ডেঙ্গুতে একের পর এক জীবন প্রদীপ নিভে যাচ্ছে। বিশেষ করে খুলনা এখন অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। খোদ প্রধানমন্ত্রী ডেঙ্গু দমনে সকলকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর নির্দেশিত পথে সকল দপ্তর সোচ্চার ডেঙ্গু মোকাবেলায়। তবে খোদ খুলনা স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ডা. শেখ মোঃ মোশাররফ হোসেনের এদিকে তেমন নজর নেই। তিনি ব্যস্ত বদলি বাণিজ্য নিয়ে! যোগদান করেছেন গেল ১৯ মে। প্রায় ৪ মাসে তিনি বিভাগের ১০ জেলার বিভিন্ন স্বাস্থ্য বিভাগের ৩ শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করেছেন। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র এবং সরেজমিন গিয়ে প্রাপ্ত তথ্য অনুসন্ধানে এ চিত্র উঠে এসেছে।
যোগদানের পরের দিনই ২০ মে ক্যাশিয়ার স ম আনোয়ার হোসেনকে ডুমুরিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে নিজ দপ্তরে এবং উচ্চমান সহকারী মোঃ মাসুম বিল্লাহকে এ দপ্তর থেকে ডুমুরিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলি আদেশের মধ্য দিয়ে তার বাণিজ্য শুরু। অসংখ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীকে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় বদলি করেছেন। সেসব স্থলে নিজের ইচ্ছামতো পছন্দের ব্যক্তিদের পদায়ন করছেন। বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ বাণিজ্য করছেন, এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
মোঃ কামরুজ্জামান সরদার ও মোঃ মনিরুজ্জামান সরদার সহোদর। তারা দু’জনই উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার হিসেবে বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলার দুই ইউনিয়নের উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে কর্মরত ছিলেন। ২২ জুলাই ১১৫২(৮) নম্বর স্মারকের আদেশে মোঃ কামরুজ্জামান সরদারকে কয়রার মহারাজপুর ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে এবং ৬ আগস্ট ১২৫৪(৮) নম্বর স্মরকে অপর ভাই মোঃ মনিরুজ্জামান সরদারকে কয়রা বেদকাশী ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে বদলির আদেশ দেন।
মজার ব্যাপার মাত্র ৮ দিনের মাথায় অর্থাৎ ১৬ আগস্ট ১৩১৬(৮) আদেশে আগের আদেশ বাতিল করায় মনিরুজ্জামান পূর্বের স্থলে যাওয়ার আদেশ পান। অজানা কারণে অপর ভাই এখনও কয়রায় রয়ে গেছেন। জুন মাসের ১৭ তারিখে ৯১৫(৯) নম্বর স্মারকে যশোর চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গাড়ি চালক মোঃ আলমগীরকে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে এবং ওই জায়গার ড্রাইভার মোঃ সাখাওয়াৎ হোসেনকে চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলির আদেশ দেন।
৫ দিনের মাথায় ২১ জুন আগের আদেশ ৯৬১(৮) নম্বর স্মারকে বাতিলের আদেশ দেন। ৬ আগস্ট ১২৫২(১২) নম্বর স্মারকে খুলনা জেনারেল হাসপাতালের গাড়ি চালক মোঃ জাহাঙ্গীর আলমকে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর, শ্যামনগরের গাড়ি চালক মোঃ আইয়ুর হোসেনকে খুলনা জেনারেল হাসপাতালে এবং যশোর জেলার বাঘারপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গাড়ি চালককে খুলনা জেনারেল হাসাপাতালে বদলির আদেশ দেন। কিন্তু মাত্র ৬ দিনের মাথায় ১২ আগস্ট ১৩০২(৯) স্মারকে জাহাঙ্গীর আলম ও আইয়ুব হোসেনের আদেশ বাতিল করা হয়। কিন্তু মন্টুর আদেশ অদৃশ্য কারণে বহাল থাকে।
গত ২ সেপ্টেম্বর ১৪১৯(৮) নম্বর আদেশে মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান সহকারী মীর হাবিবুরকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে এবং কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের হিসাব রক্ষক মোঃ এনামুল হককে গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মীর হাবিবুরের স্থলে বদলির আদেশ দেন। মজার ব্যাপার মাত্র ৬ দিনের মধ্যে ৮ সেপ্টেম্বর সংশোধনী আদেশ শিরোনামে ১৪৬১(৮) স্মারকে এনামুলকে পূর্বের স্থলে স্বীয় পদে বহালের আদেশ দিলেও মীর হাবিবুরের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে অফিস সহায়ককে করেছেন গাড়ি চালক।
সূত্র আরও জানায়, বাগেরহাট জেনারেল হাসপাতালের অফিস সহায়ক মোঃ হালিম মোল্লাকে ১/২০২৬ নম্বর স্মারকে ১৬ জুন গাড়ি চালক পদে দায়িত্ব পালনের আদেশ দিয়েছেন। মাত্র ৬ দিন ছিল চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার খুলনা স্বাস্থ্য পরিচালক দপ্তরের প্রশাসনিক কর্মকর্তা এম এম জাহাতাপ হোসেনের। যোগদান করেই ২০ মে ৭৯৬(৫) নম্বর আদেশে তাকে প্রেষণে খুলনা জেনারেল হাসপাতালে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেন। পরিচালকের দপ্তরে কর্মরত স্ট্রোক করে এক চোখ হারানো উচ্চমান সহকারী জাকির হোসেন। গত ১০ সেপ্টেম্বর ১৪৭২(৬) নম্বর স্মারকে-এ অসুস্থ কর্মচারীকে পাইকগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে।
এ রকম অসংখ্য বদলি এবং আবার সংশোধনী আদেশ দেওয়ার হিড়িক পড়েছে। আতঙ্কিত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বদলি ঠেকাতে এবং বদলি হওয়ার পরে আদেশ বাতিলে দিনের পর দিন ধরনা দিচ্ছেন খুলনা স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তরে। অদৃশ্য শক্তির বলে অনেকে বদলি ঠেকাতে সক্ষম হচ্ছেন। আবার অনেকে বদলি হলেও পূর্বের স্থলে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে এ বদলি বাণিজ্য আজও চলমান।
খুলনা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. শেখ মোঃ মোশাররফ হোসেন বলেন, দীর্ঘ দিন ধরে একস্থানে চাকরি করার কারণে অনেকে অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে জড়িত। অনিয়ম ও দুর্নীতি ঠেকাতে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বদলির পরে দু’ এক দিনের মধ্যে আবারও বদলি আদেশ কেন বাতিল করা হচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে এবং রাজনৈতিক নেতাদের চাপে অনেক বদলি বাতিল করা হয়েছে। উৎকোচ গ্রহণের কথা তিনি অস্বীকার করেন।
খুলনা গেজেট/এনএম

