‘ভাবতেও পারিনি মরণের আগে ঘরের মালিক হব’

একরামুল হোসেন লিপু, দিঘলিয়া

শুকুরন বেগম বয়স ৭০ এর কাছাকাছি। ২০ বছর পূর্বে একমাত্র কন্যা হালিমা বেগমের বয়স যখন ২ বছর তখন তাঁর স্বামী আঃ গফুর মারা যান। সেই থেকে শুকুরন বেগমের টিকে থাকার লড়াইয়ের সংগ্রাম শুরু। পরের বসতভিটায় কেটেছে একমাত্র কন্যাকে নিয়ে তার জীবন। মেয়ে হালিমাকে বিয়ে দিয়েছিলেন। হালিমার স্বামীও মারা যান কয়েক বছর আগে। দুই স্বামীহারা অসহায় মহিলার সর্বশেষ মাথা গোঁজার ঠাই হয় বোনের ছেলের বাড়ি গাজীরহাট ইউনিয়নের কেটলা। সহায় সম্বলহীন শুকুরন বেগম মুজিব বর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক ভূমিহীন গৃহহীন পরিবারকে জমি ও গৃহ প্রদান আশ্রয়ন -২ প্রকল্প এর ২য় পর্যায়ের বিনামূল্যে ঘরের চাবি এবং জমির দলিল পেয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিত এবং আনন্দিত।

আবেগে আপ্লুত হয়ে শুকুরন বেগম এ প্রতিবেদকের কাছে তার অনুভূতির কথা ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেন, ‘জীবনে কোনদিন ভাবতেও পারিনি মরণের আগে জমি এবং ঘরের মালিক হব।’

শুধু শুকুরন বেগম নয়, বিনামূল্যে ঘর এবং জমির দলিল পেয়ে উচ্ছ্বসিত তার একমাত্র কন্যা হালিমা বেগম। এখন থেকে মা মেয়ে পুনর্বাসিত হবেন দিঘলিয়া উপজেলার গাজীরহাট মৌজার কেটলা আশ্রয়ন প্রকল্পে। শুকুরন বেগমের মতো নিঃস্ব, অসহায়, সম্বলহীন ১০ জন নারী পুরুষ পুনর্বাসিত হবেন এই আশ্রয়ন প্রকল্পে।উপজেলা প্রশাসন ৩০ শতক জায়গার উপর নির্মাণ করেছে এ আশ্রয়ন কেন্দ্র।

গোলাম মুন্সী। বয়স ৯০ এর কাছাকছি। বাড়ি দিঘলিয়া উপজেলার বারাকপুর গ্রামে। ২ মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। দিন মজুর ২ ছেলে বিয়ে করে তাদের মতো করে থাকেন। অসহায়, সম্বলহীন, অসুস্থ গোলাম মুন্সী স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন পাশ্ববর্তী মানিক চৌকিদারের বাড়িতে। শ্রবণ শক্তিও হারিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর উপহার বিনা মূল্যে ঘরের চাবি এবং জমি দলিল পেয়ে দারণ উৎফুল্ল ৯০ বছর বয়সী গোলাম মুন্সী। সেই সংগে উৎফুল্ল তাঁর স্ত্রী। গোলাম মুন্সী পুনর্বাসিত হবেন বারাকপুর মৌজার বোয়ালিয়ার চর আশ্রয়ন প্রকল্পে। দিঘলিয়া উপজেলা প্রশাসন ৩০ শতক সরকারি খাস জমিতে নির্মাণ করেছেন বোয়ালিয়ার চর আশ্রয়ন প্রকল্প। এই প্রকল্পে বৃদ্ধা গোলাম মুন্সীর মতো ১০ জন নারী পুরুষ পুনর্বাসিত হবেন।

আনোয়ারা বেগম, বয়স ৫৬ বছর। শ্বশুর বাড়ি নড়াইল জেলার কালিয়া বড়দিয়া। ২৭ বছর আগে স্বামী বাচ্চু শেখ মারা যান। স্বামী মারা যাওয়ার সময় তাঁর গর্ভে ছিলো ৩ মাস বয়সী ছোট ছেলে। আনোয়ারা বেগম ৪ সন্তানের জননী। স্বামী মারা যাওয়ার পর তাঁর কষ্টের জীবন শুরু হয়। স্বামীর রেখে যাওয়া একমাত্র বসতভিটা মধুমতী নদীর ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে যায়। নিঃস্ব, অসহায়, সম্বলহীন আনোয়ারা বেগম ৪ সন্তানকে নিয়ে চলে আসেন বাপের বাড়ি দিঘলিয়া উপজেলার দেড়ায়া গ্রামে। পরের বাড়িতে থেকে কোন রকমে তাঁর সংসার চলতো।প্রধানমন্ত্রীর উপহার বিনামূল্য ঘর এবং জমি পেয়ে আনোয়ারা বেগম খুবই খুশী হয়েছেন। আনোয়ারা বেগম পুনর্বাসিত হবেন দিঘলিয়া মৌজার সরদার ঘাট ভৈরব নদীর তীর সংলগ্ন “ভৈরব নগর-২” আশ্রয়ন প্রকল্পে। উপজেলা প্রশাসন ২০ শতক সরকারী খাস জমিতে নির্মাণ করেছেন এ আশ্রয়ন প্রকল্প। আনোয়ারা বেগমের মতো ১০ জন নারী পুরুষ পুনর্বাসিত হবেন এ আশ্রয়ন প্রকল্পে।

দিঘলিয়া উপজেলা প্রশাসন মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য বিনামূল্যে জমি ও গৃহপ্রদান প্রকল্পের ২ পর্যায়ে দিঘলিয়া, বারাকপুর এবং গাজীরহাট ইউনিয়নের পৃথক ৩ টি স্থানে এ সব আশ্রয়ন প্রকল্প নির্মাণ করেছে। এ সব আশ্রয়ণ কেন্দ্রে ২য় পর্যায়ের ৩০ জন নারী পুরুষ পাকা ঘর পাবেন। ১ম পর্যায়ে উপজেলার ২ টি আশ্রয়ণ কেন্দ্র ভৈরব নগর এবং আতাই নগরে ৭০ জন নারী পুরুষকে পুনর্বাসিত করেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রবিবার (২০ জুন) ভিডিও কনফারেন্স এর মাধ্যমে সারা দেশে ৫৩ লক্ষ ৩’শ ৪০ জন ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের মাঝ ঘরের চাবি ও জমির দলিল হস্তান্তর অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন।

সকাল সাড়ে ১০ টায় দিঘলিয়া উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে অত্র উপজেলার ৩০ জন সুবিধাভোগীদের মাঝে ঘরের চাবি ও দলিল হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথী হিসাবে উপস্থিত ছিলেন খুলনা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ হেলাল হোসেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মাহাবুবুল আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জমির চাবি ও দলিল হস্তান্তর অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন খুলনা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহাবুব হাসান, অতিঃ পুলিশ সুপার খুলনা ‘ক’ সার্কেল রাজু আহন্মেদ, দিঘলিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান শেখ মারুফুল ইসলাম, উপজেলা আঃলীগের সভাপতি ও প্রাক্তন উপজেলা চেয়ারম্যান খান নজরুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক মোল্যা আকরাম হেসেন, উপজেলা সহকারী কমিনশার (ভূমি) মোঃ আলীমুজ্জামান মিলন, উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মোঃ আলী রেজা বাচা, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মমতাজ শিরীন ময়না, দিঘলিয়া থানা অফিসার ইনচার্জ মোঃ আহসানউল্লাহ চৌধুরী প্রমুখ।

খুলনা গেজেট/ এস আই

 




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন