বুধবার । ১৪ই জানুয়ারি, ২০২৬ । ৩০শে পৌষ, ১৪৩২
দুই বছর পর পরিকল্পনা কমিশনে শোলমারী নদী খনন প্রকল্প অনুমোদনের নীতিগত সিদ্ধান্ত

এ বছরও বানভাসিদের কান্না থামছে না!

জাহাঙ্গীর আলম

দুই বছর পর পরিকল্পনা কমিশনে শোলমারী নদী খনন প্রকল্প অনুমোদনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে বেশ কিছু সংশোধনী চাওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির পুরো নাম ‘খুলনা জেলার ডুমুরিয়া ও বটিয়াঘাটা উপজেলায় শোলমারী নদীর সাথে সম্পর্কিত বিল ও আবাসিক এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন’। পরিবেশের ছাড়পত্রের অভাবে দীর্ঘদিন ঝুলে ছিল। দ্রুত টেন্ডার হলেও ভাগ্য বিড়ম্বিত খুলনার ডুমুরিয়া-ফুলতলার বানভাসি এলাকার ৬ লাখ মানুষের কান্না এ বছরেও থামছে না।

সম্পূর্ণ বিলের মধ্যে তিন শতাধিক পরিবার নিয়ে ডুমুরিয়ার বিলপাটিয়ালা গ্রাম। মৎস্য ঘেরের মাছ, ধান এবং সবজি তাদের জীবিকার একমাত্র উপায়। ২০২৪ সালে অতিবৃষ্টিতে প্রায় ৮ মাস এ গ্রামটি পানির নিচে তলিয়ে ছিল। ডুমুরিয়া ও ফুলতলার কমপক্ষে অর্ধশত গ্রাম এভাবে দীর্ঘদিন জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। কমপক্ষে ৬ লাখ মানুষের ২৪ হাজার মৎস্য ঘের ভেসে যায়। ব্যাংক ও এনজিও থেকে লোন নিয়ে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে কয়েক লাখ মানুষ।

জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিএডিসিসহ বিভিন্ন অংশিজনের সার্বিক সহযোগিতায় শুষ্ক মৌসুমে এসব গ্রামের পানি অপসারণ সম্ভব হয়। কিন্তু বিলপাটিয়ালা, রংপুরের বটবেড়া, বারানসি, মুজোরগুটা, মির্জাপুরের গুয়োতলা, খড়িয়া এলাকার কমপক্ষে ১০ গ্রাম থেকে পানি অপসারণ হয়নি। এদিকে চলতি বছর বর্ষা মৌসুমে আবারও প্লাবিত হয়। ফলে গেল দু’বছরে এসব এলাকায় কোনো মাছ, সবজি ও ফসল হয়নি।

জলাবদ্ধতা দূর করতে গেল বছর তড়িঘড়ি করে পানি উন্নয়ন বোর্ড ৪৯ কোটি টাকার ‘খুলনা জেলার ডুমুরিয়া ও বটিয়াঘাটা উপজেলায় শোলমারী নদীর সাথে সম্পর্কিত বিল ও আবাসিক এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসন’ প্রকল্প গ্রহণ করে। পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (ইআইএ) প্রত্যায়ন না দেওয়ায় ওই প্রস্তাবিত প্রকল্পটি ফেরত দেয় পরিকল্পনা কমিশন। তবে চলতি বছর প্রত্যায়নসহ আবারও প্রকল্পটি পাঠানো হয়। পরিবেশগত কমিটির ৫৩২তম সভায় গতমাসে ছাড়পত্রের সিদ্ধান্ত হয়। ২ ডিসেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় থেকে ছাড়পত্র ফি ও ভ্যাট জমা দেওয়ার চিঠি দেওয়া হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড ১ লাখ ৮৪ হাজার টাকা এ বাবদ জমা দেন। ফলে চূড়ান্ত ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।

এদিকে গত ১৪ ডিসেম্বর পরিকল্পনা কমিশনের সভায় এ প্রকল্পটি অনুমোদনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে বেশ কিছু সংশোধনী দেওয়া হয়েছে। চলতি সপ্তাহে এ সংক্রান্ত চিঠি দেওয়া হবে খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ডকে। পরে পরিকল্পনা মন্ত্রনালয় প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদন দেবে বলে জানা গেছে। প্রকল্পটি অনুমোদন হলেও আগামী মাসেও টেন্ডার প্রক্রিয়ায় না গেলে এ বছরও জলাবদ্ধতার কবলে পড়বে বিলডাকাতিয়াসহ ডুমুরিয়া ও ফুলতলাবাসী। জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করছেন ভবদহ কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মতলেব হোসেন বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দপ্তরে দৌড়ঝাপের পর অবশেষে প্রকল্পটি পাস হতে যাচ্ছে।”

রুদাঘরা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জি এম আমানউল্লাহ বলেন, “এ প্রকল্পটি পাস হলে দু’উপজেলার ৬ লাখ মানুষের মুখে হাসি ফোটানো সম্ভব হবে।”

এ ব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী উজ্জল সেন বলেন, “প্রায় সকল প্রক্রিয়া শেষের দিকে।” প্রকল্পটি অনুমোদন হলে সবার আগে রামদিয়ায় পাম্প মেশিন বসানো হবে বলে তিনি জানান।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার সবিতা সরকার বলেন, “ডুমুরিয়ার জলাবদ্ধতা নিয়ে সকলেই অবগত। ২১ ডিসেম্বর জেলা উন্নয়ন সমন্নয়ন কমিটির সভায় এসব বিষয়ে কথা হয়েছে। সকল অংশিজনদের নিয়ে চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রকল্পটি পাস হলে আশা করা যায় আগামী বছর ডুমুরিয়ার মানুষ জলাবদ্ধতার হাত থেকে মুক্তি পাবে।”

জেলা প্রশাসক আ স ম জামসেদ খোন্দকার বলেন, “আমরা প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। জাতীয় নির্বাচন সামনে থাকায় একটু সমস্যা হচ্ছে। জলাবদ্ধ এলাকার কথা চিন্তা করে বিশেষ ব্যবস্থায় এ প্রকল্পটি অনুমোদন হতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।”

উল্লেখ্য, এ প্রকল্পে ভরাট লোয়ার শোলমারী নদীর সাড়ে ১২ কিলোমিটার এবং আপার শোলমারী নদীর ২.৮ কিলোমিটার নদী খনন। ঠাকুমারী খাল, রামদিয়া খাল, সিদুরতলা খাল, ঘোলা খাল, ঘোলা শাখা খাল, সিদুরখালী শাখা খাল, জোড়াবটতলা খাল, খড়িয়া খাল ও ঠিকাদারপাড়া খাল খনন, শোলমারী রেগুলেটরে ৩টি এবং রামদিয়া রেগুলেটরে ২টি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন সাবমারসিবল পাম্প স্থাপন। খননের প্রস্তাবিত ৯ টি খালের দৈর্ঘ্য ২১ কিলোমিটার। প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৯ কোটি টাকা।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন