তীব্র লোডশেডিংয়ের মধ্যেও বন্ধ থাকছে বারবার

রামপাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়ে চিন্তিত সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাগেরহাটের রামপালের বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী বিদ্যুৎ কোম্পানি নিয়ে মহাবিপাকে সরকার। বিপুল অঙ্কের বিদেশি ঋণে নির্মিত কেন্দ্রটি এমন বেহাল হওয়ায় খোদ বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ও সচিব গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

সম্প্রতি বিদ্যুৎ সচিব মিরানা মাহরুখ এক বৈঠকে এর কারণ জানতে চান রামপাল কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রামানাথ পূজারীর কাছে। তিনি বলেন, এভাবে একটি কেন্দ্র চললে সরকারের কোনো ভাবমর্যাদা থাকবে না। কয়েক মাস ধরে সারা দেশে ব্যাপক লোডশেডিং হচ্ছে। এ সময় রামপালের মতো কয়লাভিত্তিক মূলধারার বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু থাকার কথা। কিন্তু এ ক্ষেত্রে রামপাল কেন্দ্র বারবার বন্ধ হয়েছে। ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ১৩২০ মেগাওয়াটের এই বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালুর তিন বছরের মধ্যে মারাত্মক যান্ত্রিক ত্রুটিতে চিন্তায় পড়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। কারণ, এ কেন্দ্রের জন্য ভারতের এক্সিম ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া হয়েছে ১৬০ কোটি ডলার। এখন সেই টাকা শোধ করতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।

রামপাল গত অর্থবছরে রেকর্ড আট হাজার ১২৬ মিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে, যা আগের বছরে ছিল পাঁচ হাজার ৪২৪ মিলিয়ন ইউনিট। রামপাল কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত সব বিদ্যুৎ পিডিবি-বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড কিনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিতরণ করে। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়ে ১৪ টাকার বেশি। অথচ সরকার বিক্রি করে প্রতি ইউনিট ১১ টাকা। বাকি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়। সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, রামপাল কেন্দ্রকে অন্যান্য বেসরকারি কেন্দ্রের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন না করলেও প্রতি মাসে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়। বর্তমানে রামপাল কেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার, হেড অব প্ল্যান্টসহ ১২ ভারতীয় এই কেন্দ্রে কর্মরত আছেন।

এ বছরের ২৪ জানুয়ারি সিএফও এবং মহাব্যবস্থাপকসহ ৯ জন ভারতীয় এই কেন্দ্র থেকে কোনোরকম অনুমতি না নিয়ে ভারত চলে যান। এতে বিপাকে পড়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পরবর্তী সময়ে সরকার তাদের আর গ্রহণ করেনি। পরে অন্য কর্মকর্তাদের পাঠায় ভারতের এনটিপিসি। ৫০-৫০ শতাংশ করে এই কেন্দ্রের মালিকানা হচ্ছে ভারত ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার করপোরেশন এবং বাংলাদেশের পিডিবি।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড-পিডিবি জানিয়েছে, কয়লা এবং গ্যাস সংকটের কারণে স্বাভাবিক সময়ের মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ উৎপাদন হ্রাস। তাই লোডশেডিংয়ের রেকর্ড হচ্ছে। এর আগে গত সপ্তাহে সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু রবিবার বিকেল ৩টায় লোডশেডিং ছিল তিন হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে পিডিবি এবং দেশের সব বিতরণ কোম্পানি। অভিযোগ আছে, অনেক এলাকায় সারাদিন ও রাতে ১০ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকছে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে পিডিবির কর্মকর্তারা বলেন, বিদ্যুতের এমন পরিস্থিতি আগে খুব বেশি হয়নি।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ-পিজিসিবির হিসেব অনুযায়ী, গত রবিবার বিকেল ৩টায় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৫৯ মেগাওয়াট। কিন্তু সরবরাহ হয়েছে মাত্র ১২ হাজার ৩৮৮ মেগাওয়াট। বিকেল ৫টায় এই সরবরাহ কিছুটা বেড়ে ১৩ হাজার মেগাওয়াটে ঠেকেছে। এরপরও লোডশেডিং ছিল দুই হাজার ৯৬৭ মেগাওয়াট।

পিডিবি সূত্রে জানা গেছে, আদানির সরবরাহ হঠাৎ করে অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। পিক আওয়ারে এক হাজার ৬০০ মেগাওয়াট দেওয়া হলেও রবিবার বিকেল ৫টায় দেওয়া হয়েছে ৮১৫ মেগাওয়াট। বৈরী আবহাওয়ার কারণে আদানি কয়লা পরিবহন করতে পারছে না। এ কারণে কয়লার মজুদও কমে গেছে। তাই তারা বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে বলে পিডিবিকে জানিয়েছে। তবে তাদের এ তথ্য কতটুকু সত্য তা যাচাই করতে পারেনি পিডিবি।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন