সোমবার । ৯ই মার্চ, ২০২৬ । ২৪শে ফাল্গুন, ১৪৩২
খুলনায় আট দিনে ৫ খুন!

উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় সাধারণ মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক

খুলনায় গত আট দিনের ব্যবধানে পাঁচটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মহানগরীতে তিনটি এবং জেলায় দু’টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। এলাকার আধিপত্য বিস্তার, একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপের বিরোধ, মাদক বিকিকিনি, চাঁদাবাজি ও চরমপন্থি কানেকশনে এসব হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। শুধু হত্যাকাণ্ডেই নয়, খুলনায় সন্ধ্যা নামলেই আতঙ্ক বিরাজ করে। পুলিশের নিস্ক্রিয়তায় সন্ত্রাসীরা অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ নাগরিক নেতাদের।

জানা গেছে, গত দেড় বছরে খুলনায় ৬০ এর অধিক হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়। এছাড়া নদ-নদী থেকে শতাধিক লাশ উদ্ধার হয়েছে। গত আট দিনের ব্যবধানে খুলনা জেলা ও মহানগরীতে পাঁচটি হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা বৃদ্ধি পেয়েছে।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি দুপুরে মোটরসাইকেল মেরামতের জন্য আফিল গেট এলাকার পেট্রোল পাম্প সংলগ্ন একটি মোটর গ্যারেজে অবস্থান করছিল ঘের ব্যবসায়ী সোহেল শেখ। দুপুর ৩টার দিকে একটি মোটরসাইকেলে এসে দু’যুবকের একজন তাকে লক্ষ্য করে কয়েক রাউন্ড গুলি করে। একটি গুলি তার মাথায় বিদ্ধ হলে ঘটনাস্থলে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের হলেও হত্যার কোন ক্লু এখনও পর্যন্ত বের করতে পারেনি পুলিশ। হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত এমন কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। পরিবারের পক্ষ থেকে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এ ঘটনার একদিন পর দিঘলিয়ায় পূর্ব শত্রুতার জের ধরে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন সেনহাটি ইউনিয়ন যুবদল নেতা মুরাদ খান। গত শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪ টার দিকে মেয়ের জুতা কেনার জন্য স্থানীয় লোটোর শোরুমে যান। সেখানে আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা ছাত্রদল নেতা (বহিস্কৃত) সাজ্জাদসহ কয়েকজন হামলা চালিয়ে রগ কেটে হত্যা করে মুরাদকে। এর আগে ইজারার টাকা ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি দুপুরে উপজেলা মোড়ে যুবদল নেতার সাথে সাজ্জাদের হাতাহাতি হয়। তারই জের ধরে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে ১১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত পরিচয়ে ১২-১৩ জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা দায়ের করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশ ৩ জনকে গ্রেপ্তার করে। গত রবিবার দুপুরে মূল আসামি সাজ্জাদকে ঢাকার তেজগাঁ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে বলে জানান পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ মাহাবুবুর রহমান।

এদিকে গত রবিবার (২ মার্চ) রাত ৯ টার দিকে নগরী নিরালা মোড় সংলগ্ন জাহিদুর রহমান ক্রস রোডে পূর্ব বিরোধের জেরে আব্দুল আজিজ নামে এক যুবক খুন হয়। ওই দিন রাতে সে জাহিদুর রহমান ক্রস রোডে অবস্থান করছিল। তার অবস্থান নিশ্চিত হয়ে প্রতিপক্ষ গ্রুপ তার ওপর হামলা চালায়। চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়। সর্বশেষ গত বুধবার সন্ত্রাসীদের হাতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন রূপসা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সবেক সভাপতি ও উপজেলা শ্রমিক দলের আহ্বায়ক মাসুম বিল্লাহ। এ ঘটনায় পুলিশ দুই জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এছাড়া অস্ত্র আইনে একটি এবং হত্যা ঘটনায় পৃথক দু’টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

এর আগে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি তেরখাদা উপজেলায় বিএনপি’র দু’পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। ওই সংঘর্ষে মামুন মোল্লা নামে এক যুবক বোমার আঘাতে গুরুতর আহত হয়। আহত হয়ে সে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন ছিল। গত রবিবার (১ মার্চ) দুপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

শুধু হত্যাকাণ্ডই নয়, প্রায় রাতেই ঘটছে হামলা, গুলি, ছুরিকাঘাতসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনা। গেল সোমবার (২ মার্চ) রাত পৌনে ১০ টার দিকে নগরীর টুটপাড়া দরবেশ মোল্লা গলির সামনে এ্যাড. আইয়ুব আলীর বাড়ির সামনে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে খুলনা সোহরাওয়ার্দী কলেজ ছাত্রদল নেতা সাব্বির গুরুতর আহত হয়। এরপর বুধবার (৪ মার্চ) রাত সাড়ে ১০ টার দিকে নগরীর লবনচরা থানাধীন রহমতিয়া মসজিদের পাশে দুর্বৃত্তের ছোড়া গুলিতে হাবিবুর রহমান নামে এক রিকশাচালক গুরুতর আহত হয়। সন্ধ্যা হলেই আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হয় খুলনা।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) ত. ম. রোকনুজ্জামান বলেন, খুলনার প্রতিটি বস্তিতে কমপক্ষে দু’জন করে শুটার রয়েছে। তারা এক স্থানে থাকে না। এরা ভাড়াটিয়া হিসেবে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হয়ে বে-আইনি কাজ করে থাকে। তাদের অবস্থান শণাক্ত করা খুবই কঠিন। তাছাড়া নগরে ৩০২টি ছোট-বড় বস্তি রয়েছে। প্রতিটি বস্তিতে একাধিক (৩-৪ জন) মহিলা মাদক বিক্রেতার বিচরণ রয়েছে বলে পুলিশের ওই কর্মকর্তা জানান। তারাই সন্ত্রাসীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে থাকে। খুলনার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে পুলিশ কাজ করছে বলে এ কর্মকর্তা জানান।

এদিকে খুলনায় পর পর পাঁচ খুন ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন খুলনার নাগরিকবৃন্দ। সন্ধ্যা হলেই যেন আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হয়েছে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তারা নতুন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, বিগত দেড় বছরেরও অধিক সময় ধরে খুলনার আইন-শংখলা পরিস্থিতি খারাপ। গড়ে প্রতিদিন হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হচ্ছে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ, মাদক বিক্রেতাদের দৌরাত্ম্যে খুলনাবাসী অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। আমরা অর্ন্তবর্তী সরকারের কাছে নিরাপত্তা দাবি করেছিলাম। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়েছে। সন্ত্রাস দমনে নতুন সরকারকে অবশ্যই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার খুলনার সমন্বয়কারী এ্যাড. মোমিনুল ইসলাম বলেন, পরপর এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা খুবই দুঃখজনক। আগে নিয়মিত অনাকঙ্খিত ঘটনা কোনো না কোনো স্থানে হতো। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড মাঝে বন্ধ হয়ে গিয়ে আবার পুনরায় শুরু হয়েছে। সন্ত্রাস দমন এখনই উপযুক্ত সময়। সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করতে না পারলে খুলনা মানুষের বসবাসের অনুপোযোগী হয়ে পড়বে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন