খুলনার লবণচরা থানার আলোচিত জান্নাতুল মাওয়া হত্যা মামলার দায় স্বীকার করেছে অভিযুক্ত তোতা মিয়া। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) খুলনার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-১-এর বিচারক মো. আসাদুর জামান আসামির জবানবন্দি রেকর্ড শেষে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন।
তোতা মিয়া ঝালকাঠি জেলার রাজাপুর উপজেলার পুটিয়াখালী এলাকার বাসিন্দা ইউসুফ আলী ব্যাপারীর ছেলে।
বুধবার গভীর রাতে ঢাকার গাজীপুরের কাপাসিয়া এলাকার একটি ভাসমান জাহাজ থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। লবণচরা এলাকার ক্ষুব্ধ মানুষ তার আদালতে উপস্থিতির সংবাদ পেয়ে আদালত চত্বরে ভিড় করতে থাকে। আসামিকে জনতার হাতে তুলে দেওয়ার দাবিতে বিচারকের খাস কামরার সামনে বিক্ষোভ ও বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দিতে থাকে তারা। পরে ম্যাজিস্ট্রেট আসাদুর জামান খাস কামরা থেকে বের হয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিতের আশ্বাস দিলে উপস্থিত বিক্ষোভকারীরা শান্ত হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআইয়ের এসআই মো. হাবিবুর রহমান জানান, ভিকটিম মাওয়ার বাবা মো. শাহজালালের দূরসম্পর্কের আত্মীয় তোতা মিয়া। ১৯৯৭ সালে প্রথম স্ত্রী শাহিনুর আক্তার মুন্নিকে হত্যার দায়ে তাকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করে আদালত। ১৯ বছর ২২ দিন জেল খেটে ২০২০ সালের ২০ জানুয়ারি কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে।
তিনি আরও জানান, ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ভিকটিম জান্নাতুল মাওয়ার পরিবারের সহায়তায় টুটপাড়া এলাকার বাসিন্দা সামাদ শেখের মেয়ে ময়না বেগমকে বিয়ে করে। এরপর তোতা মিয়া কিছুদিনের জন্য পাশের দেশ ভারতে গিয়ে অবস্থান করে। ওই সময় তার অনুপস্থিতিতে দ্বিতীয় স্ত্রী ময়না বেগম তাকে ডিভোর্স দেয়। বিষয়টি সে ভালোভাবে নেয়নি। সে ধারণা করতে থাকে, ডিভোর্সের পেছনে মাওয়ার পরিবারের হাত রয়েছে। তাই দ্বিতীয় স্ত্রী ও ভিকটিম মাওয়ার পরিবারকে উপযুক্ত শিক্ষা দিতে পরিকল্পনা করতে থাকে।

তিনি বলেন, পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২৩ মার্চ দুপুরে মাওয়ার মামার বিয়েতে লবণচরা থানাধীন সাচিবুনিয়া সুইচগেটের পাশে বেড়াতে আসে। ওই দিন দুপুর ১টা ৫০ মিনিটের দিকে আইসক্রিম খাওয়ানোর কথা বলে তাকে সুইচগেটে নিয়ে যায়। মাওয়াকে দীর্ঘক্ষণ না দেখে মা তোতা মিয়াকে ফোন দেয়। সে বিপরীত দিক থেকে জানায়, তারা সুইচগেট এলাকায় অবস্থান করছে। এমন সংবাদ পেয়ে মাওয়ার পরিবার সেখানে খোঁজ নিয়ে না পেয়ে পুনরায় ফোন দিলে তোতা মিয়ার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে থানায় নিখোঁজের একটি জিডি করা হয়।
হত্যার আগে মাওয়াকে নগরের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে ঘুরে বেড়ায় তোতা মিয়া। মাগরিবের নামাজের কিছুক্ষণ পর একটি দড়ি দিয়ে শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করে। ঘটনার দিন রাত দেড়টার দিকে তোতা মিয়ার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন দিয়ে ভিকটিমের বাবার ইমোতে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে জানানো হয়, ‘হরিণটানা গেটের বাম পাশে গেলে মাওয়ার মরদেহ পাবি।’ বিষয়টি লবণচরা থানাকে জানানো হলে পুলিশ হরিণটানা গেটের বিপরীত পাশের খেজুরের ভিটার বাগান থেকে মাওয়ার মরদেহ, পায়ের জুতা এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দড়ি উদ্ধার করে। পরে মরদেহের সুরতহাল রিপোর্ট প্রস্তুত করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়।
তিনি আরও বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর থেকে পুলিশের পাশাপাশি খুলনা পিবিআই ছায়া তদন্ত শুরু করে। তারা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে তোতা মিয়ার অবস্থান শনাক্ত করে। গত বুধবার রাতে মোবাইল ফোন ট্র্যাক করে অবস্থান নিশ্চিত হয়ে গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার গোসাইরগাঁও এলাকার একটি ভাসমান জাহাজ থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর সে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয় পুলিশকে। পরবর্তীতে আদালতে স্বেচ্ছায় জবানবন্দি দিতে চাইলে দুপুর সোয়া দুইটার দিকে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। বিকেল ৫টা ২৩ মিনিটে জবানবন্দি শেষ হলে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত।

