রেকর্ড বইয়ের নতুন নাম লিওনেল মেসি

ক্রীড়া প্রতিবেদক

একসময় লিওনেল মেসিকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্ক ছিল, তিনি কি বিশ্বকাপ জিততে পারবেন? ২০২২ সালে সেই প্রশ্নের উত্তর মিলেছিল। ২০২৬ সালে এসে প্রশ্নটাই বদলে গেছে। এখন আর আলোচনা হয় না তিনি কী জিতেছেন; বরং আলোচনা হয় আর কোন রেকর্ডটি তাঁর দখলে নেই!

বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন অনেক ফুটবলার এসেছেন, যারা কোনো একটি পরিসংখ্যানে কিংবদন্তি হয়ে আছেন। কেউ সর্বোচ্চ গোলদাতা, কেউ সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন, কেউবা সবচেয়ে বেশি শিরোপা জিতেছেন। কিন্তু মেসির বিশেষত্ব হলো, তিনি একসঙ্গে প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ তালিকার শীর্ষে উঠে গেছেন। ফলে বিশ্বকাপের ইতিহাস পড়তে গেলে এখন বারবার একই নাম ফিরে আসে-লিওনেল মেসি।

ইংল্যান্ডকে হারিয়ে আর্জেন্টিনার ফাইনালে ওঠার মধ্য দিয়ে তার বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারে যুক্ত হয়েছে আরও একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়। ২০১৪, ২০২২ এবং ২০২৬-তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনালে অধিনায়ক হিসেবে দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার বিরল কীর্তি গড়েছেন তিনি। বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে একই প্রভাব ধরে রাখার এমন নজির ফুটবল ইতিহাসে খুব কমই দেখা গেছে।

তবে এই অর্জন কেবল একটি রেকর্ড নয়। এটি প্রমাণ করে, প্রজন্ম বদলালেও আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ভরসার নামটি বদলায়নি। ২০১৪ সালে তার পাশে ছিলেন হাভিয়ের মাসচেরানো, গঞ্জালো হিগুয়েইন কিংবা এজেকিয়েল লাভেজ্জি। ২০২৬ সালে সেই জায়গায় এনসো ফার্নান্দেস, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার বা হুলিয়ান আলভারেজ। সতীর্থ বদলেছে, কোচ বদলেছে, কিন্তু আর্জেন্টিনার নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন একই মানুষ।

বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি আসরে খেলার রেকর্ডটিও এখন তার দখলে। ২০০৬ সালে তরুণ এক প্রতিভা হিসেবে শুরু হয়েছিল যাত্রা। এরপর ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ পেরিয়ে ২০২৬-ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে মাঠে নেমে ফুটবল ইতিহাসে নতুন অধ্যায় লিখেছেন তিনি। এই অর্জনে অবশ্য এবার তাঁর পাশে জায়গা করে নিয়েছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও। কিন্তু বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার তালিকায় মেসির অবস্থান একক। ৩৩ ম্যাচ খেলে তিনি অনেক আগেই ছাড়িয়ে গেছেন লোথার ম্যাথাউস, মিরোস্লাভ ক্লোসা কিংবা রোনালদোকে!

অবশ্য শুধু মাঠে নামাই নয়, মাঠে কী করেছেন, সেটিই তাকে আরও আলাদা করে। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন মেসি। ২১ গোল করে তিনি পেছনে ফেলেছেন মিরোস্লাভ ক্লোসাকে। একই সঙ্গে গোল এবং অ্যাসিস্ট মিলিয়ে সরাসরি ৩৩টি গোলে অবদান রেখেছেন, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। অর্থাৎ বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্য যেকোনো ফুটবলারের চেয়ে বেশি গোলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার নাম!

এই পরিসংখ্যানের একটি বিশেষ দিকও রয়েছে। ক্যারিয়ারের শুরুতে মেসিকে দেখা যেত মূলত গোলদাতার ভূমিকায়। এখন বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি হয়ে উঠেছেন আক্রমণের পরিচালক। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালই তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। গোল করেননি, কিন্তু এনসো ফার্নান্দেস ও লাউতারো মার্তিনেজ-দুজনের গোলেরই উৎস ছিলেন তিনি। ফলে ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে অন্তত একটি করে অ্যাসিস্ট করার অনন্য রেকর্ডটিও এখন একমাত্র তাঁর।

বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ জয়ের রেকর্ডটিও নতুন করে লিখেছেন মেসি। একসময় এই রেকর্ড ছিল জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার দখলে। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ধারাবাহিক জয়ের মধ্য দিয়ে সেই সংখ্যাকে ২২-এ নিয়ে গেছেন মেসি। ২০০৬ সালে দুটি জয় দিয়ে শুরু হওয়া যাত্রা এখন ছয়টি বিশ্বকাপ মিলিয়ে ২২ ম্যাচ জয়ের ইতিহাস।

সময়ের সঙ্গেও যেন লড়াই করছেন তিনি। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি মিনিট মাঠে থাকার রেকর্ডটিও এখন মেসির। ২ হাজার ৭২৪ মিনিট খেলেছেন তিনি, যা পাওলো মালদিনি, ম্যানুয়েল নয়্যার কিংবা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর চেয়েও অনেক বেশি। এটি শুধু দীর্ঘ ক্যারিয়ারের গল্প নয়; বরং প্রতিটি বিশ্বকাপে শেষ পর্যন্ত দলকে টেনে নেওয়ার সক্ষমতারও প্রমাণ।

আরেকটি জায়গায় তার আধিপত্য আরও স্পষ্ট। ম্যাচসেরার পুরস্কার। বিশ্বকাপে রেকর্ড ২০ বার ‘প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ’ হয়েছেন মেসি। অর্থাৎ প্রায় প্রতি দুই ম্যাচে একবার তিনি ছিলেন ম্যাচের সেরা ফুটবলার। বিশ্বকাপের মতো প্রতিযোগিতায় এমন ধারাবাহিকতা অন্য কোনো খেলোয়াড় দেখাতে পারেননি।

রেকর্ডের তালিকা এখানেই শেষ নয়। সবচেয়ে বেশি বয়সে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক, বক্সের বাইরে থেকে সবচেয়ে বেশি গোল, সবচেয়ে বেশি ভিন্ন দেশের বিপক্ষে গোল-এমন আরও অসংখ্য অর্জনে ভরা ৩৯ বছর বয়সী মহাতারকার ক্যারিয়ার। এখন প্রশ্নটা আর কে কত রেকর্ড ভাঙল, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতের কোনো ফুটবলার কি একসঙ্গে এতগুলো রেকর্ড স্পর্শ করতে পারবেন?

মজার বিষয় হলো, মেসির রেকর্ডগুলো আলাদা আলাদা নয়; একটির সঙ্গে আরেকটির সম্পর্ক আছে। সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন বলেই সবচেয়ে বেশি মিনিট খেলেছেন। সবচেয়ে বেশি সময় মাঠে থেকেছেন বলেই সবচেয়ে বেশি জয়, সবচেয়ে বেশি গোল, সবচেয়ে বেশি অ্যাসিস্ট, সবচেয়ে বেশি ম্যাচসেরা হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই সুযোগগুলো কাজে লাগাতে যে মান, ধারাবাহিকতা ও নেতৃত্ব প্রয়োজন, সেটিই তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

স্পেনের বিপক্ষে ফাইনাল এখন তার সামনে আরেকটি সুযোগ এনে দিয়েছে। ট্রফি জিতলে টানা দুই বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাসে আর্জেন্টিনাকে জায়গা করে দেওয়ার পাশাপাশি নিজের বিশ্বকাপ উত্তরাধিকারকেও আরও উঁচুতে নিয়ে যাবেন তিনি। তবে ফল যাই হোক, একটি সত্য এখন প্রায় অস্বীকার করার উপায় নেই-বিশ্বকাপের ইতিহাসে রেকর্ডের বই খুললেই সবচেয়ে বেশি যে নামটি চোখে পড়ে, সেটি আর কোনো কিংবদন্তির নয়- সেটি মেসির!

খুলনা গেজেট/এএজে




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন