খুলনায় নবনির্মিত আধুনিক কর ভবনের শুভ উদ্বোধন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) এক জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জাতীয় সংসদের হুইপ ও খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রকিবুল ইসলাম বকুল এই ভবনের ফলক উন্মোচন ও উদ্বোধন ঘোষণা করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি দেশের অর্থনীতিতে করদাতার গুরুত্ব এবং কর কর্মকর্তাদের আচরণের আমূল পরিবর্তনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান জনাব আবদুর রহমান খান। বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু, জেলা পরিষদের প্রশাসক এস এম মনিরুল হাসান বাপ্পী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য (কর নীতি) ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী এবং সদস্য (কর প্রশাসন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) আহসান হাবিব ও খুলনা জেলা প্রশাসক মিজ্ হুরে জান্নাত। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রকল্প পরিচালক ও খুলনার কর কমিশনার শ্রাবণী চাকমা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে রকিবুল ইসলাম বকুল বলেন, বাংলাদেশের আয়কর ব্যবস্থা দেশের উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি। দেশের রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও বিদ্যুৎসহ যাবতীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নের অর্থের বড় জোগান আসে জনগণের ট্যাক্স থেকে। তাই এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়াতে কর ফাঁকি রোধ করার পাশাপাশি নিয়মকানুন সহজ ও স্বচ্ছ করা একান্ত প্রয়োজন।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো টিআইএন (TIN) সার্টিফিকেট করা নিয়ে এক ধরণের ভীতি কাজ করে। মানুষ মনে করে করদাতা হলে তারা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে হয়রানির শিকার হবে। কর্মকর্তাদের অতিউৎসাহী আচরণ ও অসততার কারণেই নতুন করদাতা তৈরি হচ্ছে না, যা দেশের অর্থনীতির জন্য শুভ নয়।
হুইপ বকুল দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করেন যে, বিএনপি সরকারের প্রধান এজেন্ডা হলো করের হার না বাড়িয়ে করদাতার সংখ্যা বাড়ানো।
তিনি উল্লেখ করেন, বিএনপি জনগণের সরকার এবং নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার বদ্ধপরিকর। মাত্র ২২ দিনের মাথায় ফ্যামিলি কার্ড, কৃষি ঋণ মওকুফ, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের ভাতা এবং খেলোয়াড়দের ক্রীড়া ভাতা চালু করে সরকার তার সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। পহেলা বৈশাখ থেকে কৃষক কার্ড বিতরণ শুরু হবে বলেও তিনি জানান।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এসব সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ রাজস্ব খাত থেকেই আসবে, এর জন্য বাড়তি টাকা ছাপানোর প্রয়োজন হবে না, ফলে মূল্যস্ফীতির কোনো ঝুঁকি নেই।
কর প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, প্রায়ই দেখা যায় বড় ব্যবসায়ীরা কর ফাঁকি দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন, অথচ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ওপর কর কর্মকর্তারা অন্যায্য চাপ সৃষ্টি করেন। এই বৈষম্য দূর করতে হবে।
কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি কড়া বার্তা দিয়ে বলেন, তারেক রহমানের সরকারে ট্যাক্স কর্মকর্তারা জনগণের বন্ধু হবে, আতঙ্ক নয়। সাধারণ মানুষকে ট্যাক্সের টাকা কোথায় ব্যয় হয় তা সহজ ভাষায় বোঝাতে হবে এবং বেশি বেশি ক্যাম্পেইন করে সচেতনতা বাড়াতে হবে। করদাতাদের পুরস্কৃত করার মাধ্যমে কর দানে উৎসাহিত করার পরামর্শও দেন তিনি।
খুলনার আঞ্চলিক অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বকুল বলেন, শিল্পনগরী হিসেবে পরিচিত হলেও খুলনার শিল্প এখন ধ্বংসের পথে। বিশেষ করে মৎস্য শিল্প আজ হুমকির মুখে।
তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, অবহেলিত এই অঞ্চলে কুটির শিল্প থেকে শুরু করে বৃহৎ শিল্পকারখানা পুনরায় গড়ে তোলার মাধ্যমে অর্থনীতিকে সচল করা হবে। পরিশেষে তিনি একটি আধুনিক, বৈষম্যহীন ও জনবান্ধব কর ব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে নতুন কর ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তার ধারাবাহিকতায় তৎকালীন কর কমিশনার মো. ইকবাল হোসেন খসড়া ডিপিপি প্রণয়ন করেন। পরবর্তীতে অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ প্রস্তাবিত ‘খুলনা কর ভবন’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। ভবনটি খুলনা মহানগরীতে রাজস্ব বোর্ডের নিজস্ব ১ দশমিক ৩৫ একর জমিতে একটি সেমি বেইজমেন্টসহ ১০ তলা পর্যন্ত নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়। প্রকল্পের ডিপিপির উপর ২০১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পিইসি সভায় কয়েকটি শর্ত সাপেক্ষে প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ পিইসি সভার সিদ্ধান্তের আলোকে ডিপিপি পুনর্গঠন করে পরিকল্পনা কমিশনে প্রেরণ করে। পুনর্গঠিত ডিপিপির ব্যয় প্রাক্কলন করা হয় ৭১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা (জিওবি) এবং বাস্তবায়নকাল প্রস্তাব করা হয় জুলাই ২০১৯ থেকে জুন ২০২২ সাল পর্যন্ত। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে নির্মাণ কাজ শুরু করে ২০২৬ সালে কাজটি শেষ করেন। কর ভবন নির্মানের সর্বমোট ব্যয় হয়েছে ৬৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা।

