ডুমুরিয়ার শরাফপুর ইউপি চেয়ারম্যান শেখ রবিউল ইসলাম রবি হত্যার এক বছর পার হয়েছে। দীর্ঘ একবছরেও হত্যার পরিকল্পনাকারী, অর্থ যোগানদাতা ও খুনিদের সনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ। মামলার তদন্তেও কোন অগ্রগতি নেই। গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। পুলিশের ভূমিকায় হতাশ হয়ে পড়েছে রবির পরিবারের সদস্য ও সমর্থকরা।
গত বছর ৬ জুলাই উপজেলার গুটুদিয়ার ওয়াপদার মাথা নামক স্থানে সন্ত্রাসীদের গুলিতে খুন হন জনপ্রিয় ইউপি চেয়ারম্যান রবি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় টানা তিন বার আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে চেয়ারম্যান হন তিনি। হত্যাকান্ডের পরদিন নিহতের স্ত্রী শায়লা ইরিন বাদি হয়ে ৭ জনকে আসামি করে মামলা করেন। এর মধ্যে প্রধান আসামি করা হয় রবির নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী কে এম ওবায়দুল্লাহকে।
ওই সময় হত্যা মামলা থেকে প্রকৃত খুনীদের আড়াল করার অভিযোগ ওঠে। মামলায় আরও আসামি করা হয় ওয়ালী উল্লাহ অলি, মোঃ আল মামুন সানা, মোঃ রফিক শেখ, আবাসন ব্যবসায়ী জেলা আওয়ামী লীগের নেতা আজগর বিশ্বাস তারা, আল আমিন শেখ ও আল ফুরকান খানকে। পুলিশ প্রত্যেককেই গ্রেপ্তার করে। একপর্যায়ে সবাই জামিনে মুক্তি পান।
জনপ্রিয় চেয়ারম্যান ছিলেন রবি
২০১১ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন শেখ রবিউল ইসলাম রবি। পরাজিত করেন প্রতাপশালী নেতা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ নূর উদ্দীন আল মাসুদকে। তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী ছিলেন। পরে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। সরাসরি নৌকা প্রতীকের বিপক্ষে ২০১৬ ও ২০২১ সালেও তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এর মধ্যে এলাকায় বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। বরাবরই তিনি মৎস্য ঘের ব্যবসার সাথে যুক্ত ছিলেন।
ডুমুরিয়া শহীদ জোবায়েদ আলী মিলনায়তনে উপজেলা আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভা ছিল ২০২৪ সালের ৬ জুলাই বিকেলে। ওই সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালিন ভূমিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ। সভা শেষ হয় সন্ধ্যা ৭ টায়। ডুুমুরিয়া বাসস্ট্যান্ডে মিঠুর চায়ের দোকানে সকলের সাথে চা পান শেষে রাত সাড়ে ৮ টায় খুলনা বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দেন চেয়ারম্যান রবি। নিজ মটর সাইকেল চালিয়ে একাই যাচ্ছিলেন। খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের গুটুদিয়া ওয়াপদার মাথা নামক স্থানে পেঁৗঁছালে খুনিরা তাকে গুলি করে হত্যা করে। সব গুলিই তার পিঠে বিদ্ধ হয়।
হত্যার সময় অতিমাত্রায় পুলিশ কর্তাদের গাফিলতি, দলীয় শীর্ষ দু’নেতার মামলার মোটিভ পাল্টানোয় সরাসরি প্রভাব বিস্তার ও স্বতন্ত্র কোন সংস্থা দিয়ে তদন্ত না করায় মামলাটি অন্ধকারে রয়ে গেছে। এমনটাই দাবি স্বজন ও এলাকাবাসীর।
ঘটনার সময় তৎকালনি ওসি সুকান্ত সাহা ও এসপি মোঃ সাইদুর রহমান সাবেক ভূমিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দের ডুমুরিয়াস্থ বাড়িতে ছিলেন। খবর পেয়ে ওসি প্রথমে ঘটনাস্থলে না যেয়ে হাসপাতালে যান। পরে উর্ধ্বতন পুলিশ কর্তাদের সাথে ঘটনাস্থলে যান। স্বজনদের দাবি ওসি সুকান্ত সাহা অতিমাত্রায় মন্ত্রীর তেলবাজি করতেন। প্রায়ই তিনি তার সাথে সেলফি তুলতেন। ছিলেন অত্যন্ত বাচাল। তার গাফিলতির কারণে ওই সময় খুনিদের সনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। পরে এ মামলায় তেমন কোনো অগ্রগতিও নেই।
তবে স্বজনদের দাবি, খুনিরা ভাড়াটে। কিন্তু পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতা হচ্ছে ডুমুরিয়ার। তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব যাদের সাথে তারাই এ হত্যার সাথে জড়িত। আওয়ামী লীগের দু’শীর্ষ নেতা এ হত্যা সম্পর্কে অবগত। এক নেতার আপন চাচাতো ভাই ডুমুরিয়ার এক ইউপি চেয়ারম্যানের সাথে রবির ঝগড়া ছিল। তাছাড়া গবাদি পশুর প্রকল্পে শীর্ষ এক নেতা রবিকে অল্প সুদে মোটা অংকের ব্যাংক লোন করতে সহযোগিতা করেন। বিনিময়ে ওই টাকার অর্ধেক তিনি রবির কাছ থেকে নগদে নেন। কিন্তু ৪/৫ বছর পার হলেও শীর্ষ ওই নেতা টাকা না দেওয়ায় রবি টাকার জন্য চাপ দিতে থাকেন। ফলে শীর্ষ ওই নেতা ভেতরে ভেতরে রবির ওপর বিরক্ত ছিলেন। ওই নেতার মাধ্যমে অপর শীর্ষ নেতা এবং তার চাচাতো ভাই পরিকল্পনা করে ভাড়াটে খুনি দিয়ে হত্যা করতে পারে বলে স্বজনদের দাবি। স্বজনদের কেউ কেউ বলছেন ভাড়াটে খুনি প্রতিবেশি দেশ ভারত থেকে আসতে পারে। খুন করে নির্বিঘ্নে তারা ওই নেতার সহযোগিতায় ভারতে পালিয়ে গেছে। স্বজনদের অপর পক্ষের দাবি খুনের নেপথ্যে মাছের হ্যাচারী নিয়ে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব থাকতে পারে।
ডুমুরিয়া থানার ওসি মোঃ মাসুদ রানা খুলনা গেজেটকে বলেন, “মামলার শুরুতে পুলিশের কর্মকান্ড দুর্বল ছিল। গত এক বছরে অধিকাংশ ঘটনা উৎঘাটন করেছি, কিন্তু রবির ব্যাপারে আমরা কোন ক্লু এখনও পাইনি।”
তবে অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে পুলিশী গাফিলতির কারণে অধিকাংশ খুনের মোটিভ উদ্ধার হয় না। চেয়ারম্যান রবি হত্যা মামলাও তেমনি। তাদের মতে সিআইডি বা পিবিআই বা অন্য কোন সংস্থা দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করলে রবি হত্যার মোটিভ উৎঘাটন সম্ভব।
খুলনা গেজেট/এনএম