শনিবার । ২৪শে জানুয়ারি, ২০২৬ । ১০ই মাঘ, ১৪৩২

শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, কর্মসংস্থান আর স্থায়ী বাসস্থানের নিশ্চয়তা চায় দলিতরা

আয়শা আক্তার জ্যোতি

ভোট মানে শুধু ব্যালট বাক্সে একটি সিল নয়-ভোট মানে আশা, নিরাপত্তা আর মর্যাদার স্বপ্ন। আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে দলিত জনগোষ্ঠীর মাঝে দেখা দিয়েছে সেই স্বপ্নের প্রতিফলন। দীর্ঘদিন অবহেলা, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা আর স্থায়ী বাসস্থানের সংকটে থাকা এই মানুষেরা আবারও ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাচ্ছেন। তাদের রয়েছে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দেওয়ার আকাক্সক্ষা। প্রার্থীদের কাছে এবারের নির্বাচনে শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, কর্মসংস্থান আর স্থায়ী বাসস্থানের নিশ্চয়তা চায় খুলনার দলিত জনগোষ্ঠী।

এইবার প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন নগরীর ৫ নং ঘাট এলাকার হরিজন কলোনীর বাসিন্দা শান্তি। প্রথমবার ভোটার হয়ে উচ্ছ্বসিত শান্তি খুলনা গেজেটকে বলেন, “এবার আমি প্রথম ভোট দেবো, খুব ভালো লাগছে।”

প্রথমবারের ভোটটি পছন্দের প্রার্থীকে দিতে চাই উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমি সেই প্রার্থীকে ভোট দেবো, যিনি আমাদের মতো পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করবেন। যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ তৈরি করবেন এবং কলোনির মানুষের থাকার জন্য একটি স্থায়ী সমাধান দেবেন।”

স্বামী ও তিন সন্তান নিয়ে একই কলোনিতে বসবাস করেন রীতা। তিনি বলেন, “আমার স্বামী ট্রেনের ওয়াসফিডে অস্থায়ীভাবে কাজ করেন। মাস শেষে আয় হয় গড়ে সাত থেকে সাড়ে সাত হাজার টাকা। এই সামান্য আয়ে পাঁচ সদস্যের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাদের। অভাব-অনটনের কারণে পড়াশোনাও ঠিকমতো করাতে পারছি না। সংসারের খরচ চালাতে ওর বাবা ট্রেনের কাজ শেষ করে ঝাড়ু ও বালতি নিয়ে বাড়ি বাড়ি কাজের খোঁজে বের হন। কাজ পেলে সেদিন ভালোভাবে চলতে পারি আর কাজ না পেলে পরিবারকে নিয়ে কষ্টে দিন কাটাতে হয়। আমরা তো চুরি করতে পারি না। অস্থায়ী আয় আর অনিশ্চিত বসবাস আমাদের জীবনকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

আসন্ন নির্বাচন নিয়ে নিজের প্রত্যাশার কথা জানিয়ে রীতা বলেন, “যে আমাদের কাজের ব্যবস্থা করবে, যে আমাদের মাথা গোঁজার মতো স্থায়ী একটা ঘরের নিশ্চয়তা দেবে, আমরা তাকেই ভোট দেবো।”

এইবার প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন একই কলোনির বাসিন্দা সাথী। তার মতে, এবার ভোট দেওয়া শুধু একটি অধিকার নয়, বরং নিজের মত প্রকাশের সুযোগ। তাই প্রথমবারের মতো ভোট দিতে আমি মানসিকভাবে প্রস্তুত এবং দৃঢ় প্রত্যয়ী।

কথা হয় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মী মিতা রাও এর সঙ্গে। হাসপাতাল থেকে তিনি কোনো নির্দিষ্ট বেতন পান না। রোগীর স্বজনেরা খুশি হয়ে কিছু দিলে, সেই টাকাতেই তিনি সংসারের খরচ চালানোর চেষ্টা করেন। মিতা রাও বলেন, “এর আগে আমরা পাওয়ার হাউজ মোড়ের লোকো কলোনিতে থাকতাম। সেখানে সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে একটি ঘর তৈরি করেছিলাম। কিন্তু ঘর তৈরির এক বছরের মধ্যেই সেটি ভেঙ্গে দেওয়া হয়। এখান থেকেও যদি আমাদের তাড়িয়ে দেওয়া হয়, তাহলে আমরা কোথায় যাব তা জানি না। আমাদের কোনো স্থায়ী বাসস্থান নেই। আমরা একটি স্থায়ী থাকার জায়গা চাই। যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক, আমাদের দাবি তারা যেন আমাদের থাকার জন্য একটি স্থায়ী জায়গা দেয়। আমরা চাই স্বামী-সন্তান নিয়ে নিরাপদে, নিশ্চিন্তে নিজের ঘরে বসবাস করতে।”

দলিত সম্প্রদায়ের মিরা বলেন, “এখানে কোনো রকমে দু’বেলা ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে আছি। হঠাৎ করে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসা করাব কী দিয়ে, সেটাই জানি না। ভোট এলেই অনেকেই কলোনিতে এসে সমস্যার কথা শোনেন। আশ্বাসও দেন। কিন্তু বাস্তবে কোনো সমাধান আজও আসেনি।”

নগরীর গল্লামারী ঋষিপাড়ার বাসিন্দা মল্লিকা ঋষি বলেন, “আমরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। তার ওপর কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। বর্তমানে গল্লামারীর ঋষিপাড়ায় বসবাস করছি। কিন্তু এখান থেকে যদি উচ্ছেদ করা হয়, তাহলে আমরা কোথায় যাবো, তা জানা নেই। এই অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়েই আমাদের জীবন কাটছে।” ভোট প্রসঙ্গে মল্লিকা বলেন, “আমি চাই, যাকে আমরা ভোট দেবো, তিনি যেন আমাদের সমাজের মানুষের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ তৈরি করেন। আমরা যেন পিছিয়ে না থাকি, বরং সমাজের অন্য সবার সঙ্গে সমানভাবে কাজ করে সম্মানের সঙ্গে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারি।”

জানা গেছে, ক্রিশ্চিয়ান এইড, আমরাই পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট ও মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন সম্মিলিতভাবে একটি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রান্তিক নারী, দলিত, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, ট্রান্সজেন্ডার, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ দলিত যুব ঐক্য পরিষদের সমন্বয়ক বিকাশ কুমার দাস বলেন, “দেশে দলিত জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে ঐতিহাসিকভাবে নির্যাতিত ও বঞ্চিত হয়ে আসছে। রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ স্বাধীনতা পেলেও এই জনগোষ্ঠীর প্রকৃত মুক্তি এখনও নিশ্চিত হয়নি। এর প্রধান কারণ হলো- এই নির্যাতিত শ্রেণির রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের বিষয়টি রাষ্ট্র বা সরকার কখনোই গুরুত্ব দিয়ে ভাবেনি। তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে বা প্রতিনিধিত্বে এখনো দলিত জনগোষ্ঠীর কার্যকর অংশগ্রহণ নেই। ফলে তারা রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের বাইরে থেকে যাচ্ছে। অথচ তাদের সমস্যাগুলো মূলত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও নীতির মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব। সে কারণেই আসন্ন নির্বাচনে নাগরিক হিসেবে দলিত জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে অন্তর্ভুক্ত করা এবং তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের পূর্ণ নিশ্চয়তা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১৫ লাখের বেশি পরিচ্ছন্নতাকর্মী রয়েছে। আগে এই খাতে চাকরি পেতে অনেক বাধা-বিপত্তি থাকলেও ধীরে ধীরে তারা কাজের সুযোগ পেত। কিন্তু বর্তমানে আউটসোর্সিং ব্যবস্থার কারণে এই কাজগুলোতে দলিত জনগোষ্ঠীর মানুষের প্রবেশাধিকার কমে গেছে। ফলে তাদের ঐতিহ্যগত পেশাগুলো অন্যরা দখল করে নিচ্ছে এবং দলিত জনগোষ্ঠী ক্রমেই কর্মসংস্থান হারিয়ে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে।”

শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করে সন্তানকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া দলিত পরিবারগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নানা কষ্ট স্বীকার করেও তারা তাদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারছে না। ফলে অনেক শিক্ষার্থী মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েই ঝরে পড়ে।”

অর্থনৈতিক দিক তুলে ধরে তিনি বলেন, “এই জনগোষ্ঠীকে আমরা এখনও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে পারিনি। এর অন্যতম কারণ হলো-সরকারি আর্থিক সুবিধা, ব্যাংক বা এনজিও থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা নানা বাধার মুখে পড়ে। ঋণ পাওয়ার জন্য যেসব শর্ত পূরণ করতে হয়, সেগুলো তারা বাস্তবে পূরণ করতে পারে না। ফলে তারা আর্থিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয় এবং অর্থনৈতিকভাবে আরও পিছিয়ে পড়ে।”

খুলনা গেজেট/এইচ




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন