আজকাল গর্ভধারণে দেরি করাটা বেশ সাধারণ একটি বিষয়। পড়াশোনা, কর্মজীবন এবং কুড়ির কোঠায় মাতৃত্বের জন্য প্রস্তুত না থাকা ইত্যাদি গর্ভধারণে দেরির প্রধান কারণ। এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়, কিন্তু এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নারীদের একটি বিষয় সম্পর্কে সচেতন থাকা উচিত। সেটি হলো, লো ওভারিয়ান রিজার্ভ।
লো ওভারিয়ান রিজার্ভ কী?
এই অবস্থাটি নিয়ে তেমন একটা কথা বলা হয় না, তবুও বিশেষজ্ঞরা বলেন যে এটি ভবিষ্যতের পরিবার পরিকল্পনার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, লো ওভারিয়ান রিজার্ভ মানে হলো বয়সের তুলনায় ডিম্বাশয়ে প্রত্যাশার চেয়ে কম ডিম্বাণু থাকা। এর মানে এই নয় যে আপনি গর্ভবতী হতে পারবেন না, তবে সম্ভাবনা কম হতে পারে।
প্রতিটি নারী একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক ডিম্বাণু নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন। শরীরের অন্যান্য অনেক কোষের মতো ডিম্বাণু পুনরায় তৈরি করা যায় না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাণুর সংখ্যা এবং গুণমান উভয়ই স্বাভাবিকভাবে হ্রাস পায়। কিছু নারীর ক্ষেত্রে এই হ্রাস প্রত্যাশার চেয়ে আগে ঘটতে পারে।
সতর্কীকরণ চিহ্ন এবং রোগ নির্ণয়
শুরুতে অনেক নারীর কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। অনিয়মিত মাসিক এবং গর্ভধারণে সমস্যা ডিম্বাশয়ের ডিম্বাণুর সংখ্যা কম থাকার লক্ষণ হতে পারে। ডাক্তাররা সাধারণত রক্ত পরীক্ষা এবং আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যানের মাধ্যমে ডিম্বাশয়ের রিজার্ভ মূল্যায়ন করেন।
সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পরীক্ষাগুলোর মধ্যে একটি হলো অ্যান্টি-মুলারিয়ান হরমোন (AMH) পরিমাপ করা। এই হরমোনটি অবশিষ্ট ডিম্বাণুর পরিমাণ অনুমান করতে সাহায্য করে। ডিম্বাশয়ের ছোট ফলিকল গণনা করার জন্যও আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যান ব্যবহার করা হয়।
ডিম্বাশয়ের রিজার্ভ কমে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণসমূহ
বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়সই সবচেয়ে বড় কারণ। ৩০ বছর বয়সের পর থেকে ফার্টিলিটি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে এবং ত্রিশের দশকের মাঝামাঝি থেকে শেষের দিকে এটি আরও দ্রুত হ্রাস পায়। এছাড়াও, জিনগত কারণ, অস্ত্রোপচার, অসুস্থতা এবং কিছু চিকিৎসাও রিজার্ভ কমিয়ে দিতে পারে। এন্ডোমেট্রিওসিস, ডিম্বাশয়ের অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি এবং কিছু অটোইমিউন ডিসঅর্ডারের মতো শারীরিক সমস্যা ডিম্বাণুর রিজার্ভকে প্রভাবিত করতে পারে।
জার্নাল অফ হিউম্যান রিপ্রোডাক্টিভ সায়েন্সেস-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায়, ফার্টিলিটির চিকিৎসা নিতে আসা ৫৪,০০০-এরও বেশি নারীর ওপর সমীক্ষা চালিয়ে একটি আশ্চর্যজনক ফলাফল পাওয়া গেছে। ৩০ বছরের কম বয়সী প্রায় ২৯% নারীর শরীরেই প্রত্যাশার চেয়ে কম AMH মাত্রা ছিল। ত্রিশের কোঠায় থাকা নারীদের মধ্যে এই হার আরও বেড়েছে। কিছু নারীর ক্ষেত্রে ডিম্বাশয়ের বার্ধক্য আগের ধারণার চেয়েও আগে শুরু হতে পারে। গবেষণাটি পাবমেড সেন্ট্রালের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।
ডিম্বাশয়ের রিজার্ভ কম থাকলে কী হয়?
ডিম্বাশয়ের রিজার্ভ কম থাকার মানে এই নয় যে গর্ভধারণ করা অসম্ভব। অনেক নারীই স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণ করেন। অন্যদের ফার্টিলিটির চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। মূল বিষয় হলো পরিস্থিতি সম্পর্কে জানা এবং সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা করা। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় হলে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়।
খাদ্যাভ্যাস এবং ডিম্বাণুর সংখ্যার মধ্যে সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। তবে সুষম খাদ্য, ধূমপান না করা এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার মতো স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অভ্যাস বজায় রাখা জরুরি। এই বিষয়ের মানসিক দিকটিও উপেক্ষা করা উচিত নয়। ডিম্বাশয়ের রিজার্ভ কম থাকাটা মানসিক চাপের কারণ হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে মানসিক সহায়তা এবং কাউন্সেলিং জরুরি। এক্ষেত্রে সচেতনতাই সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।
খুলনা গেজেট/রুএ

