প্রতিশ্রুতি ও অপেক্ষার ১৬ বছর পার হয়েছে। আজও পূর্ণতা পায়নি খুলনা মহানগরী সংলগ্ন গল্লামারী বধ্যভূমিতে নির্মিত স্মৃতিসৌধটি। মুক্তিযুদ্ধের গণহত্যার স্মৃতিবিজড়িত গল্লামারীতে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০০৯ সালে। ২ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত মূল স্মৃতিসৌধের কাজ শেষ হয় ২০১০ সালে।
এরপরই বন্ধ হয়ে যায় বাকি কাজ। মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গ স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করতে প্রয়োজন ছিল মাত্র ৯ কোটি টাকার। গত ১৬ বছরেও এই টাকা ছাড় করাতে পারেননি খুলনার জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতারা। যার কারণে স্মৃতিসৌধটি পূর্ণাঙ্গতা পায়নি। নতুন সরকার এবং বিএনপি নেতাদের কাছে দাবি, দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে অসম্পূর্ণ কাজটি শেষ করার।
মুক্তিযোদ্ধারা জানান, স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে বর্তমান খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ছিল পূর্ব পাকিস্তান রেডিও স্টেশন। সেখানে আস্তানা গাড়ে পাকিস্তানি সেনারা। এছাড়া সার্কিট হাউস, ইউএফডি ক্লাব ও রেলস্টেশনে ছিল তাদের ঘাঁটি। আর ভূতের বাড়ি আনসার ক্যাম্পে ছিল রাজাকারদের আস্তানা। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিকামী ও সাধারণ মানুষকে তুলে নিয়ে যাওয়া হতো এসব ক্যাম্পে। চলত নির্যাতন। এরপর গল্লামারী এলাকায় নিয়ে গিয়ে তাদের হত্যা করা হতো। কখনও ক্যাম্পে হত্যা করে ট্রাকে করে লাশ নিয়ে নিয়ে ফেলা হতো গল্লামারীর নদী ও আশপাশের জলাভূমিতে। নয় মাসে ওই এলাকা পরিণত হয় লাশের স্তূপে।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কেউ গল্লামারী এলাকায় যেতে সাহস পেত না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরদিন ওই এলাকায় গিয়ে মানুষ রাস্তার ধারে, বিলের মধ্যে, নদীতে শুধু গলিত আর অর্ধগলিত লাশের ছড়াছড়ি দেখতে পায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর শুধু গল্লামারী এলাকা থেকেই কয়েকশ’ মানুষের কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়েছিল। তবে ঠিক কতজনকে সেখানে হত্যা করা হয়েছে, তা কেউ বলতে পারে না।
খুলনা জেলা পরিষদ সূত্র জানায়, স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দেওয়া এসব হতভাগ্য মানুষের স্মরণে বটিয়াঘাটা উপজেলার গল্লামারী বধ্যভূমির তিন একর জমিতে ক্ষুদ্র পরিসরে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৯৫ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক কাজী রিয়াজুল হক ও পুলিশ সুপার আওলাদ হোসেনের উদ্যোগে সেখানে অস্থায়ী স্মৃতিসৌধ নির্মাণ ও ওই বছর ২৬ মার্চ বিজয় মঞ্চের উদ্বোধন হয়। ২০০৮ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আনোয়ার ইকবাল চৌধুরী পূর্ণাঙ্গ স্মৃতিসৌধ নির্মাণের জন্য খুলনা জেলা পরিষদকে প্রকল্প তৈরির নির্দেশ দেন। এজন্য তিনি দুই কোটি টাকাও জেলা পরিষদের অনুকূলে বরাদ্দ দেন।
প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী সৌধের মূল স্তম্ভ ছাড়াও স্তম্ভের চারপাশে ১০ ফুট লাল টাইলস বসানো পায়ে হাঁটার পথ, পার্কিং ইয়ার্ড, সীমানা প্রাচীর, গেইট, সিকিউরিটি শেড, রেস্টুরেন্ট, দৃষ্টিনন্দন ফুলের বাগান, পানির ফোয়ারা ছিল। এর মধ্যে মূল স্তম্ভ নির্মানে ব্যয় ধরা হয় ২ কোটি ১৬ লাখ ২৭ হাজার টাকা।
সূত্রটি জানায়, অর্থ বরাদ্দের পর দুই দফা দরপত্রের আহ্বান করে জেলা পরিষদ। দ্বিতীয় দফায় ২০০৯ সালের ২৩ জুন আহ্বান করা দরপত্রে কাজটি পায় খুলনার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আজাদ-ইলোরা জেভি। যার কার্যাদেশ হয় ২০০৯ সালের ১৫ নভেম্বর। ২০১০ সালের অক্টোবর মাসে মূল স্তম্ভ নির্মাণ কাজ শেষ হয়। ওই বছর ১৮ অক্টোবর সিটি কর্পোরেশনের তৎকালীন মেয়র ও জেলা প্রশাসকসহ খুলনার গণ্যমান্য বক্তিবর্গ নির্মাণ কাজ পরিদর্শন করেন। ওই সময় মেয়র সৌধের মাস্টারপ্লান অনুযায়ী অন্যান্য কাজ বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের অনুরোধ করেন।
এরপর ২০১১ সালের ১০ মার্চ স্মৃতিসৌধের স্থপতি আমিনুল ইসলাম ইমন নির্মিত ওই মূল স্তম্ভ পরিদর্শন করেন। তিনিও স্মৃতিসৌধটিকে পূর্ণতা দিতে মূল নকশা বাস্তবায়নের পরামর্শ দেন। এজন্য ২০১১ সালের মার্চে স্থানীয় সরকার বিভাগে বাকি ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ পেতে পত্র প্রেরণ করে জেলা পরিষদ। স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে অর্থ প্রদানে সুপারিশ ও নির্দেশনা দেয়। এরপর থেকে অসংখ্য চিঠি চালাচালি হয়েছে। কিন্তু অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।
সরেজমিন দেখা গেছে, সীমানা প্রাচীর বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় চত্বরে অবাঞ্ছিত/অনাকাঙ্খিত লোকজনের পদচারণা, অবাধে গরু-ছাগল ও কুকুরের বিচরণে প্রতিনিয়ত সৌধের পবিত্র নষ্ট হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমের পানি জমে স্থায়ী জলাবদ্ধতায় জলমগ্ন হয়ে পড়ছে সৌধের আশপাশ। স্মৃতিস্তম্ভে যাবার পথটি কাঁচা হওয়ায় বর্ষাকালে কাদাপানিতে নাকাল হতে হয় মানুষকে।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদের খুলনা মহানগর কমান্ডার মনিরুজ্জামান মনি বলেন, গল্লামারী স্মৃতিসৌধ পূর্ণাঙ্গ করতে আমরা প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলেছি, চিঠি দিয়েছি। নতুন সরকার গঠনের পর আমি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলেছি। আমাদের দাবি দ্রুত এটি বাস্তবায়ন করা হোক।
খুলনা জেলা পরিষদের নতুন প্রশাসক মনিরুল হাসান বাপ্পী বলেন, মূল সড়ক থেকে স্মৃতিসৌধে যাওয়ার পথটি পাকা করতে দ্রুতই আমরা কাজ শুরু করবো। বাকি পরিকল্পনা নিয়ে সবার সঙ্গে আলোচনা করে নতুন প্রকল্প তৈরি ও বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
খুলনা গেজেট/এনএম

