ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এর ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুদ্ধের প্রভাবে দিন দিন খুলনায় জ্বালানি তেলের সংকট তীব্র হচ্ছে। পাম্পগুলোতে মিলছে না চাহিনা অনুযায়ি তেল। প্রতিটা পাম্পে সব সময় থাকছে মোটরসাইকেলের দীর্ঘ লাইন। তেল সংগ্রহ করতে যেয়ে হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনাও ঘটছে। এদিকে নানা কৌশলে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও ব্যক্তি ড্রামে বা পটে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করছে। পরবর্তীতে এসব পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন দোকানে ও বাড়িতে। আর বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। এ বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে অভিযান পরিচালনা করা হলেও বন্ধ হচ্ছে না চড়া মুল্যে জ্বালানি তেল বিক্রি।
শুক্রবার জুম্মার নামাজ আদায় করতে যাওয়ার পথে খালিশপুরে ৩ ভ্যানে ৬ ড্রাম জ্বালানি তেল আটক করে জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল। তারপরেও ড্রামে খালিশপুর দিয়ে জ্বলানি তেল যাওয়া বন্ধ হয়নি। নগরীর লবনচরা এলাকায় মাই ম্যাক্সসিস নামক প্রতিষ্ঠানের মালিক রেশমা বেগম এক লিটার অকটেন ২১০ টাকা দরে বিক্রি করছিল।
গতকাল শনিবার দুপুরে নগরীর জিরোপয়েন্ট এলাকার মেসার্স শিকদার ফিলিং স্টেশন এন্ড সিএনজি পাম্মে মেসার্স গালিক অয়েল এর স্বত্বাধিকারী মোঃ আব্দুল জব্বার জোহরা খাতুন শিশু বিদ্যানিকেতন বিদ্যালয়ের নাম করে মিথ্যা তথ্য দিয়ে পাম্প থেকে জ্বালানি তেল ক্রয় করতে আসেন। এনএসআই খুলনা মেট্রো কার্যালয়ের তথ্যের ভিত্তিতে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ শোয়েব শাত-ঈল ইভান ভ্রাম্যমান অভিযান পরিচালনা করে তাকে ৩ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করে।
এর আগে শুক্রবার খুলনার দৌলতপুর পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড দৌলতপুর ডিপো মনিটরিং ও পরিদর্শন করেন খুলনা জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত। এসময় ট্যাংকে সংরক্ষিত জ্বালানি তেলের পরিমাপ শেষে একটি তৈলাধারের পেট্রোলের তাত্ত্বিক পরিমাণের সাথে বাস্তব পরিমাপের তুলনায় ১৭২ লিটার তেলের তারতম্য মেলে।
শুক্রবার এনএসআই- এর তথ্যের ভিত্তিতে ভ্রাম্যমান আদালত অভিযান চালিয়ে ৩ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়, অনাদায়ে ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়। এর আগে ফুলতলা থেকে ১২৩৫ লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করা হয়েছে। ৩০ মার্চ দৌলতপুর খুলনা ফিলিং ষ্টেশনে জ্বালানি তেল নিতে আসা দু’গ্রাহকের মধ্যে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে হাতাহাতি হয়।
দৌলতপুর থানার ওসি জাহিদুল ইসলাম বলেন, তেল নেওয়াকে কেন্দ্র করে দুই মোটরসাইকেল মালিকের সাথে হাতাহাতি হয়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ২ এপ্রিল রাত আনুমানিক দুই টার সময় ডুমুরিয়ার আঠোরোমাইল সেঞ্চুরি ফিলিং ষ্টেশনে পটে তেল দেওয়ার ভিডিও ধারণ করায় মারপিট ও হামলার শিকার হয় সাবেক শিবির সভাপতি মোঃ মহিদুজ্জামান। মাগুরাঘোনা ইউনিয়ন বিএিনপির সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম তাকে মারপিট করেন বলে অভিযোগ করা হয়। এনিয়ে পাল্টাপাল্টি সংবাদ সম্মেলন হয়েছে। ৩ এপ্রিল সাবেক শিবির সভাপতি মহিদ ডুমুরিয়া প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছে। আর ৪ এপ্রিল তার প্রতিবাদে মাগুরাঘোনা ইউনিয়ন বিএনপি পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করেছে একই ক্লাবে।
সাজিয়াড়া মোড়ে দেদারছে ২০০ থেকে আড়াইশো টাকায় অকটেন ও পেট্রোল বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহে এ লতিফ ফিলিং এ ২ হাজার লিটার জ্বালানি তেল নিয়ে যাওয়ার সময় প্রশাসন আটক করে। পরে আবার পাম্পের হাউজে তা ঢেলে দেওয়া হয়। তবে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
গত বৃহস্পতিবার উপজেলা সহকারী কমিশার (ভূমি) অমিত কুমার বিশ্বাস সাড়িয়াড়া মোড়ে মনিরুল ইসলাম নামে এক মুদি দোকানে অভিযান চালান। ওই দোকানে তখন ৬০০ লিটার জ্বালানি তেল মজুত ছিল। তবে অজ্ঞাত কারণে তিনি সেটি জব্দ না করে চলে আসেন।
এতসব ঘটনার পরেও অধিকাংশ পাম্পে ড্রামে এবং পটে তেল দেওয়া অব্যাহত রয়েছে। আর অধিকাংশ বাজারের মুদি দোকানে খুচনা বিক্রেতারা চড়া দামে জ্বালানি তেল বিক্রি করছে।
গতকাল শনিবার সকালে গল্লামারী মেট্রো ফিলিং ষ্টেশন, শিকদার ফিলিং ষ্টেশন ও ডুমুরিয়ার এ লতিফ ফিলিং এ যেয়ে দেখা যায়, প্রত্যেকটা পাম্পের সামনে লম্বা মটরসাইকেলের লাইন। সকাল ১০ টায় যেয়ে দেখা যায় শিকদারে তেল দেওয়া হচ্ছে। ডুমুরিয়ায় দুপুর ১ টা থেকে তেল দেওয়ার ঘোষণা দিলেও সকালেই মোটরসাইকেলের লম্বা লাইন কাচাঁবাজার ছাড়িয়ে যায়।
তেল নিতে আসা ধান ব্যবসায়ী নাসির সরদার জানান, মোটরসাইকেল নিয়ে ৪/৫ ঘন্টা অপেক্ষার পর মাত্র ৩০০ থেকে ৫০০ টাকার তেল মেলে। তাছাড়া ব্যাপক স্বজন প্রীতিও হয় পাম্পে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তবে পাম্প মালিক লতিফ জমাদ্দার বলেন, ডিপো থেকে যে বরাদ্দ দেওয়া হয় সেটা সঠিক ভাবে সকলকে দেওয়া হয়।
খুলনা জেলা প্রশাসক মিজ্ হুরে জান্নাত বলেন, আমাদের ভ্রাম্যমান টিম সর্বদা মাঠে রয়েছে। ওজনে কম এবং দাম বেশি নিলে এবং তা প্রমাণ হলে অবশ্যই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, রবিবার জ্বালানি মন্ত্রীর সাথে মিটিং রয়েছে। আরও কিছু নির্দেশনা আসতে পারে। সব মিলিয়ে জনভোগান্তি লাঘবে চেষ্টা করা হচ্ছে।
খুলনা গেজেট/এনএম

