চিকিৎসা, উচ্চশিক্ষা, ব্যবসা কিংবা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি প্রতিবেশী দেশ ভারতে যান। দীর্ঘদিন ভারতীয় ভিসা কার্যক্রম সীমিত থাকার পর সম্প্রতি আবেদন গ্রহণ শুরু হলেও নতুন করে দেখা দিয়েছে অ্যাপয়েন্টমেন্ট সংকট। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে অসাধু এজেন্ট চক্র। অভিযোগ উঠেছে, নির্ধারিত তারিখ পাইয়ে দেওয়ার নামে আবেদনকারীদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ।
ভিসা আবেদনকারীরা জানান, অনলাইনে আবেদনপত্র পূরণ করার পর নির্ধারিত দিনে ভিসা সেন্টারে পাসপোর্টের সাথে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ ১ হাজার ৫০০ টাকা ফি জমা দিতে হয়। কিন্তু অনেকেই অনলাইনে আবেদন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাচ্ছে না। ফলে জরুরি প্রয়োজনে ভারত যেতে ইচ্ছুক ব্যক্তিরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে এক শ্রেণির এজেন্ট ও দালাল চক্র আবেদনকারীদের দ্রুত তারিখ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা নিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আবেদনকারীদের অভিযোগ, এত টাকা দেওয়ার পরও ভিসা পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য হওয়ায় সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য আরও বাড়বে।
গত মঙ্গলবার এ প্রতিবেদক গ্রাহক বেশে যান খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সন্নিকটে ভারতীয় ভিসা সেন্টারের সামনের এজেন্টদের কাছে। সেখানে কথা হয় ‘খান নেট কর্ণার’ এর মোঃ ফয়সাল হোসেনের সাথে। ভারতের ভ্রমণ ভিসার অনলাইন আবেদনের বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তারিখ ছাড়া শুধুমাত্র অনলাইন আবেদন ফিস ৩০০ টাকা। আর অ্যাপয়েন্টমেন্ট সহ কাজ করালে ভিসা ফিসসহ পাসপোর্ট প্রতি দিতে হবে ৭ হাজার টাকা।’ এক সাথে দুইজনের ভিসা করানোর প্রস্তাব দিলে প্রতিটি তিনি সাড়ে ৬ হাজার টাকা নেবেন বলে জানান। দেড় হাজারের স্থলে এত বেশি টাকা কেন নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন তো অনলাইনে ডেট পাওয়া যাচ্ছেনা। ঢাকায় যোগাযোগ করে ডেট আনতে হচ্ছে। এ কারণে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে।’
পার্শ্ববর্তী ‘মিঠুন ট্যুর এন্ড নেট সেন্টার’-এ কথা হয় ওই প্রতিষ্ঠানের প্রোপাইটার মিঠুন মণ্ডলের সাথে। অ্যাপয়েন্টমেন্ট সহ ভ্রমণ ভিসার আবেদন ফর্মের জন্য প্রতিটি ৮ হাজার টাকা এবং মেডিকেল ভিসার জন্য প্রতিটি ১০ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আগের মতো স্বাভাবিক নিয়মে অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া যাচ্ছেনা। খুলনা ও বাগেরহাট মিলে প্রতিদিন ৫০টি করে আবেদনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়া হচ্ছে। অথচ প্রতিদিন দুই জেলায় বহুসংখ্যক লোক আবেদন করছে। এর মধ্যে আমরা যাদের কাজ নিয়ে থাকি তাদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ঢাকা থেকে আনতে হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভিসা চালু হওয়ার পর প্রথমে মাত্র ২০টি করে আবেদন জমা নিচ্ছিল। তখন আমরা প্রতিটি আবেদনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট বাবদ ২০ হাজার টাকা নিয়েছি।’ কত দিনের মধ্যে ভিসা পাওয়া যাবে প্রসঙ্গে বলেন, ‘৭ কর্মদিবসের মধ্যে পাওয়া যাবে। তবে কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর ভিসা দেওয়া না দেওয়ার বিষয়টি ভিসা সেন্টারের উপর নির্ভর করে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভিসার কাজে যুক্ত জনৈক ব্যক্তি বলেন, ‘মূলত ঢাকায় একটা সিন্ডিকেট রয়েছে যাদের সাথে ভারতের কলকাতা ভিসা সেন্টারের সাথে যোগাযোগ রয়েছে। কোন সময় অনলাইনে আবেদন করলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া যাবে তা তারা সেখান থেকে জেনে তাদের অধিনস্ত এজেন্টদের জানিয়ে দেন। এ কারণে বর্তমানে এজেন্টগুলি অতিরিক্ত টাকা নিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘এতগুলি টাকা দিয়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর ভিসা না পেলে তার পুনরায় পূর্বের ন্যায় ৮/১০ হাজার টাকা জমা দিয়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হয়।’ অতিরিক্ত টাকা নেওয়া ভারত গমন ইচ্ছুকদের জন্য এটি অনেকটা হয়রানি ও আর্থিক কষ্টের বলে তিনি জানান।
ভিসা নিতে আসা দাকোপ উপজেলার খেজুরিয়া গ্রামের শুকুমার বলেন, ‘নিজের ও পরিবারের দু’টি পাসপোর্টে মেডিকেল ভিসার তারিখ পেতে দিতে হয়েছে ২৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে স্লট এর জন্য ২৪ হাজার টাকা এবং ব্যাংক স্টেটমেন্ট এর জন্য নিয়েছে ৩ হাজার টাকা।’ পূর্বের মতো স্বাভাবিক নিয়মে অনলাইনে সবাই অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাক এমন প্রত্যাশা করেন তিনি।
মহানগরীর ময়লাপোতা এলাকার শেখ রেফায়েত হোসেন বলেন, ‘এখানকার এজেন্টরা প্রতিটি মেডিকেল ভিসার জন্য ১২ হাজার টাকা চেয়েছিলো। ঢাকায় এই রেট ৮০ হাজার থেকে একলাখ টাকা। পরে এম্বাসিতে আবেদন করে বিনা টাকায় অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেয়েছি। আজ ভিসাও পেলাম ৬ মাসের।’
রূপসা উপজেলার বাগমারা গ্রামের হাফিজুর রহমান বলেন, ‘মেডিকেল ভিসার জন্য অনলাইনে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে কেউ ১০ হাজার কেউ ১২ হাজার টাকা চাচ্ছে। দু’জনের ভিসার জন্য ২৪ হাজার টাকা খরচ করে ভারতে চিকিৎসা করানো আমাদের মত নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে সম্ভব না। তাই ভারত যাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়েছি।’
এ ব্যপারে খুলনায় নিযুক্ত ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনারের অফিসিয়াল টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলেও কেউ ফোন রিসিভ করেনি।
খুলনা গেজেট/এনএম

