মঙ্গলবার । ১৭ই মার্চ, ২০২৬ । ৩রা চৈত্র, ১৪৩২

ফাঁকা ক্যাম্পাসে বাদামের ঝুড়ি হাতে এক অন্যরকম জীবনযুদ্ধ

আল মামুন

‘বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ, আগের মতো ছাত্র-শিক্ষক নেই। থাকলেও তাতে কী, আর না থাকলেও তাতে কী! আমার কাছ থেকে কেউ কিছু কিনতে চায় না। অল্প কিছু লোক আছে যারা কিনে, আর বেশিরভাগই একটু অস্বস্তি বোধ করে। যারা ১০ টাকা নিয়ে ভাবে না, তারাই কেবল কেনে। অন্যরা পাশ কাটিয়ে চলে যায়।’

এই কথাগুলো বলছিলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের এক পরিচিত মুখ, বাদাম বিক্রেতা মোঃ গোলাম মোস্তফা। যে বয়সে মানুষের বিশ্রামে থাকার কথা, সেই বয়সে তিনি এক হাতে লাঠি আর অন্য হাতে বাদামের ঝুড়ি নিয়ে ক্যাম্পাসের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলেছেন। তবে এই পথ চলাটা মোটেও সহজ নয়। কারণ মোস্তফা পৃথিবীটাকে দেখেন কেবল মনের চোখে।

একসময় ক্যাম্পাসের রাস্তায় ভ্যান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন মোস্তফা। তখন তাঁর শরীর সচল ছিল, চোখের দৃষ্টিও ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু করোনাকালীন সময়ে হঠাৎই নিভে যায় তাঁর চোখের আলো। চোখের শক্তি হারিয়ে অন্ধকার নেমে আসে তাঁর জীবনে। কিন্তু তিনি দমে যাননি। বেঁচে থাকার তাগিদে ভ্যানের হাতল ছেড়ে হাতে তুলে নিয়েছেন বাদাম, বুটের ঝুড়ি। এখন এই বাদাম, বুট বিক্রি করেই চলে তাঁর জীবন-সংসার।

স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন বা প্রতিবন্ধী হওয়ায় ক্রেতাদের মাঝে এক ধরনের অনীহা কাজ করে। অনেকেই কৌতূহল নিয়ে তাকান, কিন্তু বাদাম কিনতে গিয়ে দ্বিধায় ভোগেন। মোস্তফা আক্ষেপ করে বলেন, “মানুষ যদি আমাকে অবহেলা না করত, তাহলে হয়তো দিনগুলো আরও একটু ভালো কাটত।” তবে এই অবহেলা বা অভিযোগ নিয়ে তিনি পড়ে থাকেন না। অভাবের সংসারে আফসোস করার বিলাসিতা তাঁর নেই।

ঈদের ছুটিতে বিশ্ববিদ্যালয় এখন জনশূন্য। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পাড়ি জমিয়েছেন নিজ গন্তব্যে। চারদিকে নীরবতা, নেই চিরচেনা সেই কোলাহল। কিন্তু পেটের ক্ষুধা তো আর ছুটি চেনে না! তাই খাঁ খাঁ রোদে জনমানবহীন ক্যাম্পাসেও লাঠি ঠুকে ঠুকে হাঁটছেন তিনি। জিজ্ঞেস করতেই মলিন হাসিতে উত্তর দিলেন, “বেচাকেনা নেই, ক্যাম্পাস ফাঁকা। তারপরও চলছি কোনো রকমে। আগের মতো না হলেও আল্লাহ চালিয়ে নিচ্ছেন একভাবে।”

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে হাজারো স্বপ্ন ডানা মেলে। কিন্তু সেই চত্বরেই মোঃ গোলাম মোস্তফার মতো মানুষেরা প্রতিদিন লড়াই করেন শুধু টিকে থাকার জন্য। দৃষ্টি না থাকলেও তাঁর আত্মসম্মানবোধ আর পরিশ্রমের তীব্রতা যেন ক্যাম্পাসের প্রতিটি ধূলিকণাকে হার মানায়। সমাজ ও শিক্ষার্থীদের একটু সদয় দৃষ্টি আর তুচ্ছ অবহেলা পরিহারই পারে এই লড়াকু মানুষটির জীবনকে কিছুটা সহজ করতে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন