দেশের অন্যতম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট)’র সংযোগ সড়কের উন্নয়ন কাজ দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। দু’দফা সময় বাড়িয়ে গত তিন বছরেরও কাজ শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাহবুব ব্রাদার্স (প্রাঃ) লিঃ। প্রতিদিন গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কে চলাচলকারী বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সাধারণ পথচারীদের সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। কাজের ১৮ লাখ টাকা বিল না পাওয়ায় কাজ শুরু করতে পারছে না বলে দাবি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানুয়ারীতে ভর্তি পরীক্ষার আগেই উন্নয়ন কাজ শেষ দেখতে চাই।
জানা যায়, সড়কটির ৬০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। খুলনা-যশোর মহাসড়কের ফুলবাড়িগেট হতে কুয়েট মেইনগেট হয়ে গভঃ ল্যাবরেটরি হাইস্কুল পর্যন্ত রাস্তা প্রশস্তকরণ, ড্রেন ও ফুটপাত নির্মাণের কাজ শুরু হয় ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে। খুলনা সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক দ্বিতীয় নগর অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সড়কটির আধুনিকায়নের কাজ হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার ও (জিওবি) এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) প্রকল্পে অর্থ সহায়তা করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কার্যাদেশ অনুযায়ী সড়কটির আধুনিকায়নের কাজ ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। দু’দফা সময় বাড়ানোর পর মাত্র এক হাজার ১৮৮ মিটার সড়কের আধুনিকায়নের কাজ তিন বছরেও শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দেড় বছর পূর্বে সমতল সড়কের কিছু কিছু অংশ ভেকু দিয়ে খুঁড়ে রাখে। এর ফলে যানবাহনের চালক এবং পথচারীদের চলাচলে দুর্ভোগ বেড়ে যায়।
ভাঙাচোরা, উঁচু-নিচু, অসমতল সড়ক দিয়ে যাতায়াতে প্রতিনিয়ত মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ হচ্ছে। বৃষ্টি হলে দুর্ভোগের মাত্রা দ্বিগুণ পরিমাণে বেড়ে যায়। বর্তমানে সড়কটির কাজ বন্ধ রয়েছে। টানা তিন বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতের প্রধানতম এবং একমাত্র সড়কটির উন্নয়ন কাজের এ দীর্ঘসূত্রিতায় বিভিন্ন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাতে কর্ণপাত করেনি। দ্রুত কাজ সম্পন্ন করার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তাগিদও কাজে আসছে বলে অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী এবিএম মামুনুর রশিদের।
সড়কটির এ দুরবস্থার কারণে আড়াই শতাধিক ইজিবাইক, ভ্যান এবং রিকশাচালকের রুটি রুজির উপর আঘাত হানছে। যারা প্রতিদিন ফুলবাড়িগেট থেকে কুয়েট সংযোগ সড়ক এবং পাঁকার মাথা হয়ে তেলিগাতী বাইপাস বরইতলা ঘাট পর্যন্ত যাত্রী এবং মালপত্র পরিবহন করে থাকে।

কুয়েটের ৭ সহস্রাধিক শিক্ষার্থী, ১১ শতাধিক শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের যাতায়াত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহণগুলো চলাচলের একমাত্র সড়ক এটি। এছাড়া সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন গভঃ ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের ১১ শতাধিক, প্রতিভা প্রি-ক্যাডেট স্কুল ও মিজান একাডেমি ৬ শতাধিক, খুলনা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সহস্রাধিক, খুলনা মহিলা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সাড়ে তিন শতাধিক, উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের দু’শতাধিক, খুলনা সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজের পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী, প্রশিক্ষক, অভিভাবক, প্রশিক্ষণার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা কর্মচারী, বিএড, এমএড, মাস্টার্সের শিক্ষার্থীরা যাতায়াত করে থাকে। ডুমুরিয়া উপজেলার শলুয়া রংপুর এবং তেলিগাতী এলাকার ৫ সহস্রাধিক মানুষের জীবন-জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন সড়ক দিয়ে যাতায়াত করতে হয়। এছাড়া সড়কটির দু’পাশে অসংখ্য ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং দোকানপাট রয়েছে।
সড়কটির ফুলবাড়িগেট হতে তেলিগাতী পাঁকারমাথা পর্যন্ত দুরবস্থার কারণে প্রতিদিন ৫ শতাধিক যানবাহনসহ, ১৫ সহস্রাধিক মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে। সড়কের দুরবস্থার কারণে মাতৃত্বকালীন কোনো মহিলা সড়কটি দিয়ে যাতায়াত করতে পারছে না।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা যায়, ১৮ লাখ টাকার বিল বাকি। একাধিক বার আবেদন করলেও কর্তৃপক্ষ বিল পরিশোধ করছে না। সর্বশেষ ২০২৪ সালে তারা বিল পেয়েছিল। চলতি বছর কাজের কোন বিল পাইনি। কাজটি দ্রুত শেষ করার লক্ষ্যে গত সপ্তাহে তারা চার কোটি টাকার বিল সাবমিট করলেও সাড়া মিলছে না।
কাজের ধীরগতি সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাকসুদ হেলালী খুলনা গেজেটকে বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান সড়কের সংস্কার কাজে এমন দীর্ঘসূত্রিতা খুবই দুঃখজনক। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং কাজের বাস্তবায়নকারী সংস্থা খুলনা সিটি কর্পোরেশনকে বারবার তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও গত প্রায় তিন বছরে সড়কটির উন্নয়ন কাজ শেষ হয়নি। কাজের সর্বশেষ কী অবস্থায়, সেটি জানার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলীকে সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলীকে আলাপ করতে বলেছি। আমরা চাই জানুয়ারিতে ভর্তি পরীক্ষার আগেই সড়কের উন্নয়ন কাজ শেষ হোক।”
কেসিসি’র নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আনিচুজ্জামান বলেন, “ঠিকাদারকে ডাকা হয়েছে তিনি বারবার বলছে কাজ শুরু করব। কিন্তু কাজ শুরু করছেন না। যেহেতু তিনি ডিফল্টার সে কারণে প্রশাসক মহোদয় তাকে পেমেন্ট দিতে রাজি নন। ডিফল্টার হওয়ার কারণে কাজ শুরু না করলে পেমেন্ট দেওয়ার ব্যাপারে তার ওপর আস্থা রাখা যাচ্ছে না। কাজটা নিয়ে আমরা পড়েছি ঝামেলায়। না পারছি ঠিকাদারকে দিয়ে কাজ করাতে, না পারছি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। সর্বশেষ তারা চলতি সপ্তাহে কাজ শুরু করার কমিটমেন্ট দিয়েছে। কমিটমেন্ট অনুযায়ী কাজ শুরু না করলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
খুলনা গেজেট/এনএম

