বুধবার । ৪ঠা মার্চ, ২০২৬ । ১৯শে ফাল্গুন, ১৪৩২

রমাদান : হৃদয় বদলের বসন্ত

ফারহান জাওয়াদ

বছরের এগারোটি মাসের একটানা যান্ত্রিক ছুটে চলা, পার্থিব জীবনের মরীচিকার পেছনে দৌড়ানো আর হাজারো ভুলভ্রান্তির পর আমাদের ক্লান্ত আত্মায় প্রশান্তির সুবাতাস নিয়ে আসে পবিত্র রমাদান। মুমিনের রুক্ষ ও ধুলোমলিন জীবনে এ যেন এক পশলা আধ্যাত্মিক বৃষ্টির নাম। এটি সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কেবল পানাহার থেকে বিরত থাকার কোনো শুষ্ক আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং এটি হলো রবের নৈকট্য লাভ, আত্মশুদ্ধি এবং নিজের ভেতরের ঘুমিয়ে থাকা মানুষটিকে জাগিয়ে তোলার এক অবারিত মহোৎসব।

দুনিয়ার যেকোনো ব্যবসায়ী যেমন সারা বছর একটি ‘পিক সিজন’ বা লাভের মৌসুমের জন্য অপেক্ষায় থাকেন, নিজের সবটুকু মেধা ও শ্রম দিয়ে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে চান— তেমনি একজন মুমিনের কাছে রমাদান হলো নেকি অর্জনের শ্রেষ্ঠতম মৌসুম। এই এক মাসের সওদা দিয়ে তাকে পাড়ি দিতে হবে বাকি এগারো মাসের দুর্গম পথ। কিন্তু এই মাসটি কেন এত মর্যাদাপূর্ণ? আর কীভাবে আমরা এর প্রতিটি সেকেন্ডকে হীরকখণ্ডের মতো মূল্যবান করে তুলতে পারি?

রহমত, মাগফিরাত ও মুক্তির এক অনন্য আসমানি প্যাকেজ-

রমাদানের শ্রেষ্ঠত্বের অন্যতম বড় এবং প্রধান কারণ হলো পবিত্র কুরআন। মানবজাতির উত্থান-পতনের মাপকাঠি, অন্ধকারের বুক চিরে আলোর পথ দেখানো এই আসমানি কিতাব আল্লাহ তাআলা এই মাসেই নাজিল করেছেন। এই মাসটি মূলত কুরআনেরই মাস।

হাদিসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, এই মাসের মর্যাদার কথা রসুলুল্লাহ (সা.) অসাধারণ কিছু উপমায় বর্ণনা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, রমাদানের চাঁদ আকাশে উঁকি দেওয়ার সাথে সাথেই জান্নাতের দরজাগুলো সশব্দে খুলে দেওয়া হয়, যেন মুমিনদের স্বাগত জানানোর জন্য জান্নাত নিজেই প্রস্তুত। অন্যদিকে, শক্ত করে বন্ধ করে দেওয়া হয় জাহান্নামের কপাট এবং মানুষের আদি পিতা আদমের চিরশত্রু শয়তানকে করা হয় শৃঙ্খলিত। প্রতিদিন এবং প্রতি রাতের আঁধারে অসংখ্য গুনাহগার বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তির এক বিশেষ ‘অফার’ দেন মহান দয়াময় রব।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, এই মাসে যেকোনো সাধারণ নেক আমলের সোয়াব দশগুণ থেকে সাতশ গুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু রোজার বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা ও রহস্যময়। আল্লাহ তাআলা নিজেই ঘোষণা করেছেন, “সিয়াম আমার জন্য, আমিই তার প্রতিদান দেব।” শুধু তাই নয়, জান্নাতে ‘রাইয়ান’ নামক একটি বিশেষ সুবিশাল দরজা রয়েছে, যা দিয়ে কেয়ামতের দিন শুধু রোজাদাররাই পরম তৃপ্তির সাথে প্রবেশ করার রাজকীয় সম্মান পাবেন।

তাকওয়ার খোঁজে : আমাদের রোজা কি কেবলই উপবাসের নামান্তর?

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, সিয়াম বা রোজা ফরজ করার মূল উদ্দেশ্য হলো ‘তাকওয়া’ বা আল্লাহভীতি অর্জন। কিন্তু দিনের শেষে ইফতারের টেবিলে বসে একটু ভেবে দেখার বিষয় হলো আমাদের এই রোজা কি সত্যিই আমাদের মুত্তাকী বানাচ্ছে?

যদি আমাদের রমাদান শুধু সাহরী খাওয়ার ধুমধাম, দিনভর ক্লান্তিকর উপবাস এবং সন্ধ্যায় হরেক রকম মুখরোচক ইফতারের আয়োজনের মাঝেই আটকে থাকে, তবে রোজার মূল উদ্দেশ্যই ঢাকা পড়ে যায়। ভেবে দেখুন, একান্ত নির্জনে, ঘরের দরজা বন্ধ থাকা অবস্থায় প্রচণ্ড ক্ষুধা ও তৃষ্ণা থাকা সত্ত্বেও আমরা এক ঢোক পানিও পান করি না। কেন? কারণ আমরা বিশ্বাস করি, কেউ না দেখুক আমার আল্লাহ দেখছেন।

অথচ সেই একই আল্লাহর ভয়ে আমরা কি আমাদের জীবনের অন্যান্য হারাম কাজগুলো ছাড়তে পারছি? রোজা রেখেও যদি আমাদের মুখের মিথ্যা কথা বন্ধ না হয়, অন্যের হক নষ্ট করার স্বভাব না যায়, অবৈধ উপার্জন চলতেই থাকে কিংবা হাতের স্মার্টফোনে হারাম কন্টেন্ট দেখার আসক্তি না কাটে তবে বুঝতে হবে আমাদের এই রোজা নিছক উপবাস ছাড়া আর কিছুই নয়। যে আল্লাহ দিনের বেলায় হালাল খাবার থেকে বিরত থাকতে বলেছেন, সেই আল্লাহই তো হারাম কাজ থেকে সবসময় বিরত থাকতে বলেছেন। রোজার এই শিক্ষাই হলো তাকওয়া।

রমাদানকে সার্থক করার কার্যকরী ও বাস্তবমুখী রূপরেখা-

রমাদানের এই সুবর্ণ সুযোগ যেন চোখের পলকে হারিয়ে না যায়, সেজন্য আমাদের দৈনন্দিন জীবনের রুটিনে বেশ কিছু কাঠামোগত ও আধ্যাত্মিক পরিবর্তন আনা জরুরি :

১. হারামের বেড়াজাল ছিন্ন করা : নিষিদ্ধ বিষয় থেকে নিজেকে পুরোপুরি গুটিয়ে নিতে হবে। চোখ, কান, হাত ও জিহ্বাকে রোজার পবিত্রতায় বেঁধে ফেলতে হবে। রাসূল (সা.) বলেছেন, নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বেঁচে থাকো, তাহলে তুমি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বড় ইবাদতগুজার হিসাবে গণ্য হবে। (সুনান তিরমিযী-২৩০৫)

গিবত, পরনিন্দা, এবং ডিজিটাল পাপ (যেমন- অযথা স্ক্রলিং ও হারাম দৃশ্য দেখা) থেকে নিজেকে মুক্ত রাখাই হলো সত্যিকার রোজাদারের কাজ।

২. সালাতে মনোযোগ ও জামাতের প্রতি একনিষ্ঠতা : আজান হওয়ার সাথে সাথেই দুনিয়াবি সব ব্যস্ততা ফেলে মসজিদে ছুটে যাওয়ার অভ্যাস গড়তে হবে এই রমাদানেই। নারীদের উচিত ঘরে প্রথম ওয়াক্তে, সমস্ত কাজের চিন্তা দূরে সরিয়ে ধীরস্থিরভাবে সালাত আদায় করা। মনে রাখতে হবে, কেয়ামতের ময়দানে সবচেয়ে প্রথম হিসাব হবে এই সালাতেরই। সালাত ঠিক তো সব ঠিক। নবী কারীম সা. বলেছেন কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম বান্দাদের থেকে সালাতের হিসাব নেয়া হবে। সালাত যথাযথভাবে আদায় হয়ে থাকলে সে সফল হবে ও মুক্তি পাবে। সালাত যথাযথ আদায় না হয়ে থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হবে। (সুনান নাসায়ী-৪৬৫)

৩. কুরআনের সাথে অন্তরঙ্গতা ও গভীর বন্ধুত্ব : যেহেতু এটি কুরআন নাযিলের মাস, তাই কেবল তোতাপাখির মতো তিলাওয়াতের পাশাপাশি এর অর্থ, প্রেক্ষাপট ও শিক্ষা অনুধাবনের জন্য সময় বের করতে হবে। কেয়ামতের কঠিন ও ভয়াবহ দিনে, যখন কেউ কারো দিকে ফিরে তাকাবে না, তখন এই কুরআন এবং রোজা আল্লাহর দরবারে আপনার পক্ষে শক্ত সুপারিশকারী হিসেবে দাঁড়িয়ে যাবে।

৪. রাতের নিস্তব্ধতায় রবের সান্নিধ্য (তাহাজ্জুদ): সাহরী খাওয়ার জন্য তো আমরা রাতেই উঠি। খাবার প্রস্তুত হওয়ার ফাঁকে, কিংবা খাওয়ার ঠিক আগে কিছুটা সময় বের করে নির্জনে কয়েক রাকাত তাহাজ্জুদ পড়ে নেওয়া খুব সহজ একটি কাজ। রাতের শেষ ভাগে আল্লাহ যখন দুনিয়ার আসমানে এসে ক্ষমার ডাক দেন, তখন সেই নিশ্চুপ রজনীতে চোখের পানি ফেলে রবের কাছে নিজের সবটুকু চাওয়ার এর চেয়ে দারুণ সুযোগ আর কী হতে পারে!

৫. জ্ঞান অর্জনের আনন্দময় পরিবেশ : পরিবারকে সাথে নিয়ে প্রতিদিন ইফতারের আগে বা পরে কিছুটা সময় ইসলামের মৌলিক জ্ঞান অর্জনে ব্যয় করা যেতে পারে। সাহাবিদের জীবনী পড়া, কুরআনের তাফসীর শোনা বা হাদিসের আলোচনা করা এই অভ্যাসটি পুরো পরিবারকে একটি সুন্দর আধ্যাত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ করবে, যার প্রভাব থাকবে বছরজুড়ে। রাসূল (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেন কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দেব। কে আছে এমন, যে আমার নিকট চাইবে? আমি তাকে তা দেব। কে আছে এমন, যে আমার নিকট ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব। (সহিহ বুখারি-১১৪৫)

রমাদান আমাদের জীবনকে ঢেলে সাজানোর, অতীতকে মুছে নতুন করে শুরু করার এক ঐশী সুযোগ। আসুন, এই মাসটিকে কেবল ক্যালেন্ডারের পাতা বদল হিসেবে না দেখে, হৃদয় বদলের এক দীর্ঘ মহোৎসব হিসেবে গ্রহণ করি। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে সেই তাওফীক ও হেদায়েত দান করুন।

লেখক : ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিন, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়।

 

খুলনা গেজেট/এনএম




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন