বুধবার । ১৪ই জানুয়ারি, ২০২৬ । ৩০শে পৌষ, ১৪৩২
কাবিটা, কাবিখা ও টিআর প্রকল্পে কমিশন বাণিজ্য

কয়রায় উন্নয়নের নামে অনিয়ম দুর্নীতি

নিজস্ব প্রতিবেদক

উপকূলীয় এলাকার অবহেলিত জনপদ কয়রা উপজেলা। এ উপজেলায় প্রতি বছর গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দের পরও সদ্ব্যবহারের অভাবে দৃশ্যমান উন্নয়ন হচ্ছে না। এসব উন্নয়ন প্রকল্প থেকে জনপ্রতিনিধি ও তদারকি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। গেল অর্থবছরের বেশ কিছু প্রকল্পে কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে বিল উত্তোলন করা হলেও মাঠপর্যায়ে কাজের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অনেক প্রকল্পে নামমাত্র কাজের পরও সম্পূর্ণ বিল প্রদান করা হয়েছে।

উপজেলা পিআইও দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে ৯ কোটি ৯০ লাখ ২৭ হাজার ৪৪৯ টাকা, ৩৭৮ মেট্রিক টন চাল ও ৩৭৮ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেয়া হয়। এই বরাদ্দের আওতায় ৬০৫টি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। তন্মধ্যে শতাধিক প্রকল্প সরেজমিন পরিদর্শন ও বিশ্লেষণ করে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র পাওয়া গেছে।

সরেজমিন পরিদর্শন ও তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কারের (কাবিখা-চাল) আওতায় সদর ইউনিয়নের টেপাখালী লঞ্চঘাট সড়কে ৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ থাকলেও কোনো কাজ হয়নি। সেখানে এডিপির একটি প্রকল্পের কাজ করা হয়। আর সেই প্রকল্পের ছবি দেখিয়ে কাবিখা প্রকল্পের চাল উত্তোলন করা হয়।

মহারাজপুর ইউনিয়নের পশ্চিম দেয়াড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে আয়শার বাড়ি অভিমুখে রাস্তা মাটি দ্বারা উন্নয়নে ৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ১৯ মার্চ প্রকল্প গ্রহণ করার পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে কাজ শুরু করার কথা থাকলেও অদ্যাবধি কোনো কাজ করা হয়নি। প্রকল্পের সভাপতি স্থানীয় সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য আমেনা খাতুন বলেন, চেয়ারম্যানের কাজ করার কথা ছিল। তিনি কাজ করেছেন কিনা জানিনা। অর্ধেক চাল উত্তোলন করেছি, বাকি অর্ধেক এখনও উত্তোলন করা হয়নি।

টিআর কর্মসূচির আওতায় একই ইউনিয়নের দেয়াড়া বড়বাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের পুকুরের ঘাট নির্মাণের জন্য চার লাখ ২২ হাজার ৬২০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেখানেও কোনো কাজ করা হয়নি। এই প্রকল্পের সভাপতি স্থানীয় ইউপি সদস্য আব্দুল মান্নান বলেন, অর্ধেক টাকা উত্তোলনের পর ইট ক্রয় করি। তবে একটু সমস্যা হওয়ায় কাজ শুরু করতে পারিনি।

গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিখা-গম) কর্মসূচির আওতায় কয়রা সদর ইউনিয়নের ১ নং কয়রা গ্রামের সুশীল মণ্ডলের বাড়ি থেকে হরি মন্দির পর্যন্ত রাস্তা গাইডওয়ালসহ উন্নয়নে ৭ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেখানে দুর্ভোগ রয়ে গেছে। সেখানে কয়েক মাস পূর্বে বস্তায় ভরে কিছু বালু দেওয়া ছাড়া আর কোনো কাজ করা হয়নি। প্রকল্প সভাপতি ইউপি সদস্য মিজানুর রহমান কোহিনূর বলেন, শ্রমিক সংকটের কারণে কাজ করতে পারিনি।

সদর ইউনিয়নের জামিয়া মোহাম্মাদিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসার মাঠ ভরাটে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও ড্রেজার মেশিন দিয়ে মাত্র ৪৮ হাজার টাকার বালু উত্তোলন করা হয়েছে। আনুষঙ্গিক কাজসহ সবমিলিয়ে ৭৫ হাজার টাকার কাজ হয়েছে এবং বিল উত্তোলনের জন্য পিআইও অফিসে ৫৪ হাজার টাকা কমিশন দেওয়া লেগেছে বলে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে। একই ইউনিয়নের ৫ নং কয়রা খায়রুন্নেসার বাড়ি থেকে রফিকুলের বাড়ি পর্যন্ত মাটি দ্বারা উন্নয়নে দু’লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও ভেকু মেশিন দিয়ে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার কাজ হয়েছে। মহারাজপুর ইউনিয়নের গোবিন্দপুর গাজী বাড়ি মোড় থেকে বাইতুস সালাম মসজিদ পর্যন্ত ৩ লাখ ৩৪ হাজার ২২০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও মাত্র ১ লাখ টাকার কাজ হয়েছে।

একই ইউনিয়নের দেয়াড়া গ্রামে পিচের রাস্তা থেকে মফিজুলের বাড়ির দিকে ইটের সোলিং রাস্তা নির্মাণে দু’লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও মাত্র ২০০ ফুট দৈর্ঘ্যে ও ৫ ফুট প্রস্থের রাস্তা নির্মাণে ব্যয় হয়েছে সর্বোচ্চ ৬০ হাজার টাকা। আমাদী ইউনিয়নের জায়গীরমহল খেয়াঘাটের পাশে পানির জন্য পুকুর খননে ৫ মেট্রিক টন গম বরাদ্দ থাকলেও সেখানে কোনো পুকুর পাওয়া যায়নি। ব্যক্তি মালিকানাধীন একজনের মৎস্য ঘেরের একটি নালা থেকে ভেকু মেশিন দিয়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার মাটি খনন করা হয়েছে বলে জানা যায়। উত্তর বেদকাশি দেওয়ানখালী খাল খনন বাবদ দু’লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও ভেকু মেশিন দিয়ে ৬ ঘণ্টা কাজ করেন, যার খরচ ২১ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার কাজ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

২০২৪-২৫ অর্থ বছরে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিটা-কাবিখা) ও গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) কর্মসূচির আওতাধীন শতাধিক প্রকল্প বিশ্লেষণ করে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির চিত্র পাওয়া যায়। অধিকাংশ প্রকল্পে বরাদ্দ অনুযায়ী কাজ পাওয়া যায়নি।

অনুসন্ধানে উঠে আসে, ধাপে ধাপে কমিশন দিয়ে এসব অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি প্রকল্পের বরাদ্দ থেকে পিআইও অফিসে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমিশন দিতে হয়। তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই কমিশনের ভাগ নেন। এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ দিতে হয়। কাজ পরিদর্শন ও ভুয়া মাষ্টাররোল তৈরিতে পিআইও অফিসের কর্মচারীকে ৪ থেকে ৫ শতাংশ দিতে হয়।

উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সদস্য সচিব সাইফুল ইসলাম বলেন, তদারকি প্রতিষ্ঠান কমিশন বাণিজ্য করে কাজের বিল ছাড় দেওয়ায় কাজের মান বজায় থাকছে না। বিগত স্বৈরাচার সরকারের আমলের মতোই এখনো জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসন মিলে বরাদ্দ লুটপাট করা হচ্ছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের কাবিখার আওতাধীন সকল চাল ও গম স্ব স্ব প্রকল্পের সভাপতিগণ উত্তোলন করেছেন বলে কয়রা উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ রুহুল আমিন জানান।

সদ্য বিদায়ি প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোঃ মামুনুর রশিদ বলেন, কয়েকটি প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় তাদের অর্ধেক বিল ইউএনও স্যারের নামে পে-অর্ডার করা রয়েছে।

সদ্য যোগদানকৃত কয়রা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল জাবির বলেন, সরকারি বিধি মোতাবেক পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন, অনিমের তথ্য আমার জানা নেই। যে-সব প্রকল্পের কাজ বাকি রয়েছে সেগুলোর সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

খুলনা জেলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল করিম বলেন, ইউএনও এবং পিআইও সাহেবের বদলির ফলে একটু সমস্যা হয়েছে। নতুন পিআইও সাহেব যোগদান করেছে। বাকি কাজ সম্পন্ন করে নেওয়ার জন্য তাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন