একশ তেরো বছর পর খুলনা জেলা কারাগারের বন্দিরা এই প্রথমবারের মতো ভোটদানের সুযোগ পাচ্ছে। বন্দিদের মধ্যে মাত্র ১৪ শতাংশ ভোট দিতে আগ্রহ দেখিয়েছে। আর ৮৬ শতাংশ বন্দি ভোটদানে আগ্রহ প্রকাশ করেননি। রাজনৈতিক কারণে অধিকাংশ বন্দি নির্বাচনকে নেতিবাচক হিসেবে দেখায় ভোটদানে বিরত থাকবে। কারাগার স্থাপনের পর ভারত ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম অনুষ্ঠিত হয়। দুটি পতাকার পরিবর্তন হয়েছে। সেই ব্রিটিশ জামানার সাব জেলের রীতিনীতির মধ্যে ভোটদানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়া জেল জীবনের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
অজিত কুমার নাগ রচিত ‘স্বাধীনতার সংগ্রামে খুলনা’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯০৫-১১ এখানে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন তীব্র হয়। কেন্দ্র বিন্দু ছিল তৎকালীন দৌলতপুর হিন্দু একাডেমী (বর্তমান বিএল কলেজ)। যশোরের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সংগঠক যতীন্দ্র নাথ মুখার্জী ওরফে বাঘা যতীন ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রাম তীব্র করেন। এ সময় খুলনা গণ-অভ্যুত্থানের সৃষ্টি হয়। আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্তরা হচ্ছেন অধ্যক্ষ কামাখ্যা বরণ নাগ, হরিদাশ মুখার্জী, তারক নাথ চ্যাটার্জী, বেনীভূষণ রায়, জিলা স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র ইন্দু ভূষণ মজুমদার, বেনী ভূষণ রায়, সেনহাটির শহীদ অনুজা চরণ সেন, ডুমুরিয়ার শোভনার শহীদ চারু চন্দ্র বসু প্রমুখ। যশোরের মুড়লী থানা ও খুলনা থানা থেকে বন্দি আলীপুর কারাগারে পাঠানো দুঃসাধ্য এবং স্বজনদের দেখাশোনায় বিড়ম্বনা পোহাতে হত।
১৯০৯ সালে ভারতের আলীপুর কারাগারে চারুচন্দ্র বসুর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর এবং সে জেলে বন্দি ধারণ ক্ষমতা বাইরে যাওয়ায়, খুলনায় কারাগার স্থাপনের প্রয়োজন হয়। ভৈরব নদের তীরে ১৯১২ সালে জেলা কারাগার স্থাপন হয়। তখন ভারতবর্ষের শাসনভারের ক্ষমতায় ছিল ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের ওপর। এ সময় কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও কমিউনিস্ট পার্টি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে তৎপর ছিল। এখানে কারাগার স্থাপনের পর ১৯৪৬, ১৯৫৪, ১৯৬৫, ১৯৭০, ১৯৭৩, ১৯৭৯, ১৯৮৬, ১৯৮৮, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এসব নির্বাচনে জেলা কারাগারের বন্দিরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এই প্রথমবার বন্দিরা ভোট দানের সুযোগ পাচ্ছে।
কারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যের মতে, দু’কারাগার মিলে গতকাল পর্যন্ত ১ হাজার ২৩৬ জন বন্দি রয়েছে। এর মধ্যে ১৭৮ জন ভোটদানে রাজি হয়েছে। মোট বন্দিদের মধ্যে দু’জন ভারতীয় নাগরিক, পাঁচজন জঙ্গি, চল্লিশজন মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত, পাঁচশ কয়েদি, বাকিরা হাজতি।
জেল সুপার মোঃ নাসির উদ্দিন প্রধান প্রসঙ্গ নিয়ে বলেন, “বন্দিরা খুলনা, চুয়াডাঙ্গা, নড়াইল, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, মাগুরা, সাতক্ষীরা, যশোর ও গোপালগঞ্জের অধিবাসী। বন্দিদের ভোট দানে প্রাথমিক কার্যক্রম চলছে। সুপার, জেলার, ডেপুটি জেলারসহ ৩২২ কর্মকর্তা-কর্মচারী ভোট দানের জন্য নিবন্ধন ৩০ তারিখ পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।”
সুপার তথ্য দিয়েছেন, ‘তিনি নারায়ণগঞ্জ সদর আসনের ভোটার, নানা জটিলতায় এখনও ভোট দানে নিজের নাম নিবন্ধন করতে পারেননি।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র তথ্য দিয়েছেন, ‘বন্দিদের বড় একটি অংশের জাতীয় পরিচয়পত্র নেই এবং অনেকেরই ধারণা জাতীয় নির্বাচনের আগে জামিন পাবে। এসব কারণে তারা ভোটদান থেকে বিরত থাকবে। এ সূত্রের ধারণা, নানা মতাদর্শে বিশ^াসী অনেক বন্দি এ নির্বাচনের প্রতি আগ্রহী নয়। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে সংশ্লিষ্ট বন্দিরা ভোটদানে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। সংখ্যাগরিষ্ঠদের ভোটদান থেকে বিরত থাকতে রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রাধান্য পাচ্ছে।’
খুলনা গেজেট/এনএম
