সড়ক দুর্ঘটনার পর সময় পেরিয়েছে প্রায় ৯মাস। ৭টি হাসপাতালে টানা চিকিৎসা। অপারেশন হয়েছে ২বার। তারপরও সুস্থ জীবনে ফিরতে পারেননি খুলনা মহানগরীর লবণচরা এলাকার মৃত মজিবুর হকের ছেলে ম্যাকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ওবাইদুল হক। ইতোমধ্যে তার একটি চোখ একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে। আরও একটি চোখে কম দেখেন। চিকিৎসকদের পরামর্শ মোতাবেক শরীরে আরও তিনটি অপারেশন প্রয়োজন। ইতোমধ্যে প্রায় সাড়ে ৫লাখ টাকা ব্যয়ের পর নতুন করে চিকিৎসার খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি। অসুস্থ ওবায়দুল হকের পক্ষ থেকে পরিবারের সদস্যরা এ ঘটনায় থানায় মামলা করতে গেলে লবণচরা থানা পুলিশ জিডি গ্রহণ করে তাদের দায় এড়িয়েছে বলে তার অভিযোগ।
ওবায়দুল হক জানান, চলতি বছরের ২ জানুয়ারি বাগেরহাট জেলার মোল্লাহাটের মাদ্রাসা ঘাট থেকে রাজিব পরিবহনের একটি বাসে (ঢাকা মেট্রো-ব- ১৫-৯৭৩১) তিনি খুলনার লবনচরার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। কিন্তু বাসের চালক স্বাভাবিকের চেয়ে খুবই দ্রুত গতিতে চালানোর পাশাপাশি কিছুক্ষণ পর পর হার্ডব্রেক করতে থাকে। তাকে নিষেধ করলেও তোয়াক্কা করে না। এভাবে বাসটি চালিয়ে খানজাহান আলী (রহঃ) সেতুর ওপর উঠে লবণচরা স্টপেজের যাত্রীদের গেটের কাছে আসার জন্য সুপারভাইজার ডাকতে থাকে। ওবাইদুল হক গেটের কাছে আসলেই বাসের চালক পূর্বের ন্যায় আবারও হার্ডব্রেক করে। এতে ওবাইদুল হক নিজেকে সামলাতে না পেরে বাসের সিড়ির অ্যাঙ্গেলের সাথে মাথায় মারাত্মকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন। আঘাতের কারণে কপাল, নাক, দুই চোখের পিছন ও সাইডের হাড় এবং মুখের হাড় ভেঙে যায়।
গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে গাজী মেডিকেল, তারপর খুলনা মেডিকেল কলেজ হসপিটাল, এরপর খুলনা সিটি মেডিকেল, তারপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হসপিটাল, ঢাকা ডেন্টাল মেডিকেল কলেজ হসপিটাল, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হসপিটাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্স হসপিটালে চিকিৎসা করানো হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিউরো সার্জারি ও ম্যাগজুলা অপারেশন করা হয়। ইতোমধ্যে তার ডান চোখ একেবারেই নষ্ট হয়ে গেছে। বাম চোখেও কম দেখছেন বলে তিনি জানান। সুস্থ হতে তার আরও তিনটি অপারেশন দরকার বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছে।
ওবাইদুল হক বলেন, ব্র্যান্ড ফ্লুইড পড়া বন্ধ করার জন্য, কপালের যে হাড় কেটে ফেলা হয়েছে সেটা আবার আর্টিফিশিয়ালি লাগানো এবং কোনো গন্ধ না পাওয়ার জন্য অপারেশন করতে হবে। এসব চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন। যা খরচ করার মতো সামর্থ্য তার নেই।
তিনি বলেন, ম্যাক্সিলা অপারেশনের পর ব্রেন ফ্লুইড অনবরত ঝরে পড়ছিল। এটার জন্য ঢাকা মেডিকেল ও নিউরোসায়েন্স হসপিটালে অপারেশন করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু আর্থিক সমস্যার কারণে করতে পারিনি।
ওবাইদুল হক আক্ষেপ করে বলেন, এত কষ্ট পাওয়ার পরে লবণচরা থানার পক্ষ থেকে আমাদের তেমন কোনো আইনি সহায়তা করেনি। শুধুমাত্র একটি জিডি নিয়েছে। আমরা নিজ উদ্যোগে বাসের নম্বর সংগ্রহ করে তাদেরকে দেওয়া হলেও মামলা নিতে গড়িমসি করে। এক পর্যায়ে বাস মালিক আমার ভাইকে ১০ হাজার টাকা দিবে বলেছিল, কিন্তু আমরা তাতে রাজি হইনি। আমরা মামলার পক্ষে ছিলাম।
তিনি বলেন, “আমার মাথা ও মুখের হাড় শুধু ভাঙেনি— আমার ভবিষ্যতও ভেঙে গেছে। হাড় জোড়া লাগানো যায়, কিন্তু একটি মানুষের আগের জীবন কি জোড়া লাগানো যায়? আমার ডান চোখের দৃষ্টি ফিরিয়ে দেওয়া কি সম্ভব? যারা আমার জীবনকে এই অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি।”
খুলনা গেজেট/এনএম

