেও এটি একটি সর্বজনীন সত্য যে, স্বাধীনতা কোনো একক ব্যক্তি বা দলের অর্জন নয়। “রাজনীতিবিদ, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত আত্মত্যাগের ফলেই আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি,” বলেন তিনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “আমরা আর রক্তপাত বা সংঘাত চাই না। আমরা চাই একটি মানবিক, বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারে।”

