মারামারি মামলায় আসামি হয়ে দক্ষিণ কোরিয়া চলে গেছেন খুলনার দিঘলিয়া উপজেলার ফিরোজ আলম শাওন। মামলার বিচার কার্যক্রমকে ব্যাহত করতে অন্য ব্যক্তিকে শাওন সাজিয়ে গত ১৫ মার্চ আদালতে জামিন নেন তিনি। চার মাস যেতে না যেতেই জামিন জালিয়াতির বিষয়টি প্রকাশ হয়ে পড়ে। এ ঘটনায় আসামি ফিরোজ আলম শাওন ও তার আইনজীবী শাহজাহান আলীর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন খুলনার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৪ এর বিচারক ফাতেমা জান্নাত।
শনিবার (৩ অক্টোবর) রাতে ওই মামলায় ফিরোজ আলম শাওনের ভাই ফেরদৌস আলম সেতুকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রোববার তাকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। মূলত সেতুকে গ্রেপ্তারের পরেই জামিন জালিয়াতির ঘটনা প্রকাশ্যে আসে। এর আগে গত ৬ আগস্ট এ ঘটনায় খুলনা সদর থানায় মামলা হয়েছিল।
ভুক্তভোগী, পুলিশ ও মামলার এজাহার থেকে জানা গেছে, জমি-জমা নিয়ে বিরোধের জের ধরে ২০২৫ সালের ১৫ মার্চ রাতে দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি বরইতলা ঘাট এলাকার তরিকুল আমিনকে মারপিট করে তার প্রতিবেশী ফিরোজ আলম শাওন ও স্বজনরা। এ ঘটনায় তরিকুল আমিন বাদি হয়ে শাওনসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য দিঘলিয়া থানাকে নির্দেশ দেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও দিঘলিয়া থানার এস আই জামিল হোসেন গতবছর ২৩ সেপ্টেম্বর শুধু ফিরোজ আলম শাওনকে অভিযুক্ত করে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। খুলনার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত দিঘলিয়ায় মামলার স্বাক্ষ্য গ্রহণ চলছে।
তরিকুল আমিনের আইনজীবী আজমল হোসেন জানান, আদালত চার্জ গঠনের দিন ধার্য করলে আমরা জানতে পারি চলতি বছরের ১৬ মার্চ আসামি জামিন নিয়েছেন। তখন বাদি জানায়, আসামি তো দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ কোরিয়ায় রয়েছেন। এর মধ্যে তিনি দেশে আসেনি। বিষয়টি আদালতে জানালো হলে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৪ এর বিচারক ফাতেমা জান্নাত বিষয়টি তদন্ত করে জামিন জালিয়াতির প্রমাণ পান।
গত ২২ জুলাই খুলনার মুখ্য মহানগর হাকিমের কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে ফাতেমা জান্নাত উল্লেখ করেন, ‘আমার আদালতে সিআর ৬৩/২০২৫ (দিঘলিয়া) মামলার আসামি ফিরোজ আলম শাওন গত ১৬ মার্চ অ্যাডভোকেট শাহজাহান আলীর ওকালতনামা দিয়ে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণপূর্বক জামিনের আবেদন করেন। অপরাধ জামিনযোগ্য হওয়ায় আসামি ফিরোজ আলম শাওনকে ১০০ টাকা বন্ডে জামিন মঞ্জুর করা হয়। গত ২৩ এপ্রিল বাদি তরিকুল আমিন আবেদন করেন যে আসামি প্রবাসে থেকে ভুয়া ব্যক্তি সাজিয়ে জামিন নিয়েছেন। পরবর্তী ২৭ এপ্রিল আসামির কৌশুলী সরদার শাহজাহান আলী ভিন্ন লোককে আসামি সাজিয়া জামিন নেওয়ায় ওকালাতনামা প্রত্যাহার করতে চান।’
প্রতিবেদনে ম্যাজিস্ট্রেট উল্লেখ করেন, ‘আসামি ফিরোজ আলম শাওন দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থানকালে ভুল ব্যক্তিকে প্রদর্শন করে জামিন গ্রহণ করেছে। আদালতে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে জামিণ গ্রহণের অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি, আইনজীবী, আদালতের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত আছে বলে আদালতের নিকট প্রতীয়মান হয়।’ তিনি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত আইনজীবী সরদার শাহজাহান আলী, আসামি ফিরোজ আলম শাওন ও অন্য কোনো ব্যক্তি জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমতি চান।
গত ২ আগস্ট আদালত অভিযোগটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করতে খুলনা সদর থানার ওসিকে নির্দেশ দেন। গত ৬ আগস্ট ফিরোজ আলম শাওনকে প্রধান এবং আইনজীবী শাহজাহান আলীকে দ্বিতীয় আসামি করে সদর থানায় মামলা রেকর্ড করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সদর থানার এস আই মেহেদী হাসান খান জানান, মামলার মূল আসামি শাওন দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ কোরিয়ায় বসবাস করেন। গতবছর দেশে এসে মারপিটের ঘটনায় জড়ান। মামলা হওয়ার পর তিনি আবার দক্ষিণ কোরিয়ায় চলে যান। মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করতে ভুয়া ব্যক্তিকে প্রদর্শন করে জামিন নেওয়া হয়। এ ঘটনার তার ভাই ফেরদৌস আলম সেতুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য আসামিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
খুলনা গেজেট/উউরা

