বৃহস্পতিবার । ১২ই মার্চ, ২০২৬ । ২৭শে ফাল্গুন, ১৪৩২
প্রশাসনের কাছে দিঘলিয়ার খালেদার আকুতি

ওরা আমাগে সব কিছু কাইড়ে নিছে, ঘরবাড়ি ছাইড়ে এহন দ্বারে দ্বারে কাঁইন্দে বেড়াচ্ছি

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৭ ফেব্রুয়ারি আমাগে বাড়িঘর সব ভাইঙে ফেলাই দিছে। আলমারীর ভিতর যত গয়না, টাহা-পয়সা ছেলো সব নিয়ে গেছে। এরপর বাড়ি থেকে নামাই দিছে। এহন আমাগে কিছুই নেই। ঘরবাড়ি ছাইড়ে দ্বারে দ্বারে কাঁইন্দে বেড়াচ্ছি। আমাগে দোষ একটা, আওয়ামীলীগ করিছি। আওয়ামী লীগতো ওরাও করিছে। ৫ আগস্টের পর বাদশা গাজী বিএনপি হইছে। আর আমরা শাস্তি ভোগ করতিছি।

বাড়ি-ঘর ও সহায়-সম্বল হারা দিঘলিয়া উপজেলার গাজীরহাট ইউনিয়নের ডোমরা গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কনস্টেবল মৃত জাফর শেখের স্ত্রী খালেদা বেগম এভাবেই তার ও তাদের পরিবারের ওপর নির্মম নির্যাতনের বর্ণনা দেন।

তিনি বলেন, ২০২৪-এর ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর বাড়ির হামলা-মামলা ও নির্যাতনের ভয়ে পলায়ে যায় পরিবারের পুরুষ সদস্যরা। ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পর আমাগেও বাড়ি থেকে তাড়ায়ে দেওয়া হয়। আশেপাশে কয়েকদিন ছিলাম। ভাশুর, দেবর সব বাড়ি ছাড়া। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়ার পর বাদশা গাজীরে দেড় লাখ টাকা চাঁদা দিছি একটু ভালো থাকবো বলে। কিছুদিন পর আবারও চাঁদা দাবি করে। দেয়নি বলে আমাগে বাড়ি এসে ঘরে ঢিল মারে, নানান ধরনের অরুচিকর কথাবার্তা বলে, পুতা-পুতনি রাস্তায় উঠলে মারতে যায়। নানান ধরনের উৎপাত শুরু করে। বড় ছেলে জাহিদুল শেখকে দোকানের ধার থেকে ধরে এনে মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। শেখ হাসিনা যেদিন চইলে গেছে, সেদিন থেকে ওরা বিএনপি হইছে। এতদিন আওয়ামীলীগ ছিল। এখন বিএনপি হয়ে নির্যাতন চালাচ্ছে। তারা আমাগে বাড়ি আসতে দেবে না। মাথা গোঁজার ঠাঁই দেবে না, শোয়ার জায়গা রাখবে না, বড় ছেলে আসলে তারে মাইরে ফেলাবে, হাত-পা ভাইঙে পঙ্গু কইরে দেবে। আমরা কি অপরাধ করেছি? আমার ছেলে, মেয়ে কি অপরাধ করিছে? ওরাও আওয়ামীলীগ করিছে, আমরাও আওয়ামীলীগ করিছি। কিন্তু ওরা কেন আমাদের সাথে এগুলো করতিছে? বাদশা গাজী, আকরাম গাজী এরাও এক সময় আওয়ামীলীগ করত।

স্বামীর পেনশনের টাকায় নির্মিত দোতলা বাড়িতে তিন ছেলে, পুত্রবধূ, পোতা পুতনি নিয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস করতেন খালেদা বেগম। ২৭ ফেব্রুয়ারি গাজীরহাট ইউনিয়ন বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক বাদশা গাজীর নেতৃত্বে একদল দুর্বৃত্ত খালেদা বেগমের বাড়ির দোতলা থেকে নিচতলা পর্যন্ত শাবল, হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে তছনছ করে দেয়। লুট করে নিয়ে যায় জানালার গ্রিল, যাবতীয় আসবাবপত্র, টিভি, ফ্রিজ, নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার।

ঘটনার পর খালেদা বেগমের বড় ছেলে জাহিদুল ইসলাম বাদী হয়ে বাদশা গাজী, আকরাম গাজী সহ ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত ৪/৫ জনকে আসামি করে দিঘলিয়া থানায় মামলা দায়ের করে।

খালেদা বেগম অভিযোগ করে বলেন, ‘মামলা করেছিলাম, জামিনে বের হয়ে আবার দু’টো ঘর ভাঙ্গিছে। ঘরের টিন খুলে নিয়ে গেছে। দেড়’শ মণ ধান ছিল তাও নিয়ে গেছে। ধানের গোলা ভেঙে রেখে গেছে।’

তিনি বলেন, ‘অনেক দুঃখে-কষ্টে আছি। সরকার ও প্রশাসনের কাছে বিচার চাই। আমারে বিচার দেন, ঘর বাড়ি ঠিক করে দেন, আমি যাতে ছেলে মেয়ে, বউ, পুতা-পুতনি নিয়ে বাড়িতে যেতে পারি এ ব্যবস্থা করে দেন।’

নিজের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ অস্বীকার করে বাদশা গাজী খুলনা গেজেটকে বলেন, ‘আমি জীবনে কোনোদিন আওয়ামী লীগ করিনি। জন্মলগ্ন থেকে আমরা সবাই বিএনপি করি। আমার চাচা ওবায়দুর রহমান হামিদপুর ইউনিয়ন বিএনপি’র সভাপতি ছিলেন। ২০০৩ সালে আমি হামিদপুর ইউনিয়ন যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলাম। এরপর হামিদপুর ৮নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই। দিঘলিয়া উপজেলা বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলাম, ২০০৯ সালে জেলা যুবদলের সহ গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক ছিলাম। ২৫ বছর ধরে আমি গাজীরহাট ইউনিয়নের পার্মোচন্দ্রপুর গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস করছি। ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত গাজীরহাট ইউনিয়ন বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক। আমার বিরুদ্ধে বাড়ি ভাঙচুর লুটপাটের যে অভিযোগ দেওয়া হচ্ছে এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমি এই ঘটনার সাথে জড়িত না। স্থানীয় দ্বন্দ্বের কারণে ওই বাড়ি ভাঙচুর হয়েছে।’

খুলনা গেজেট/এএজে




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন