সারাদেশে ৬ মাসে ১,৩৬৮ নারী ও শিশু নির্যাতন

বিচারে গতি আনার দাবি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের

আল মামুন, খুবি

সারাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে অন্তত এক হাজার ৩৬৮ জন নারী ও কন্যাশিশু নানা ধরনের সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বছরের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে এই নির্যাতনের হার দাঁড়িয়েছে ৮১ দশমিক ৯৬ শতাংশে। এসব অপরাধের বিচারে গতি আনার দাবি জানিয়েছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে মোট ১৮৩ জন নারী ও কন্যাশিশু সহিংসতার শিকার হলেও মার্চ মাস থেকে এই গ্রাফ ক্রমেই ওপরের দিকে উঠতে থাকে। মার্চে নির্যাতনের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯০ জনে, এপ্রিলে ২২০ জনে এবং মে মাসে তা ২৬০ জনে গিয়ে ঠেকে। বছরের প্রথম অর্ধেকের শেষ মাস জুনে এসে আগের সব রেকর্ড ভেঙে শুধু এক মাসেই ৩৩৩ জন নারী ও শিশু নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়।

চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মোট ২৫০ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়, যাদের মধ্যে ৬৫ জনের ক্ষেত্রে ঘটেছিল সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মতো পাশবিক ঘটনা। এ ছাড়া ১৮ জনকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। জুন মাসে পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর রূপ নেয়; শুধু এ মাসেই নতুন করে আরও ১০০ জন নারী এবং শিশু ধর্ষণের শিকার হয়, যার মধ্যে ২৪ জন দলবদ্ধ ধর্ষণ এবং ৭ জন ধর্ষণের পর খুনের শিকার হয়। এর সঙ্গে হত্যা এবং রহস্যজনক মৃত্যুর সংখ্যাগুলোও বিভীষিকা তৈরি করেছে। শুধু জুন মাসে ৫৪ জন নারী ও কন্যাশিশুকে সরাসরি হত্যা করা হয়েছে এবং ৩৩ জনের মৃত্যু ঘটেছে রহস্যজনকভাবে।

খুলনা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাফিয়া ওয়াহিদ নির্ঝর বলেন, বিগত ৬ মাসে ১ হাজার ৩৬৮ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার এটি শুধু নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার বিষয় নয়, অপ্রাপ্তবয়স্ক বা বাচ্চা মেয়ে এবং ছেলেরাও এর শিকার হচ্ছে। এটি মূলত আমাদের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা, বিচারব্যবস্থা এবং সামাজিক পরিস্থিতির প্রতিফলন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই এক হাজার ৩৬৮টি শুধু নথিভুক্ত ঘটনা। সামাজিক সম্মান, ভয়, পরিবার ও সমাজের চাপের কারণে এর বাইরে অনেক ঘটনা কখনো প্রকাশই পায় না, তার হিসেবও কারও জানা নেই।

কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়া এবং বারবার সেটি রিপিট হওয়ার অন্যতম কারণ হলো অপরাধীদের মনে আইনের ভয় না থাকা। একজন অপরাধী যখন দেখবে দেশে আইন আছে, কিন্তু কার্যকর নয়, তদন্ত দুর্বল, অথবা বিচার হতে বছরের পর বছর লেগে যাচ্ছে এবং শাস্তিও কার্যকরভাবে নিশ্চিত হচ্ছে না, তখন সেই আইন কার্যকর প্রতিরোধ তৈরি করতে পারে না।

শিক্ষার্থী উম্মে সাদিয়া ফরাজী বলেন, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন বৃদ্ধির মূল কারণ বিচারহীনতার সংস্কৃতি। একজন অপরাধী যখন দেখে অন্যায় করার পরেও তার কোনো বিচার হচ্ছে না, তখন তার ভিতর থেকে ভয় জিনিসটা কমে যায় এবং সে একই অপরাধের দিকে বারবার ধাবিত হওয়া শুরু করে। কোনো ঘটনার পর প্রথমত অপরাধীর দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে, অপরাধীদের মধ্যে যেন কোনো শ্রেণি বিভেদ না হয় এবং বিচার কাজ সম্পন্ন করতে যেন কোনো টালবাহানা না হয় সরকারকে তা নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সব জায়গায় মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে নির্যাতনের নতুন মাত্রায় যোগ হওয়া সাইবার বুলিং, ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়া, অনলাইন ব্ল্যাকমেইল ও যৌন হয়রানি দমনে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং নারীদের ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারী ও শিশুদের জন্য সহজলভ্য আইনি সহায়তা, নিরাপদ আশ্রয় এবং মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে।

জান্নাতুল ফেরদৌস মিম বলেন, যখন ইমারজেন্সি ৯৯৯-এ কল দেওয়া হয়, তখন আইনি সহায়তা যেন যথা সময়ে পাওয়া যায়। প্রতিটি থানার পুলিশ থেকে শুরু করে এমপি-মন্ত্রীসহ বিচার ব্যবস্থার সাথে জড়িত কর্মচারী-কর্মকর্তা সবাই যেন তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন। কোথাও কোনো ধর্ষণ বা নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে অধিকাংশ সময় তার সুষ্ঠু তদন্ত বা বিচার হয় না। শুধুমাত্র ফোকাসে উঠে আসা কিছু কিছু আসামিকে জনগণের চাপে পড়ে আইনের আওতায় আনা হলেও তারা না-জানা এক দিব্য শক্তিতে জামিন পেয়ে যায় এবং আসামির দোষ না দেখে উল্টো ভিক্টিম ব্লেমিং করা হয়। দেশে আজ পর্যন্ত একটি ধর্ষণ মামলার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি। এখন দরকার এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি যা অপরাধীদের অপরাধ করার আগে ভাবাবে এবং একটি নারীকে লাঞ্ছনা করতে গেলে সেই আফটার-ইফেক্ট মাথায় আসবে যে সে ক্রাইম করে কোনোভাবেই পার পাবেনা।

তাইয়্যেবা জামান নৈঋতা বলেন, ঘরে, কুমিল্লার সোহাগি জাহান তনু কিংবা শিশু রামিসা হত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর পর তদন্তের গাফিলতি ও বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা দেশের নিরাপত্তাকে ক্রমাগত শঙ্কার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। যেখানে বিচার পাওয়ার বদলে উল্টো ভিক্টিমকেই মানসিক নিপীড়ন ও সামাজিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়, তা অনেক সময় ভিক্টিমকে সুইসাইড বা সেলফ হার্মের মতো ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। জরুরি সেবা ৯৯৯ কিংবা স্থানীয় থানায় যোগাযোগ করলে কালক্ষেপণ ছাড়া তাৎক্ষণিক আইনি সহায়তা না পাওয়া এবং অপরাধীদের ক্ষমতার দাপটে পার পেয়ে যাওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা দূর করতে পুলিশি জবাবদিহিতা শতভাগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাই লোক দেখানো কোনো ব্যবস্থার বদলে প্রভাবমুক্ত তদন্ত, দ্রুততম সময়ে আসামির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং নারীবান্ধব আইনি পরিবেশ গড়ে তোলার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে প্রতিটি নারীর সাংবিধানিক সুরক্ষা ও সমমর্যাদা সুনিশ্চিত করার দাবি জানায়।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন