গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচাতো ভাইদের কাছে দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর জিম্মি ছিল খুলনার মানুষ। নগরীর শেরে বাংলা সড়কে অবস্থিত তাদের বাসভবন ‘শেখ বাড়ি’ হয়ে ওঠে সকল ক্ষমতার কেন্দ্র বিন্দু। সরকারি দপ্তরের ঠিকদারি নিয়ন্ত্রণ, চাকরিতে নিয়োগ ও বদলি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ক্রীড়াঙ্গনসহ সব কিছু নিয়ন্ত্রণ হতো এই বাড়ি থেকে। আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনগুলো এমনকি পেশাজীবী সংগঠনগুলো চলতো এই বাড়ির নির্দেশনায়। দলের কমিটি করে দিতেন শেখ হাসিনার চাচাতো ভাইয়েরাই।
সাবেক সংসদ সদস্য শেখ হেলাল উদ্দিন, শেখ সালাহ উদ্দিন জুয়েল, শেখ সোহেল, শেখ রুবেল ও শেখ বাবু এই ৫ ভাইয়ের মধ্যে যে যখন বাড়িতে থাকতেন তখন পঙ্গপালের মতো কিছু নেতাকর্মী ছুটে যেতেন তাদের কাছে। তোষামোদি করে হাতিয়ে নিতেন ঠিকাদারি কাজ, ব্যবসাসহ নানা সুবিধা। তাদের বাড়িটি খুলনায় ‘শেখ বাড়ি’ এবং তাদের পরিবার ‘শেখ পরিবার’ নামে পরিচিত পায়।
গত সাড়ে ১৫ বছর বাড়িটি ঘিরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের মধ্যে একটি সুবিধাবাদী গোষ্ঠীও তৈরী হয়। মূলত তারাই শেখ হেলাল, জুয়েল, সোহেল ও বাবুকে পরিচালনা করতেন। ব্যবসায়ীদের ওই বাড়িতে ধরে আনা, দখল, ঠিকাদারি, চাঁদাবাজিসহ অনেকটা লাঠিয়ালের ভূমিকায় ছিলেন তারা। এই লাঠিয়ালদের কাছে দলের নেতারাও ছিলেন কোনঠাসা। এ নিয়ে আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ের ত্যাগী নেতাদের মধ্যে ছিল চাপা অসন্তোষ।
অভ্যুত্থানের এক বছর পর শেখ বাড়ি এখন ধংসস্তুপ। আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেকেই এলাকা ছাড়া। কিন্তু পালিয়ে গিয়েও আরাম আয়েশে দিন কাটাচ্ছেন শেখ বাড়ির সুবিধাভোগীরা। কেউ ভারতে, কেউ দেশে থেকেই বিলাশী জীবন-যাপন করছেন। একাধিক মামলার আসামি হলেও গ্রেপ্তারের মুখোমুখি হননি কেউই। তাদের গ্রেপ্তারে আইন-শৃংখলা বাহিনীর তৎপরতাও কম। বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র-জনতা।
লাঠিয়ালরা কোথায়?
নগরীর শেরে বাংলা রোডে অবস্থিত ‘শেখ বাড়ি’র মালিক শেখ হেলাল উদ্দিন এবং তার ৪ ভাই। হেলাল উদ্দিন ঢাকায় থাকতেন, খুলনায় এলে থাকতেন এই বাড়িতে। তার ভাই সাবেক সংসদ সদস্য শেখ সালাহ উদ্দিন জুয়েল, যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ সোহেল, শেখ রুবেল ও শেখ বাবু কখনও ঢাকায়, কখনও খুলনার বাড়িতে থাকতেন।
শেখ বাড়ির নাম ভাঙিয়ে সুবিধা নেওয়া নেতাদের মধ্যে প্রথম সারিতেই ছিলেন সিদ্দিকুর রহমান বুলু বিশ্বাস। মুসলিম লীগ নেতা আবদুর রহমান টুকু বিশ্বাসের এই ছেলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরপরই শেখ বাড়ির ঘনিষ্ট হয়ে ওঠেন। সাবেক সংসদ সদস্য শেখ সালাহ উদ্দিন জুয়েল এবং কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা শেখ সোহেলসহ ৫ ভাইয়ের সঙ্গে খুবই ঘনিষ্ঠ। নিয়মিত যাতায়াত ছিল শেখ সোহেলদের নগরীর শেরে বাংলা রোডের বাড়িতে। চলাফেরা করতেন শেখ সোহেলের সঙ্গে।
শেখ বাড়ির প্রভাব খাটিয়ে অনেক ত্যাগী নেতাকে পেছনে ফেলে সোনাডাঙ্গা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি হন। এরপর চেম্বার অব কমার্সের সহ-সভাপতি, বাস-মিনিবাস মালিক সমিতি, নিউ মার্কেট দোকান মালিক সমিতি, আখতার চেম্বার দোকান মালিক সমিতিসহ অসংখ্য ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতা বনে যান। শেখ বাড়ির হয়ে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ ও জমি দখলে প্রধান ভূমিকা রাখতেন বুলু বিশ্বাস। এসব করে কোটি কোটি টাকা আয় করেছেন। অভ্যুত্থানের পর তার বিরুদ্ধে ৮টি মামলা হয়েছে। দেশেই রয়েছেন তিনি। বেশ কয়েকবার নূরনগর বাড়ির আশপাশে তাকে দেখা গেছে।
খুলনা সদর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম ছিলেন শেখ বাড়ির আরেক ‘লাঠিয়াল’। এই বাড়িকে কাজে লাগিয়ে সদর থানা আওয়ামী লীগ, জেলা আইনজীবী সমিতি, জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের পদ বাগিয়ে নেন। দীর্ঘদিন নৌ-পরিবহন মালিক গ্রুপের মহাসচিব ও চেম্বার অব কমার্সের সহ-সভাপতি ছিলেন। যে কোনো নির্বাচন আসলেই ঝাপিয়ে পড়তেন তিনি। দু’হাতে টাকা খরচ করতেন।
পরে জানা যায়, এর বেশিরভাগই ছিল বিভিন্ন সংগঠনের আত্মসাত করা টাকা। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তার বিরুদ্ধে নৌ-পরিবহন মালিক গ্রুপের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। জেলা আইনজীবী সমিতির প্রায় ২৫ কোটি টাকার তহবিল আত্মসাতের অভিযোগে একাধিক মামলা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। আরও মামলার প্রস্তুতি চলছে। প্রায় দেড় ডজন ব্যবসায়ী পাওনা টাকার জন্য তার পরিবারের পেছনে ঘুরছেন।
অভ্যুত্থানের পর তিনি সেনা ব্যারাকে আশ্রয় নেন। বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন। প্রায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ঘুরে বেড়ানোর ছবি পোস্ট করেন তিনি। অসংখ্য মামলা হলেও তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী নীরব।
খুলনা মহানগর যুবলীগের নির্বাহী কমিটির সদস্য এস এম হাফিজুর রহমান হাফিজ ছিলেন গল্লামারী এলাকার মূর্তিমান আতঙ্ক। ভূমিদখল, চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি নিয়ন্ত্রণে হাফিজের লাঠিয়ালরা ব্যবহৃত হতো। তিনি ঢাকায় রয়েছেন বলে জানা গেছে। অসংখ্য মামলা হলেও গ্রেপ্তার হননি।
মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক এবং ২৪ নং ওয়ার্ড সাবেক কাউন্সিলর জেডএ মাহমুদ ডন ছিলেন এই বাড়ির আরেক সুবিধাভোগী। তার ছিল নিজের সন্ত্রাসী বাহিনী। গতবছর নগরীর পূর্ব বানিয়াখামার মেইন রোডের বাসিন্দা মোঃ তৌহিদুল ইসলাম খুলনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন, ‘ডনের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা গত ৮ জুলাই তার ভাই আল আমিন শেখকে কুপিয়ে হত্যা করে। তিনি শেখ পরিবারের ক্ষমতাবলে হত্যা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও ভূমিদস্যুতাসহ নানা অপকর্মে জড়িত।’
অভ্যুত্থানের পর ডন কিছুদিন খুলনার পাশর্বর্তী এক জেলায়, কিছুদিন ঢাকায় ছিলেন। বর্তমানে তিনি ভারতে রয়েছেন।
শেখ রুবেলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত শেখ শাহজালাল হোসেন সুজন। রুবেলের সহযোগিতায় মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি থাকা অবস্থায় বাগিয়ে নেন মহানগর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ। এখনও ২ পদে রয়েছেন তিনি। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ দলের নেতাকর্মীরাও। শেখ রুবেলকে ব্যবহার করে বিদ্যুৎ বিভাগ ও গণপূর্ত বিভাগে ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণ করেছেন তিনি। ৪ আগস্ট ছাত্রজনতার গণপিটুনিতে গুরুতর আহত হন সুজন। ঢাকায় নিয়ে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তিনি বর্তমানে ভারতে রয়েছেন।
শেখ সোহেলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে নগরীতে পরিচিতি রয়েছে ২৬ নং ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি শওকত হোসেন, তার ভাই রিপন ও যুবলীগ নেতা মাসুম হোসেন। শওকত ও মাসুম শেখ সোহেলের মাধ্যমে হয়েছেন কোটিপতি। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকাতে লেখা রয়েছে,‘শওকত শেখ সোহেলের নাম ভাঙ্গিয়ে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক ব্যবসা ও অবৈধ অস্ত্রের মাধ্যমে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সাথে জড়িত।’
শেখ সোহেলের বন্ধু খালিশপুরের আওয়ামী লীগ নেতা কাজী ফয়েজ ওই এলাকায় আরেক বলয় গড়ে তোলেন। পুরো খালিশপুর থানা এলাকার সরকারি দপ্তরের ঠিকাদারি, গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের জমি দখল, চাঁদাবাজি ও মাদক সিন্ডিকেট ছিল ফয়েজের নিয়ন্ত্রণে। অভ্যুত্থানের সময় তার অফিসে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ জনতা। তিনি ঢাকায় রয়েছেন। এছাড়া এই বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত ছিল যুবলীগ নেতা হাফেজ মোঃ শামীম, যুবলীগ নেতা কাজী কামাল, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি এম এ নাসিম, সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান রাসেল, ২৩ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়েজুল ইসলাম টিটো, ১৩ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর এসএম খুরশিদ আহম্মেদ টোনা ও তার ভাই মোরশেদ আহম্মেদ মনি, ১০নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর কাজী তালাত হোসেন কাউট ও তার ভাই ওয়ার্ড যুবলীগের সাবেক সভাপতি ইয়াসির আরাফাত হোয়াইট, ২৫ নং ওয়ার্ড সাবেক কাউন্সিলর আলী আকবর টিপু শেখ বাড়ির অন্যতম ‘লাঠিয়াল’ ছিলেন। শুধু এই কয়জনই নয়, সুবিধাভোগীর সংখ্যা আরও বেশি।
তাদের বিরুদ্ধে শেখ বাড়ির নাম ভাঙ্গিয়ে টেন্ডার ও ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, চাকরি, দলের পদ বাগিয়ে নেওয়াসহ বিভিন্ন তদবির বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। শেখ বাড়িতে গিয়ে তোষামোদি ছিল তাদের নিত্য দিনের কাজ।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার জুলফিকার আলী হায়দার জানান, ইতোমধ্যে অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন। বিভিন্ন মামলায় যারা অভিযুক্ত তাদের গ্রেপ্তারে নিয়মিত অভিযান চলছে।
খুলনা গেজেট/এনএম