স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও অযত্নে ও অবহেলায় ভঙ্গুর কাঠামোতে দাঁড়িয়ে আছে ৭১’র স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক চুকনগর বধ্যভূমি! প্রতিবার জাতীয় দিবসে এর কদর বাড়লেও অযত্নে আর অবহেলায় পড়ে থাকে সারা বছর।
জানা যায়, বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য ও রক্তাক্ত অধ্যায় হলো ২০ মে। ১৯৭১ সালের এদিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগরের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির মতো গুলি বর্ষণ করে ৮ থেকে ১০ হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছিল। সেই বিশাল লাশেরস্তূপ এই বধ্যভূমি।
পাকিস্তানিদের হাত থেকে জীবন ও সম্মান বাঁচাতে এবং যুদ্ধের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে ১৯৭১ সালের ২০ মে খুলনার পার্শ্ববর্তী ডুমুরিয়া, বটিয়াঘাটা, দাকোপ, চালনা ও বাগেরহাট জেলার রামপাল, মোড়লগঞ্জ, কচুয়া, শরণখোলা, মংলাসহ আশপাশ জেলা ও উপজেলা থেকে প্রায় এক লাখ মানুষ চুকনগর থেকে সাতক্ষীরা হয়ে ভারতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেদিন হাজার হাজার মানুষ ভারতে আশ্রয় নিতে ঘর-বাড়ি ছেড়েছিলেন। তাদেরই একাংশ ১৯ মে রাতে চুকনগরে থেমেছিলেন। পাতাখোলা বিল, পুটিমারি, দাসপাড়া, চুকনগর রায়পাড়া, নন্দীবাড়ি ও বিশ্বাসপাড়া, ভদ্রা নদীর পাড়ে রয়েল স্পোর্টিং ফুটবল মাঠ, বাজারের ভিতরে চাঁদনী, কালী মন্দির ও তৎসংলগ্ন বটতলা, ভদ্রা নদীতে নোঙর করা বড় বড় নৌকা ও চুকনগর দিব্যপল্লী মাধ্যমিক বিদ্যালয় আশ্রয় নিয়েছিলো শরণার্থী এসব মানুষ। পরদিন সকালে পাক বাহিনী ও রাজাকাররা নিরস্ত্র-এ বাঙালিকে অবিচারে এবং অন্যায়ভাবে হত্যা করেছিলেন। রক্তের স্রোত মিশে ভদ্রা নদীর পানিতে একাকার হয়ে সেদিন।
খুলনা শহর থেকে ৩২ কিলোমিটার পশ্চিমে ডুমুরিয়া উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নের মালতিয়া গ্রামে অবস্থিত চুকনগর বধ্যভূমি। বধ্যভূমির স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয় ২০০৬ সালে জুন মাসে। ২০০৫ সালে ৭৮ শতাংশ জমি সরকারিভাবে ক্রয় করা হয়। ২০০৬ সালে ১৮ অক্টোবর নতুনভাবে বদ্ধভূমির পূর্ণতা দেওয়ার জন্য স্থানীয় সরকার বিভাগে পত্র প্রদান করেন খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী।
সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, স্মৃতিস্তম্ভ বেদির পেছনের অংশে বড় একটি ফাটল। প্রবেশদ্বারে রয়েছে দুটি বকুল গাছ এবং সীমানা প্রাচীরের মধ্যে ১টি করে রয়েছে শিমুল গাছ, নিম গাছ, তাল গাছ, তাল-সুপারির ঝাড়, জাম গাছ, বট গাছ, আমলকী গাছ এবং ১২টি নারিকেল গাছ। বধ্যভূমির পেছনে কিছু জমিতে বোরো ধানের চাষাবাদ করা হয়েছে। তবে বধ্যভূমির স্মৃতি সম্বলিত পুরাতন সেই সাইনবোর্ড আর নেই। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কে-বা-কারা সেটি ভেঙে ফেলে দিয়েছে। সেদিন স্বাধীনতার এ স্মৃতিকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সবিতা সরকার নতুন করে উত্তর পাশে স্বাধীনতার স্মৃতি সম্বলিত আর একটি ফলক তৈরি করেন।
চুকনগর বধ্যভূমি সংরক্ষণ করছেন মোঃ ফজলুর রহমান মোড়ল। তিনি স্মৃতিস্তম্ভ শুরু থেকেই কেয়ার টেকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। আগে ১ হাজার টাকা বেতন দেওয়া হতো, এখন তিনি পাচ্ছেন মাসিক ৮ হাজার টাকা। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অধীনে তিনি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছেন। ফজলুর রহমান খুলনা গেজেট-এ প্রতিবেদককে জানান, ‘চরম অবহেলায় রয়েছে স্বাধীনতার স্মৃতি বিজড়িত চুকনগরের এ বধ্যভূমি। প্রতিদিন অনেক দর্শনার্থী আসেন এখানে। কিন্তু শৌচাগার না থাকায় চরম বিপাকে পড়তে হয় তাদের। এখানে বিদ্যুতের কোনো ব্যবস্থা নেই। সন্ধ্যা হলেই ভূতের রাজ্যে পরিণত হয়। তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন সন্ধ্যার পর বধ্যভূমির প্রবেশদ্বার আটকে রাতে বাড়ি চলে যাই। সকালে এসে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করি। সূর্যোদ্বয়ের সাথে সাথে পতাকা উত্তোলন করি। তিনি প্রতিদিন এ কাজ করে থাকেন। রাতে পবিত্র এ বধ্যভূমির ভিতরে নেশাখোরদের আড্ডা বসে।’
বাংলাদেশে মোট ৩৪২ টি বধ্যভূমির মধ্যে ৮ টি বৃহৎ বধ্যভূমি চিহ্নিত করে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে সরকার। সেই মোতাবেক ২০০৫ সালে বিএনপি সরকারের সময় চুকনগরের পাতাখোলা বিলের দক্ষিণ-পূর্ব কোনায় ৭৮ শতক জমি অধিগ্রহণ করে ২০০৬ সালে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে বধ্যভূমির স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে সরকার। সারা দেশের মধ্যে সবচেয়ে নারকীয় হত্যাকা- ঘটেছিলো চকিনগরে। তবে নিহতদের সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও ৮ থেকে ১০ হাজারের অধিক হবে বলে জানা গেছে।
চুকনগর ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ এবং গণহত্যা’৭১ স্মৃতি রক্ষা পরিষদের সভাপতি এবিএম শফিকুল ইসলামের দেওয়া তথ্য মতে জানা গেছে, ‘বিশ্বের ইতিহাসে সংঘটিত গণহত্যাগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা গেছে চুকনগর গণহত্যাই বিশ্বেও সর্ববৃহৎ গণহত্যা। কারণ এত কম সময়ে বিশ্বের আর কোথাও একসাথে এত মানুষকে জীবন দিতে হয়নি। এখনও পর্যন্ত যে গণহত্যাকে বৃহৎ গণহত্যা বলা হয়ে থাকে সেটা হলো ভিয়েতনামের মাইলাই হত্যাকা-, কিন্তু সেখানে ১৫০০ এর মতো মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল বলে জানা যায়।’
চুকনগর গণহত্যায় নিহতদের মধ্যে পরিচয় মিলেছে ৫১ জনের। নিহতরা হলেন, ডুমুরিয়ার মালতিয়ার চিকন আলী মোড়ল, সুরেন্দ্রনাথ কু-ু, চুকনগরের বাবুরাম বিশ্বাস, আবেজান (শিশু), দিগম্বর দাস, কালাচাঁদ দাস, বাবুলাল দাস, আলাদিপুরের কেশব রায়, প্রফুল্ল রায়, কার্তিক রায়, মদন রায়, শিবপদ রায়, তৃষ্ণা রায়, দাশী রায়, অভিরাম মন্ডল, নির্মল মন্ডল, পাতিবুনিয়ার বিষ্ণুপদ মন্ডল, নিশিকান্ত বালা, ঠাকুরদাস বালা, কালিপদ বালা, সমরেশ মন্ডল, প্রফুল্ল মন্ডল, শিবনগরের মোংলা মন্ডল, অনিস মন্ডল, পঞ্চানন মন্ডল, সুশীল সানা, হরেন সানা, কালীপদ রায়, অতুল মন্ডল, কুশিলাল সানা, গাজো মন্ডল, কালিপদ মন্ডল, সুবোধ সানা, মনমথো মন্ডল, কালিপদ সানা, বনমালী সানা, জিতেন্দ্রনাথ মন্ডল, চুন্নিলাল মন্ডল, প্রমিলা রায়, নারায়ন রায়, মাগুরখালীর চৈতন্য মল্লিক, গাজীনগরের জগদ্বীশ গোলদার, নিরঞ্জন মন্ডল, কাঞ্চননগরের অনিল রায়, কাঠলিয়ার নিমাই চাঁদ সরকার, শেখেরট্যাকের বিরেন্দ্রনাথ সানা, কাজলী দাসী মিস্ত্রি, ঘুরুনিয়ার কেশব মন্ডল ও রতন লাল মন্ডল।

