বুধবার । ১৪ই জানুয়ারি, ২০২৬ । ৩০শে পৌষ, ১৪৩২
প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, মাদক সিন্ডিকেটের অপ্রতিরোধ্য দৌরাত্ম্য

খুনোখুনি-আতঙ্কে খুলনাবাসীর বছর পার

জাহাঙ্গীর আলম

২০২৫ সাল জুড়ে খুলনা ছিল আতঙ্কের নগরী। নগরী ও জেলা এলাকায় হত্যা হয়েছে ৮৩ টি। এর মধ্যে নগরীতে ৩৬ ও জেলা এলাকায় ৪৬টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। নদী থেকে লাশ উদ্ধার হয়েছে কমপক্ষে দেড় শতাধিক। প্রকাশ্যে আদালত চত্বরে জোড়া খুন, একই পরিবারে ৩ জন হত্যাসহ বেশ কয়েকটি আলোচিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বছর জুড়ে ছিল প্রকাশ্যে সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের মহড়া, মাদক সিন্ডিকেটের অপ্রতিরোধ্য দৌরাত্ম্য।

আলোচিত হত্যাকাণ্ডের মধ্যে গত ১১ জুলাই দিন দুপুরে দৌলতপুর মহেশ্বরপাশা পশ্চিমপাড়ায় বাড়ির সামনে গুলি করে এবং পায়ের রগ কেটে হত্যা করা হয় সাবেক যুবদল নেতা মাহাবুবুর রহমান মোল্লাকে। ৩০ নভেম্বর আদালত চত্বরের সামনে বেলা সাড়ে ১২টায় গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় হাসিব হাওলাদার ও ফজলে রাব্বি রাজন নামে দু’জনকে। তারা একটি মামলায় হাজিরা দিয়ে বের হওয়ার সময় এ হত্যার ঘটনা ঘটে।

এর আগে ১৭ নভেম্বর ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের মুক্তা কমিশনারের বাড়ির সামনে কালভার্টের পাশে বৃদ্ধা মহিদুন্নেছা এবং তার দু’নাতি ফাতিহা ও মুস্তাকিমকে হত্যা করা হয়। একই দিন সোনাডাঙ্গা করিমনগরে ঘরের মধ্যে ঢুকে গুলি করে ও গলা কেটে হত্যা করা হয় আলাউদ্দিন মৃধা নামে এক যুবককে। গেল ১৮ ডিসেম্বর আড়ংঘাটা থানার শলুয়া বাজারে সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে ইমদাদুল হক মিলন নামে এক সাংবাদিককে। এছাড়া গত ১৪ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে জেলার রূপসা উপজেলার খানজাহান আলী সেতুর অদূরে গুলি করে যশোরের শীর্ষ সন্ত্রাসী সাগরকে হত্যা করা হয়।

পুলিশের তথ্য বলছে বছরের শুরু থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত নগরীতে খুনের ঘটনায় ৩৬টি মামলা হয়েছে। এসব হত্যার নেপথ্যে ১৪টি কারণ শনাক্ত করেছে পুলিশ। এর মধ্যে ২৩টি মামলার রহস্য উন্মোচন হয়েছে। কিন্তু ১৩টি মামলার রহস্য এখনও উদ্ঘাটন করতে পারেনি। সেগুলোর কারণ খুঁজছে পুলিশ।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার (মিডিয়া) ত ম রোকনুজ্জামান বলেন, “২০২৫ সালে ৩৬টি খুনের মামলার মধ্যে মাদকের আধিপত্য বিস্তার ও সন্ত্রাসী গ্রুপের দৌরাত্ম্য দেখাতে ১৩টি হত্যার ঘটনা ঘটে। ইজিবাইক চুরির উদ্দেশ্যে ঘটেছে দু’টি, পরকীয়ার কারণে ঘটেছে দুটি, জমি নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে ঘটেছে একটি, জমির ব্যবসায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ঘটেছে একটি, চোরাই স্বর্ণের চেইন বিক্রয়ের টাকা ভাগাভাগি নিয়ে ঘটেছে একটি, টিসিবির লাইনে দাঁড়ানোকে কেন্দ্র করে ঘটেছে একটি, পারিবারিক কলহের কারণে ঘটেছে ছয়টি, ব্যাবসার টাকা লেনদেন নিয়ে ঘটেছে দুটি, প্রেমঘটিত কারণে দুটি, চুরির উদ্দেশ্যে ঘরে ঢুকে হত্যার ঘটনা একটি, বন্ধু কর্তৃক হত্যা হয়েছে একটি, দুই পক্ষের মারামারি ঠেকাতে গিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে একটি, অজ্ঞাত কারণে হত্যা হয়েছে দুটি। বাকি হত্যাগুলোর রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা করছে পুলিশ।”

ত ম রোকনুজ্জামান আরও জানান, “২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে দুটি, ফেব্রুয়ারিতে একটি, মার্চে একটি, এপ্রিলে তিনটি, মে মাসে পাঁচটি, জুনে তিনটি, জুলাইয়ে দুটি, আগস্টে পাঁচটি, সেপ্টেম্বরে একটি, অক্টোবরে পাঁচটি, নভেম্বরে পাঁচটি ও ডিসেম্বরের তিনটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে সদর থানায় ১০টি, সোনাডাঙ্গা থানায় নয়টি, লবণচরা থানায় পাঁচটি, হরিণটানা থানায় চারটি, খালিশপুর ও দৌলতপুর থানায় তিনটি করে এবং আড়ংঘাটা থানায় দুটি হত্যা মামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।” তিনি বলেন, “খুলনার অপরাধ জগৎ একাধিক উপদলে বিভক্ত।”

অপরদিকে জেলা পুলিশের তথ্য মোতাবেক ৯ উপজেলা এলাকায় সংঘটিত ৪৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটে। এরমধ্যে জানুয়ারীতে তিনটি, ফেব্রুয়ারিতে একটি, মার্চে পাঁচটি, এপ্রিলে ছয়টি, মে’-তে পাঁচটি, জুনে ছয়টি, আগস্টে ছয়টি, সেপ্টেম্বরে পাঁচটি, অক্টোবরে আটটি, নভেম্বরে একটি ও ডিসেম্বরে একটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। সূত্রমতে গেলো বছর রূপসায় ১৩টি, তেরখাদায় দুটি, দিঘলিয়ায় তিনটি, ফুলতলায় সাতটি, ডুমুরিয়ায় ৭টি, বটিয়াঘাটায় চারটি, দাকোপে ছয়টি, পাইকগাছায় একটি ও কয়রায় তিনটি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, “এ বছরের সবচেয়ে আলোচিত হত্যাকাণ্ড ছিল খুলনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রধান ফটকের সামনে দুই শীর্ষ অপরাধী হাসিব হাওলাদার এবং ফজলে রাব্বি রাজন হত্যা। গত ৩০ নভেম্বরের এ ঘটনার তদন্ত করছে পুলিশ।”

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, “গত ২৮ নভেম্বর খুলনা কারাগার থেকে মুক্তি পায় শীর্ষ চরমপন্থী দলের দুই প্রধান নাসিমুন গণি ওরফে নাসিম এবং আরমান ওরফে আরমিন শেখ। দৌলতপুরের আরেক সন্ত্রাসী এক সময়ের আতঙ্কের নাম টাইগার খোকন। তার হত্যা মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি নাসিম ও আরমান হাইকোর্টের জামিন নিয়ে জেল থেকে বের হয়ে আত্মগোপনে রয়েছে। ফলে খুলনার আন্ডারওয়ার্ল্ডে নতুন আরও একটি সন্ত্রাসী বাহিনীর কর্তৃত্ব শুরু হয়েছে। বর্তমানে খুলনা শহরে বাহিনীর সংখ্যা বেড়ে সাতটিতে দাঁড়িয়েছে।”

এসব ঘটনায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। খুলনার কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে দুই শীর্ষ চরমপন্থী নেতা নাসিমুল গণি ওরফে নাসিম এবং আরমান শেখ ওরফে আরমিন হাইকোর্ট থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার দু’দিন পরই আদালত পাড়ায় হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। উভয়ই দৌলতপুর-ভিত্তিক অপরাধী ‘টাইগার খোকন’ হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত। ঘটনার পর থেকে তারা আত্মগোপনে রয়েছেন। মূলত তাদের মুক্তির কারণে খুলনার অপরাধ জগতে অস্থিরতা তীব্র হয়েছে। খুলনায় বর্তমানে সাতটি বড় অপরাধী গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী চরমপন্থী এবং অপরাধী গোষ্ঠীগুলো আধিপত্যের লড়াইয়ের অংশ হিসেবে আরও আক্রমণ চালাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পুলিশ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।”

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাব-৬-এর সিও লে. কর্নেল নিস্তার আহমেদ বলেন, “আদালত এলাকায় জোড়া হত্যা মিশনে সাত সদস্যের টিম ছিল। গ্রেপ্তারকৃত এজাজুল হোসেন ছিল মূল আক্রমণকারী। ঘটনাটি সংগঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে র‌্যাব ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে। বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ ও মোবাইলে ধারণকৃত ভিডিও সংগ্রহ করা হয়। গত ১৭ ডিসেম্বর হত্যায় সরাসরি সম্পৃক্ত এজাজুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। হত্যায় জড়িত থাকার বিষয়ে স্বীকারোক্তিও দিয়েছে সে। মূলত খুলনা মহানগরীতে দুটি সন্ত্রাসী দলের মাঝে কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ঘটনাটি ঘটেছে।”

এছাড়া তিনি বলেন, “জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা মোতালেব শিকদার হত্যাচেষ্টায় সুটার ঢাকাইয়া শামীম ও মাহাদিনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।” তারাও একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের সদস্য বলে তিনি জানান।

এদিকে পুলিশ বলছে জেলার মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থা রূপসা উপজেলায়। সেখানে গত এক বছরে ১৩টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। বেশিরভাগই গুলিতে খুন হয়েছে।

পুলিশ ও সংশ্লিষ্টরা খুনোখুনি বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পর নগরীর অনেক কুখ্যাত সন্ত্রাসীর জামিনে বেরিয়ে আসার কথা বলছেন। এসব অপরাধী এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া। এতে চাঁদাবাজিসহ অন্যান্য স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব বাড়ছে। হাতে থাকা অবৈধ অস্ত্র পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলছে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।

পুলিশের বর্তমান ও সাবেক একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, “আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সোর্সকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের ‘সোর্স মানি’ যথাসময়ে দিতে হবে। পুলিশের মনোবল ফিরিয়ে আনা ও তাদের স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। সন্ত্রাসীদের পেছনে কোনো রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় থাকলে তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। অন্যান্য বাহিনীকেও সক্রিয় হতে হবে।”

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তানভীর আহমেদ সোহেল মনে করেন, “পারিবারিক নৈতিকতা এবং সামাজিক অনুশাসনের অভাব সমাজে সহিংসতা বাড়িয়ে তুলছে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নজরদারির ঘাটতিও একটি বড় সমস্যা।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন