শনিবার । ১৪ই মার্চ, ২০২৬ । ১লা চৈত্র, ১৪৩২

বার্লি চাষে নতুন সম্ভাবনা পাইকগাছায়

কপিলমুনি প্রতিনিধি

লবণাক্ত জনপদে বার্লি চাষে নতুন সম্ভাবনা ও শুরুতেই চমক দেখাচ্ছে পাইকগাছার কপিলমুনির কাজীমুছা গ্রামের মনিরুল ইসলাম। তার নিজ এলাকার রামচন্দ্রনগর মৌজায় প্রায় ১ বিঘা জমিতে প্রথম বারের মতো আবাদ করেছেন, বারি -৭ ও বারি-১০ জাতের বার্লি। প্রথম বারেই অপরিচিত বার্লি চাষে রীতিমতো এলাকায় চমক সৃষ্টি করেছেন তিনি। বার্লির গাছ দেখতে অনেকটা গমের মতো। তা হলেও নতুন এই সফল আবাদের খবরে স্থানীয়দের পাশাপাশি প্রতিদিন দূর-দুরন্ত থেকে শত শত মানুষ আসছেন বার্লির খেত দেখতে। অনেকে নতুন এ আবাদে মশগুলও হচ্ছেন। আগ্রহের সাথে পরামর্শ নিচ্ছেন অনেকে।

ধারণা করা হচ্ছে, আগামীতে তার মতো অনেকেই বার্লির আবাদ শুরু করবেন। বার্লির নতুন উদ্যোক্তা কৃষক মনিরুলের সাফল্যে ভর করে বার্লিকে উপকূলীয় কৃষির নতুন সম্ভাবনা হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। বার্লি মূলত পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ একটি রবি শস্য। মল্ট তৈরি ও পশু খাদ্য হিসেবে বার্লির চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশে বার্লির অভ্যন্তরীণ উৎপাদন চাহিদা অনুযায়ী অপর্যাপ্ত হওয়ায় ঘাটতি মেটাতে অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, ইউক্রেন এবং কানাডা থেকে আমদানি করা হয়।

বার্লি আমদানিতে সরকারকে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়। দেশের অন্যান্য স্থানে কমবেশি বার্লির চাষ হলেও উপকূলীয় অঞ্চলে এটি প্রথম ও অপরিচিত নতুন ফসল। ফসলটির সাথে এখনও এখানকার কৃষকরা পরিচিত হয়ে ওঠতে পারেনি। তাই ধারণাও নেই। তবে বসে নেই কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর বিজ্ঞানী, কৃষি বিভাগ কিংবা কৃষকরা। প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে প্রচলিত উপকূলীয় কৃষি। কৃষিতে যুক্ত হচ্ছে নানা উদ্ভাবনী এবং লবণ সহিষ্ণু উদ্ভাবিত ফসলের বিভিন্ন উন্নত জাত। এর ধারাবাহিকতায় উপকূলীয় কৃষিতে সহজেই যুক্ত হতে চলেছে পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ রবিশস্য বার্লি।

কৃষকদের মাধ্যমে পরীক্ষামূলক চাষ শুরু করেছেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট-এর গবেষকরা। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, সরেজমিন গবেষণা বিভাগ খুলনার মাধ্যমে প্রথম বারেই উদ্যোক্তা মনিরুলের মাধ্যমে লবণাক্ত জমিতে বার্লি চাষ করে উপকূলীয় কৃষিতে সফলতার মুখ দেখেছেন। কৃষক হিসেবে মনিরুলও জায়গা করে নিয়েছেন। উপকূলীয় কৃষির জন্য সৃষ্টি করেছেন নতুন এক সম্ভাবনা।

কৃষক মনিরুল ইসলাম বলেন, এর আগে এই জমিতে রবি ফসল হিসেবে গম এবং বোরোধানের চাষ করতেন তিনি। কৃষি গবেষণা বিভাগের গবেষকদের পরামর্শে প্রথমবারের মতো বার্লি চাষ করেছেন। কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট তাকে বীজ, সারসহ অন্যান্য উপকরণ সরবরাহ করেছে। এরপরও প্রথমবারে ফলন বা সফলতা নিয়ে দুশ্চিন্তাও কম ছিল না তার। তবে ঈর্ষণীয় ফলনে চোখে-মুখে তার অন্য রকম তৃপ্তি। তাকে দেখে অন্যান্যদের আগ্রহে গর্ব অনুভব করছেন তিনি।

সরেজমিনে কৃষি গবেষণা বিভাগ খুলনার বৈজ্ঞানিক সহকারী মোঃ জাহিদ হাসান বলছিলেন, বারি বার্লি -৭ ও বারি বার্লি -১০ দুটি জাতই লবণ সহিষ্ণু এবং উপকূলীয় অঞ্চলে চাষের জন্য উপযোগী। তিনি বলেন, গম এবং বার্লির উৎপাদন প্রায় সমান হলেও গমের চেয়ে বার্লি উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম। এছাড়া গমের চেয়ে বার্লি অনেক বেশি পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ। বাজারে চাহিদা এবং দাম দুটোই বেশি। এজন্য বার্লি একটি লাভজনক ফসল। এর আগে খুলনার দক্ষিণের কয়রা উপজেলায় পরীক্ষামূলক চাষ হলেও পাইকগাছায় কৃষক মনিরুল ইসলামই প্রথম উদ্যোক্তা। এখন মিল্ক পর্যায়ে রয়েছে। বারি বার্লি-৭ এর চেয়ে বারি বার্লি-১০ তুলনামূলক একটু বেশি লম্বা ও উঁচু হয়েছে। আগামী ২০ দিন পর বার্লি উত্তোলন করা যাবে। বারি- ৭ হেক্টর প্রতি আড়াই মেট্রিক টন এবং বারি-১০ হেক্টর প্রতি ৩ মেট্রিকটন উৎপাদন হতে পারে বলেও মনে করছেন জাহিদ হাসান।

উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ একরামুল হোসেন বলেন, বার্লি চাষ পাইকগাছায় এটাই প্রথম। এটি কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট সম্পূর্ণ তদারকি করছে। তবে উপকূলীয় কৃষিতে বার্লি সংযোজন হলে সম্ভাবনায় নতুন মাত্রা যুক্ত হবে। নতুন আবাদ সম্পর্কে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরি বলছিলেন, এর আবাদ সম্প্রসারিত হলে পুষ্টি ও গো-খাদ্যের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আমদানি নির্ভরতা হ্রাস ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট সরেজমিন গবেষণা বিভাগ খুলনার প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোঃ কামরুল ইসলাম বলেন, দেশে বার্লির স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে পরীক্ষামূলক চাষে সফলতায় ভর করে রীতিমতো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারিত হলে বার্লির উৎপাদন এবং এর ব্যবহারও বাড়বে বলে আশা করেন তিনি। উপকূলীয় কৃষিকে টেকসই ও সমৃদ্ধ করতে আগামীতে বার্লির চাষ সম্প্রসারণ জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে- এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন