পানিবন্দি মানুষের দুঃখের সীমা নেই। প্রায় দু’মাস পানিবন্দী অবস্থায় চরম দূর্বিসহ জীবন যাপন কাটছে তাদের। কিন্তু কেউ তাদের খোঁজ নিচ্ছে না। রাস্তায় হাটু পানি, উঠানে কোমর পানি, রান্নার জায়গা নেই, জ্বালানি কাঠও নেই। এক সকালের রান্না পরের দিন সকাল পর্যন্ত খায়। নৌকা-ডিঙিতে চড়ে বিলের মধ্যে মলমূত্র ত্যাগ করেন তারা। মেঘ দেখলেই আসে ভয়, না জানি এবার কি হয়! গতকাল মঙ্গলবার পানিবন্দী বারানসি গ্রামের চন্দ্রকান্ত মন্ডল কথাগুলো বলেছেন।
প্রায় দুই মাস পানিবন্দী অবস্থায় পড়ে আছে ডুমুরিয়ার মানুষ। শৈলমারী রেগুলেটরে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ২টি পাম্প দিয়ে পানি নিষ্কাশন হলেও পানি কমেনি একটুও। বরং ক্রমন্বয় আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। রাস্তাঘাট, বসতবাড়ি, মাছের ঘের, সবজি ক্ষেত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সবই তাদের পানির নিচে। এ পরিস্থিতির মধ্যে দুর্বিসহ জীবন যাবন চলছে লাখো মানুষের। কর্মসংস্থান বন্ধ হয়ে পড়ায় অনেক পরিবার খাদ্য সংকটে পড়েছে। যদিও যৎসামান্য সরকারি জিআর চাল বিতরণ করা হচ্ছে, তাও পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ আছে।
জানা যায়, ডুমুরিয়া উপজেলার রংপুর, রঘুনাথপুর, ধামালিয়া, মাগুরাঘোনা, খর্ণিয়া, আটলিয়া, গুটুদিয়া ও ডুমুরিয়া ইউনিয়নের ৪০ টি গ্রামের প্রায় ৩০ হাজার পরিবার পানিবন্দী রয়েছে। দেড় মাসের বেশি সময় ধরে পানিমগ্ন অবস্থায় অসহায় মানবেতর জীবন যাবন করতে হচ্ছে তাদের। এ বছর ১০ জুলাই ভারি বৃষ্টির পর থেকে জলাবদ্ধতা শুরু হয়।
পানিবন্দী গ্রামগুলো হলো, মুজারঘুটা, বারানসি, সাড়াভিটা, বটবেড়া, কৃষ্ণনগর, দেড়লি, বশিরাবাদ, আন্দুলিয়া, কোমরাইল, চেচুড়ি, কাটেঙ্গা, টোলনা, বরুনা, গজেন্দ্রপুর, রুপরামপুর, রামকৃষ্ণপুর, শান্তিনগর, ঘোনা, বিলপাটিয়ালা, মাধবকাটি, মান্দ্রা, ময়নাপুর, বিলসিংগা, রানাই, পাঁচপোতা, ঘোষড়া, বাদুড়িয়া, আলাদিপুর, আটলিয়া, বয়ারশিং, আধারমানিক, খড়িয়া, কোমলপুর, গুটুদিয়া, পাটকেলপোতা, মির্জাপুর, হাজিডাঙ্গা, গোলনা, খলসী, সাজিয়াড়া ও আরাজি ডুমুরিয়া। পানি নিষ্কাশনের সু-ব্যবস্থা না থাকার কারণে গত ৩ বছর যাবত বর্ষা মৌসুমে এসব অঞ্চলে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এবছর আগাম বৃষ্টির কারণে শুরুতেই জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে। অধিকাংশ সরকারি আবাসনগুলো পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
সাজিয়াড়া আবাসনের হালিমা বেগম জানান, ঘরের মধ্যে কোমর পানি। মাচা করে থাকতে হচ্ছে তাদের। আবাসনের ৫৮টি ঘর, সবই পানি নিচে। দুই দিন পরপর রান্না-বান্না হয়। বেশির ভাগই শুকনো খাবার খায় তারা। উপজেলা থেকে কয়দিন আগে চাল-ডাল-তেল দিয়েছে। তাদের খাবারের চেয়ে থাকার জায়গা টা আগে দরকার। পচা পানির দুর্গন্ধ ও বিষাক্ত সাপ-পোকার উপদ্রব বেড়ে গেছে আবাসনে।
রঘুনাথপুর ইউপি চেয়ারম্যান মনোজিত বালা ও রংপুর ইউপি চেয়ারম্যান সমরেশ মন্ডল জানান, শৈলমারী ১০ ভেন্ট রেগুলেটর দিয়ে বিলডাকাতিয়াসহ ডুমুরিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় পানি নিষ্কাশন হয়ে থাকে। ভদ্রা নদীতে পলি ভরাটের কারণে শৈলমারী গেট দিয়ে পানি বের হচ্ছে না। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ২টি সাব-মার্সিবল পাম্প দিয়ে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হলেও আশানুরূপ পানি বের হচ্ছে না। এবছর বৃষ্টির পরিমান অনেক। তাই ক্রমন্বয় বাড়ছে পানি। নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এসএম আবু আব্দুল্লাহ বায়েজিদ জানান, প্লাবিত অঞ্চলের বানভাসী মানুষের মাঝে ৫০ মেট্রিক টন জিআর চাল বিতরণ করা হয়েছে। কিন্তু পানিবন্দী মানুষেরা ত্রাণ চাচ্ছে না। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের দাবী তাদের।
তিনি বলেন, বড় দূর্বিসহ জীবন যাচ্ছে পানিবন্দী মানুষের। তাদের না আছে রান্নার জায়গা, না আছে ঘুমানো বা থাকার জায়গা। সবই পানির নিচে। এমনকি নৌকায় বিলের মধ্যে যেয়ে মলমূত্র ত্যাগ করতে হচ্ছে তাদের।
উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ ইনসাদ ইবনে আমিন জানান, ভারি বর্ষণে প্রায় ১০০ হেক্টর ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। এতে করলা, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, সিম, চিচিঙা, ঝিঙ্গা, শশাসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৯ কোটি টাকার সবজি নষ্ট হয়েছে।
ডসনি উপজেলা মৎস্য অফিসার সোহেল মোঃ জিল্লুর রহমান রিগান জানান, বন্যায় ২’শ হেক্টর জমির প্রায় ৩৫’শ মাছের ঘের ভেসে যায়। এতে প্রায় ৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে চাষীর।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ আল-আমিন জানান, ডুমুরিয়ায় ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিএডিসি ও উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয় একসাথে চেষ্টা চালানো হচ্ছে পানিবন্দী মানুষের মুক্তির জন্য। পানি নিষ্কাশনে বাঁধাপ্রাপ্ত বিলের খালগুলো উন্মুক্ত করা হচ্ছে, সকল গেট দিয়ে পানি বের করা চেষ্টা চলছে। গত সোমবার বিকালে কালিঘাট স্লুইজ গেটের কপাট খুলে দেয়া হয়েছে। যা ময়ুর নদী দিয়ে বের হচ্ছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তিনি আশাবাদী, খুব শীঘ্রই বানভাসী মানুষ স্বাভাবিক জীবন যাত্রায় ফিরে আসবে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড খুলনা বিভাগীয় প্রধান প্রকৌশলী মোঃ আমিনুল ইসলাম জানান, বিলডাকাতিয়াসহ ডুমুরিয়া অঞ্চলের পানি নিষ্কাশনের জন্য শৈলমারী গেটের মুখ থেকে শুরু করে আপার সালতা পর্যন্ত জরুরীভাবে পলি অপসারণের কাজ শুরু করা হয়েছে। দুটি ভাসমান ভেকু ও দুটি লংবুম ভেকু দিয়ে খননের কাজ চলছে। আশাকরি দ্রুত পানি নিষ্কাশন হবে। গত ২২ আগস্ট পানি উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গেছেন।
তিনি বলেন, প্রায় ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দে এ নদী ড্রেজিং, ২৬টি খাল পুনঃখননসহ আরো ৫টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প স্থাপন প্রকল্পটি শিঘ্রই অনুমোদনের পথে। এই কাজ বাস্তবায়ন হলে জলাবদ্ধ নিরসনে স্থায়ী সমাধান হবে।
খুলনা গেজেট/এনএম