বৃহস্পতির রহস্যময় উপগ্রহ ইউরোপা। ইউরোপার উপরিভাগের নিচে থাকা বরফের স্তরের গড় পুরুত্ব প্রায় ২৯ কিলোমিটার। এর নিচের লবণাক্ত মহাসাগরে পৃথিবীর সব মহাসাগরের মোট পানির চেয়েও দুই গুণের বেশি পানি থাকতে পারে। নাসার জুনো মহাকাশযানের সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ থেকে এই ধারণা করেছে বিজ্ঞানীরা।
মাত্র ৩,১২০ কিলোমিটার ব্যাসের ইউরোপা পৃথিবীর চাঁদের চেয়েও ছোট। কিন্তু এর বরফের নিচে থাকা মহাসাগরের গভীরতা ৬০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার হতে পারে বলে ধারণা বিজ্ঞানীদের। এ কারণে আমাদের নিজস্ব সৌরজগতেই প্রাণের সম্ভাব্য আবাসস্থল হিসেবে ইউরোপাকে দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।
বরফের পুরুত্ব কীভাবে জানা গেল?
২০২২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বরে জুনো মহাকাশযান ইউরোপার মাত্র ৩৬০ কিলোমিটার ওপর দিয়ে উড়ে যায়। এ সময় মহাকাশযানটির মাইক্রোওয়েভ রেডিওমিটার (এমডব্লিওআর) যন্ত্র বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের মাইক্রোওয়েভ বিকিরণ বিশ্লেষণ করে বরফস্তরের তাপীয় বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে পর্যবেক্ষণকৃত অঞ্চলে বরফস্তরের গড় পুরুত্ব প্রায় ২৯ কিলোমিটার। তবে বিভিন্ন অঞ্চলে বরফের পুরুত্ব কম বা বেশি হতে পারে।
প্রাণের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
ইউরোপার নিচে বিশাল মহাসাগর থাকলেও সেটি প্রাণ ধারণের জন্য কতটা উপযোগী—সেই প্রশ্ন এখনও বিদ্যমান। কারণ, জীবনের জন্য শুধু পানিই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাসায়নিক শক্তি, জৈবিকভাবে প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং সমুদ্রের তলদেশ ও বরফাচ্ছাদিত পৃষ্ঠের মধ্যে উপাদান আদান-প্রদানের ব্যবস্থা।
নতুন গবেষণা বলছে, যদি বরফস্তর সত্যিই এত পুরু হয়, তবে সমুদ্র ও পৃষ্ঠের মধ্যে রাসায়নিক উপাদান চলাচল আগের ধারণার তুলনায় অনেক বেশি কঠিন হতে পারে। এতে ইউরোপায় প্রাণের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেয়া না হলেও বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
ইউরোপা ক্লিপারে নজর বিজ্ঞানীদের
নাসার ইউরোপা ক্লিপার মহাকাশযান ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবরে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে এবং ২০৩০ সালের এপ্রিলে বৃহস্পতির কক্ষপথে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এটি ইউরোপার চারপাশে প্রায় ৫০টি মহাকাশ অভিযান পরিচালনা করবে। রাডার, ক্যামেরা, স্পেকট্রোমিটার, চৌম্বকীয় পরিমাপকসহ আধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে বরফস্তরের গঠন, ভূতত্ত্ব, মহাসাগরের বৈশিষ্ট্য এবং প্রাণের উপযোগী পরিবেশের সম্ভাবনা সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করবে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই আবিষ্কার?
ইউরোপা নিয়ে নতুন এই পরিমাপ সৌরজগতে প্রাণের সন্ধানকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। একদিকে এটি দেখাচ্ছে যে বিশাল এক মহাসাগর সত্যিই বরফের নিচে লুকিয়ে থাকতে পারে, অন্যদিকে সেই মহাসাগরে পৌঁছানো এবং তার পরিবেশ বোঝা বিজ্ঞানীদের জন্য কত বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ—তাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
গবেষকদের ভাষায়, ইউরোপার সবচেয়ে বড় রহস্য শুধু এর মহাসাগর নয়; বরং সেই মহাসাগরকে আড়াল করে রাখা কয়েক কিলোমিটার পুরু বরফস্তর, যার ওপারে হয়তো লুকিয়ে আছে সৌরজগতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলোর একটি। যেখানে পৃথিবীর সাগরগুলোতে গড় গভীরতা ৪ কিলোমিটার, সেখানে ইউরোপা নির্দেশ করে মহাবিশ্বে সাগরের গভীরতা শত কিলোমিটারও হতে পারে।
সূত্র: স্পেস ডেইলি
খুলনা গেজেট/এএজে

