কাঠামোয় আমূল পরিবর্তন আনল আইসিসি 

বদলে গেল ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফরম্যাট

ক্রীড়া প্রতিবেদক

ব্যবসায়িক দিক থেকে লাভবান হওয়ার আশায় এবং ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে হাই-ভোল্টেজ ম্যাচ ‘ভারত-পাকিস্তান’ দ্বৈরথ আরও বেশি সংখ্যায় আয়োজন করতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফরম্যাটে বড়সড় পরিবর্তন এনেছে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি। শুধু টি-টোয়েন্টিই নয়, ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফরম্যাটেও এই বড় বদল আনা হয়েছে।

বিশ্বকাপকে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ, আকর্ষণীয় এবং অর্থবহ করে তুলতে পুরুষদের দুই বৈশ্বিক টুর্নামেন্টের ফরম্যাটে বড় ধরনের পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। স্কটল্যান্ডের এডিনবরায় অনুষ্ঠিত আইসিসির বার্ষিক বোর্ড সভায় ওয়ানডে বিশ্বকাপ ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের নতুন কাঠামো অনুমোদন করা হয়েছে। একই সঙ্গে ২০২৮ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাছাই প্রক্রিয়া এবং সহযোগী সদস্য দেশগুলোর জন্য নতুন একটি বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট আয়োজনের পরিকল্পনাও অনুমোদন পেয়েছে।

মূলত রাজনৈতিক বৈরিতার কারণে আইসিসি কিংবা এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) টুর্নামেন্ট ছাড়া দ্বিপাক্ষিক সিরিজে মুখোমুখি হয় না ভারত ও পাকিস্তান। ফলে বিরাট কোহলি বনাম বাবর আজমদের এই লড়াই সম্প্রচারস্বত্ব ও বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁসের’ মতো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তান সেভাবে সুবিধা করতে না পারায় নকআউট পর্বে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শেষ হয়ে যায়।

এমন পরিস্থিতিতে টুর্নামেন্টে যেন ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের সংখ্যা আরও বাড়ানো যায়, সেই উদ্দেশ্যেই এই ফরম্যাট বদল। বিবিসি স্পোর্টের বরাতে জানা গেছে, নতুন এই ফরম্যাটে টুর্নামেন্টের মোট ২০টি দলকে ৫টি গ্রুপে বিভক্ত করা হবে, যেখানে প্রতিটি গ্রুপে থাকবে ৪টি করে দল। প্রতি গ্রুপের পয়েন্ট টেবিলের সেরা দুটি দল জায়গা করে নেবে পরবর্তী রাউন্ডে।

আইসিসির পুরোনো নিয়মে দ্বিতীয় রাউন্ডটি ‘সুপার এইট’ নামে পরিচিত হলেও, নতুন নিয়মে এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘সুপার টেন’। ৫টি করে দল নিয়ে গঠন করা হবে দুটি গ্রুপ। প্রতি গ্রুপের শীর্ষ থাকা দুটি দল সরাসরি সেমিফাইনাল খেলার টিকিট পাবে। আর গ্রুপে যারা দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অর্জন করবে, তারা খেলবে এলিমিনেটর রাউন্ড। এলিমিনেটরের জয়ী দল দুটি তৃতীয় ও চতুর্থ দল হিসেবে সেমিফাইনালে পা রাখবে। পরবর্তীতে সেমিফাইনালের জয়ী দুই পরাশক্তিকে নিয়ে অনুষ্ঠিত হবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মেগা ফাইনাল।

বাংলাদেশ ওয়ানডে দল

আইসিসি জানিয়েছে, নতুন ফরম্যাটের মূল লক্ষ্য হলো টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই প্রতিটি ম্যাচের গুরুত্ব বাড়ানো, প্রতিযোগিতার মান আরও উন্নত করা, বড় দল ও উদীয়মান দলগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাড়ানো এবং খেলোয়াড় ও দর্শকদের জন্য আরও রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা তৈরি করা।

অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা আগের মতোই ১৪ থাকছে। তবে টুর্নামেন্টের কাঠামোতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এনেছে আইসিসি। বর্তমান ফরম্যাটে সাতটি করে দুটি গ্রুপে দলগুলো ভাগ হয়ে খেলে। প্রতিটি গ্রুপ থেকে তিনটি করে দল সুপার সিক্সে ওঠে, এরপর সেমিফাইনাল ও ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়।
নতুন ফরম্যাটে টুর্নামেন্ট শুরু হবে একটি নতুন ‘সুপার সিরিজ’ দিয়ে।

প্রথম ধাপ: সুপার সিরিজ

আইসিসি র‍্যাঙ্কিংয়ের ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর দলকে নিয়ে হবে তিন দলের একটি রাউন্ড-রবিন প্রতিযোগিতা। প্রতিটি দল একে অপরের বিপক্ষে খেলবে এবং শীর্ষস্থান অর্জনকারী দল মূল টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় ধাপে জায়গা করে নেবে।

আইসিসির মতে, এর ফলে নিচের সারির দলগুলোকেও মূল পর্বে জায়গা নিশ্চিত করতে শুরু থেকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট খেলতে হবে।

দ্বিতীয় ধাপ: গ্রুপ পর্ব

এরপর ছয়টি করে দল নিয়ে দুটি গ্রুপ হবে। দুই গ্রুপের শীর্ষ তিনটি করে মোট ছয়টি দল সরাসরি সুপার ৭-এ উঠবে। তাদের সঙ্গে যোগ দেবে দুই গ্রুপ মিলিয়ে পরবর্তী সেরা একটি দল।

তৃতীয় ধাপ: সুপার ৭

এই নতুন পর্বে সাতটি দল একে অপরের বিপক্ষে একটি করে ম্যাচ খেলবে। ফলে প্রতিটি দলের সামনে থাকবে ছয়টি করে ম্যাচ। এখান থেকেই নির্ধারিত হবে সেমিফাইনালিস্ট চারটি দল।

সেমিফাইনালে প্রথম দল খেলবে চতুর্থ দলের বিপক্ষে, আর দ্বিতীয় দল খেলবে তৃতীয় দলের বিপক্ষে। এরপর দুই বিজয়ী দল খেলবে ফাইনালে।

এই ফরম্যাটের ফলে টুর্নামেন্টের একেবারে প্রথম ম্যাচ থেকে শেষ পর্যন্ত প্রতিটি ম্যাচের গুরুত্ব থাকবে এবং মাঝপথে অনেক ম্যাচ অর্থহীন হয়ে যাওয়ার সুযোগ কমে যাবে।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দ্বিতীয় পর্বে সুযোগ পাবে আরও বেশি দল

২০২৬ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, নেদারল্যান্ডসসহ কয়েকটি উদীয়মান দলের লড়াকু পারফরম্যান্স আইসিসিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই দ্বিতীয় পর্বে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ৮ থেকে বাড়িয়ে ১০ করা হয়েছে।

নতুন গ্রুপ পর্ব

আগের ফরম্যাটে চারটি গ্রুপে পাঁচটি করে দল ছিল। এখন হবে পাঁচটি গ্রুপ, প্রতিটিতে চারটি করে দল।প্রতিটি গ্রুপ থেকে দুটি করে মোট ১০টি দল উঠবে দ্বিতীয় পর্বে।

সুপার ১০ 

দ্বিতীয় পর্বের নতুন নাম ‘সুপার ১০’। এখানে পাঁচটি করে দল নিয়ে দুটি গ্রুপ হবে। প্রতিটি দল নিজেদের গ্রুপে চারটি করে ম্যাচ খেলবে।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে নকআউটে ওঠার পথে। আগে প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুটি দল সরাসরি সেমিফাইনালে উঠত। নতুন নিয়মে কেবল দুই গ্রুপের শীর্ষ দুটি দল সরাসরি সেমিফাইনালে যাবে।

অন্যদিকে এক গ্রুপের দ্বিতীয় দল অপর গ্রুপের তৃতীয় দলের বিপক্ষে এলিমিনেটর খেলবে। একইভাবে অন্য গ্রুপেও একটি এলিমিনেটর হবে। এই দুই এলিমিনেটরের বিজয়ী দল বাকি দুটি সেমিফাইনাল নিশ্চিত করবে।

২০২৮ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের নতুন বাছাই কাঠামো

আইসিসি ২০২৮ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্যও নতুন যোগ্যতা অর্জনের পথ নির্ধারণ করেছে। বিশেষ পরিস্থিতির বিবেচনায় ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া স্কটল্যান্ড সরাসরি ইউরোপ আঞ্চলিক ফাইনালে খেলবে।

যেসব দল ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলেছে কিন্তু সরাসরি ২০২৮ বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করতে পারেনি, তারা গ্লোবাল কোয়ালিফায়ারে অংশ নেবে। গ্লোবাল কোয়ালিফায়ারের বাকি আটটি দল আসবে আঞ্চলিক বাছাই থেকে— আফ্রিকা: ২ দল, এশিয়া: ২ দল, ইউরোপ: ২ দল, আমেরিকা: ১ দল, পূর্ব এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল: ১ দল।

গ্লোবাল কোয়ালিফায়ার শেষে প্রতিটি অঞ্চলের সর্বোচ্চ স্থান অধিকারী একটি করে দল এবং সামগ্রিকভাবে পরবর্তী তিনটি সেরা দল—আইসিসির নির্ধারিত ন্যূনতম পারফরম্যান্সের শর্ত পূরণ সাপেক্ষে—২০২৮ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে জায়গা করে নেবে।

সহযোগী দেশগুলোর জন্য নতুন বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট

সভায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব অনুমোদন করেছে আইসিসি বোর্ড। সহযোগী সদস্য দেশগুলোর জন্য ১৬ দলের একটি নতুন বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট আয়োজনের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

আইসিসির ডেভেলপমেন্ট কমিটি এবং প্রধান নির্বাহীদের কমিটির সুপারিশে এই টুর্নামেন্টের প্রস্তাব এসেছে। এটি মূলত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগে সহযোগী সদস্য দেশগুলোর জন্য একটি উচ্চমানের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা হিসেবে কাজ করবে, যেখানে তারা নিয়মিত শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ পাবে।

তবে এই টুর্নামেন্ট এখনই চূড়ান্ত হয়নি। আগামী নভেম্বরে আইসিসির অর্থ ও বাণিজ্যবিষয়ক কমিটির পর্যালোচনার পর বোর্ড সভায় এটি চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে।




আরও সংবাদ

খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন